আগের চেয়ে বড় হচ্ছে দিনের দৈর্ঘ্য, বলছেন বিজ্ঞানীরা

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

আগের চেয়ে বড় হচ্ছে দিনের দৈর্ঘ্য, বলছেন বিজ্ঞানীরা
ছবি: এনডিটিভি

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ ও হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে পৃথিবীর দিনগুলো ধীরে ধীরে দীর্ঘ হচ্ছে বলে এক নতুন গবেষণায় জানা গেছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির এই পরিমাণ অত্যন্ত সামান্য এবং তা মিলিসেকেন্ডের ভগ্নাংশে পরিমাপ করা হয়। তবে এর পেছনের শক্তিটি বিশাল এবং গত লাখ লাখ বছরের মধ্যে এটি নজিরবিহীন।

বিজ্ঞাপন

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ তথ্য জানিয়েছে।

গবেষণা অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি কমে যাওয়ার এই হার গত ৩৬ লাখ বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে ‘নজিরবিহীন’।

গবেষকেরা ব্যাখ্যা করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন মেরু অঞ্চলের হিমবাহ ও বরফের স্তর গলে যায়, তখন সেই পানি সমুদ্রের মাধ্যমে বিষুবরেখার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। মেরু অঞ্চল থেকে এই ভরের স্থানান্তর পৃথিবীর ঘূর্ণন গতিকে ধীর করে দেয়; ঠিক যেভাবে একজন ফিগার স্কেটার ঘোরার সময় নিজের হাত প্রসারিত করে গতি কমিয়ে আনেন।

এর আগের বিভিন্ন গবেষণাতেও জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর ঘূর্ণনকে প্রভাবিত করার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। তবে ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনা এবং ইটিএইচ জুরিখের বিজ্ঞানীরা ভূতাত্ত্বিক রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখার চেষ্টা করেছেন যে অতীতেও এমন দ্রুত পরিবর্তন ঘটেছিল কি-না।

গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ, পৃথিবীর অভ্যন্তরের গতিবিধি এবং বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনের মতো বেশ কিছু প্রাকৃতিক শক্তির কারণে স্বাভাবিকভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর ঘূর্ণনে পরিবর্তন আসে, যা দিনের দৈর্ঘ্যকে প্রভাবিত করে।

তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে তা এই প্রাকৃতিক প্রভাবগুলোকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে।

লাখ লাখ বছরের এই পরিবর্তন পর্যালোচনার জন্য গবেষকেরা সমুদ্রের তলদেশের ‘বেন্থিক ফোরামিনিফেরা’ নামক ক্ষুদ্র জীবের জীবাশ্ম পরীক্ষা করেছেন। এই জীবগুলোর খোলসের রাসায়নিক গঠন প্রাচীনকালের সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তনের রেকর্ড ধরে রেখেছে। এই পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ঘূর্ণনের পরিবর্তন অনুমান করতে সক্ষম হন।

অতি প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক তথ্যের অনিশ্চয়তা দূর করতে গবেষক দলটি বিশেষভাবে তৈরি একটি মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করেছেন। এটি গবেষকদের প্রায় ৩৬ লাখ বছর আগের ‘লেট প্লিওসিন’ যুগের রেকর্ড নিয়ে কাজ করতে সাহায্য করেছে।

গবেষণা অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দিন বড় হওয়ার বর্তমান হার পুরো ভূতাত্ত্বিক রেকর্ডের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে দিন বড় হওয়ার এই হার প্রতি শতাব্দীতে প্রায় ১.৩৩ মিলিসেকেন্ড। এটি দেখতে খুব সামান্য মনে হলেও গবেষকেরা জোর দিয়ে বলেছেন যে এর সঙ্গে জড়িত ভরের পরিমাণ বিশাল।

এই গবেষণার সহ-লেখক ইটিএইচ জুরিখের অধ্যাপক বেনেডিক্ট সোজা বলেন, এই পরিবর্তনের জন্য মেরু অঞ্চল থেকে প্রায় ১ হাজার গিগাটন ভর সমুদ্রে স্থানান্তরিত হতে হয়েছে।

এই পরিমাপের বিশালত্ব বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, কেউ যদি নিউইয়র্ক শহরের ওপর একটি বরফের ঘনক কল্পনা করেন, তবে সেটির উচ্চতা হবে ১০ কিলোমিটার, যা মাউন্ট এভারেস্টের চেয়েও উঁচূ।

গবেষণার প্রধান লেখক ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার ড. মোস্তফা কিয়ানি শাহভান্দি বলেন, পৃথিবীর ঘূর্ণন শক্তির এই পরিবর্তন একটি ৯.০ মাত্রার ভূমিকম্পের শক্তির সঙ্গে তুলনীয়; তবে তা ধ্বংসযজ্ঞের দিক থেকে নয়, বরং গ্রহের স্কেলের শক্তির দিক থেকে।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ২০ লাখ বছর আগে অবিকল একই রকম একটি সময় এসেছিল যখন পরিবর্তনের হার প্রায় বর্তমান স্তরের কাছাকাছি ছিল।

অধ্যাপক সোজা জানান, ভঙ্গুর বরফের স্তরের সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধির সমন্বয়ে মেরু অঞ্চলের বরফ ব্যাপক হারে গলে যাওয়ার কারণে সেই ঘটনা ঘটেছিল।

গবেষকেরা সতর্ক করে দিয়েছেন, ভবিষ্যতে যদি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন উচ্চ মাত্রায় বজায় থাকে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকে, তবে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনই পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য পরিবর্তনের প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বিষয়: