বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এখন বৈশ্বিক ডিজিটাল বাজারে নিজেদের দক্ষতার দৃঢ় উপস্থিতি তৈরি করছে। বিশেষ করে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও) খাতে দেশের পেশাদাররা যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অনলাইন উপস্থিতি শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে শীর্ষ কয়েকজন মেধাবী তরুণ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।
এই তালিকার প্রথমেই রয়েছেন হবিগঞ্জের তরুণ সাদেকুর রহমান। মাত্র ১৫ বছর বয়সে ২০১৯ সালে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তিনি এসইও চর্চা শুরু করেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক আমার দেশ-এর এসইও এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত। চার বছরের বেশি অভিজ্ঞতায় তিনি ১৮৫টিরও বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ২২০টিরও বেশি ওয়েবসাইটে সফলভাবে কাজ করেছেন। তার ক্লায়েন্ট তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই ও মিয়ামি, অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। হাওয়াইয়ের একটি ওয়েডিং ফটোগ্রাফি কোম্পানিতে দীর্ঘদিন কাজ করার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার মেডিকেল ওয়েবসাইট এবং কানাডার একটি সরকারি প্রকল্পেও কাজ করেছেন তিনি। দেশের ভেতরে ই-কমার্স, রিয়েল এস্টেট ও পাবলিশিং খাতে তার উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। এছাড়া পত্রিকায় কর্মরত থাকায় তিনি ক্লায়েন্টদের জন্য সত্যিকারের সংবাদমাধ্যমে প্রেস রিলিজ প্রকাশের সুবিধাও দিতে পারেন।
প্রথম আলোর এসইও স্পেশালিস্ট সাইফুল ইসলাম তানিম আট বছরেরও বেশি সময় ধরে এই পেশায় যুক্ত। ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে তিনি এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ই-কমার্স ও সেবামূলক ব্যবসার জন্য ভিন্নধর্মী ও গবেষণাভিত্তিক এসইও কৌশল তৈরিতে তার দক্ষতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আবদুল আউয়াল দেশের এসইও অঙ্গনের একজন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ, যার ১২ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। এসইওর সাথে পাইথন প্রোগ্রামিং ও অটোমেশনের সমন্বয় করে বড় আকারের ওয়েবসাইট পরিচালনায় তিনি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন। দেশজুড়ে ১৫০টিরও বেশি সেমিনারে বক্তব্য দিয়ে তিনি এসইও জ্ঞান বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
বাংলাদেশে এসইও শিক্ষার ক্ষেত্রে পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত নাসির উদ্দিন শামিম। তার দশ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতায় তৈরি ‘Nshamim Pro Full SEO Course’ থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী উপকৃত হয়েছে। ছোট ব্যবসা থেকে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই তার কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান বিতরণেই তার বিশেষ মনোযোগ।
১৫ বছরের বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জিন্নাত উল হাসান দেশের অন্যতম অভিজ্ঞ এসইও বিশেষজ্ঞ। গ্রোথ মার্কেটিং কনসালট্যান্ট ও হেড অব এসইও অ্যান্ড এআই হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করছেন। ফরচুন ৫০০ তালিকাভুক্ত ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনালের ১০০টিরও বেশি ওয়েবসাইটের এসইও ব্যবস্থাপনায় তিনি যুক্ত ছিলেন। ই-কমার্স, সংবাদপত্র, এফএমসিজি ও অটোমোটিভ খাতে তার বিস্তৃত অভিজ্ঞতা রয়েছে।
Image Retouching Lab-এ কর্মরত তারেক জাহান কীওয়ার্ড গবেষণা এবং ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা উন্নয়নে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। অন্যদিকে, কালবেলা পত্রিকার এসইও স্পেশালিস্ট মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে অন-পেজ ও অফ-পেজ এসইওতে সফলতা অর্জন করে আসছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এজেন্সির সাথেও তার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
মো. ফারুক খান দশ বছরের বেশি অভিজ্ঞতায় ৩,৫০০-এরও বেশি শিক্ষার্থীকে এসইও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ১০ মিনিট স্কুলে এসইও মেন্টর হিসেবে কাজ করছেন। ওয়ালটন হাই-টেকের ২১৩টি কীওয়ার্ডের মধ্যে ২১০টি প্রথম পাতায় নিয়ে আসা এবং Reglazing Wow-এর অর্গানিক ট্র্যাফিক এক মাসে ৯৩ শতাংশ বৃদ্ধি করা তার উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ওয়ালটন, হাতিল, কেয়া কসমেটিকস ও ইফাদ গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি কাজ করেছেন।
হৃদয় চৌধুরী নিশ ওয়েবসাইট নির্মাণ এবং টপিক্যাল অথরিটি গড়ে তোলায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। আপওয়ার্কে ‘টপ রেটেড প্লাস’ মর্যাদা এবং ৯৯ শতাংশ সাফল্যের হার তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ। ইউটিউবের মাধ্যমে ৫,০০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, প্রযুক্তিগত এসইও বিশেষজ্ঞ এস এম লুৎফর রহমান ওয়েবসাইটের গতি বৃদ্ধি, কোর ওয়েব ভাইটালস উন্নয়ন এবং ওয়ার্ডপ্রেস অপ্টিমাইজেশনে দক্ষতার কারণে বিশেষভাবে পরিচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসইওতে ‘এক সপ্তাহে প্রথম পাতায়’ বা ‘গ্যারান্টিড র্যাংকিং’-এর মতো প্রতিশ্রুতি সাধারণত বিভ্রান্তিকর। কার্যকর ফলাফল পেতে সাধারণত ৩ থেকে ৬ মাস সময় লাগে এবং বড় সাফল্য পেতে ৬ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত সময় প্রয়োজন হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি এসইও সেবার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের তুলনায় তুলনামূলক কম খরচে একই মানের সেবা প্রদান সম্ভব হওয়ায় বিদেশি ক্লায়েন্টরা বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের দিকে ঝুঁকছেন। অ্যাহরেফস, সেমরাশ ও গুগল সার্চ কনসোলের মতো আন্তর্জাতিক মানের টুল ব্যবহার করে গুগলের নির্দেশিকা অনুসরণ করা হয়। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ ইংরেজিতে দক্ষ হওয়ায় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সহজ হয়।
বাংলাদেশে এসইও সেবার খরচ ব্যবসার ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হয়। ছোট ব্যবসার জন্য মাসিক ২০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা, মাঝারি ব্যবসার জন্য ৫০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ টাকা, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের জন্য ৭৫,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকা এবং বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য এর চেয়ে বেশি খরচ হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এসইওর ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। গুগলের পাশাপাশি চ্যাটজিপিটি, জেমিনি ও পার্পলেক্সিটির মতো এআই প্ল্যাটফর্মের জন্য কনটেন্ট অপটিমাইজেশন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভয়েস সার্চ এবং ভিডিও কনটেন্টের গুরুত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে। গুগলের ই-ই-এ-টি নীতির আলোকে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, কর্তৃত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন দেশের বিশেষজ্ঞরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

