দুর্গাপূজা এলেই পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজারের সরু গলিগুলো উৎসবের রঙে সেজে ওঠে। পূজার প্রায় প্রতিটি প্রয়োজনীয় জিনিস মেলে এই প্রাচীন বাজারে। শাঁখারী বাজারে পাওয়া যায়, দুর্গাপূজার এমন নানা অনুষঙ্গের কথা তুলে ধরেছেন আমানুর রহমান
শঙ্খ
হিন্দুধর্মের যেকোনো শুভ কাজে, বিশেষ করে দুর্গাপূজায় শঙ্খের ধ্বনি এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজারের নামকরণই হয়েছে এই প্রাচীন শঙ্খশিল্পের ওপর ভিত্তি করে। পূজার আরতি, মঙ্গলাচরণ এবং দেবী দুর্গাকে আবাহন করার জন্য এখানে পাওয়া যায় নিখুঁত ও সুমধুর ধ্বনির শঙ্খ। এখানকার কারিগররা বংশপরম্পরায় অত্যন্ত নিপুণ হাতে কেটে ও খোদাই করে অসাধারণ সব শঙ্খ তৈরি করেন। পূজার সময় বাজারটি নানা কারুকাজ করা বাজানোর শঙ্খ এবং পূজার বেদিতে রাখার জলশঙ্খের পসরায় ভরে ওঠে। শাঁখারী বাজারের শঙ্খ ছাড়া শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভ সূচনা যেন অপূর্ণ থেকে যায়।
শোলার মুকুট ও গয়না
দেবী দুর্গা এবং তার সঙ্গে থাকা অন্যান্য প্রতিমার সাজসজ্জার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো শোলার তৈরি মুকুট ও গয়না। শাঁখারী বাজারে ঢুঁ মারলেই চোখে পড়বে ধবধবে সাদা শোলার তৈরি চোখধাঁধানো সব শিল্পকর্ম। কারিগরদের জাদুকরী হাতের ছোঁয়ায় সাধারণ শোলাকাঠি পরিণত হয় অপূর্ব সুন্দর মুকুট, কদম ফুল, গলার হার এবং নানা ধরনের অলংকারে। দুর্গাপূজায় দেবীর মাথার মুকুট থেকে শুরু করে চালচিত্রের অনেক সাজসজ্জাই এই শোলার মাধ্যমে করা হয়। পূজার আগে কারিগররা দিনরাত এক করে এই দৃষ্টিনন্দন জিনিসগুলো তৈরি করেন।
কোশাকুশি ও পিতলের বাসনপত্র
হিন্দুধর্মের যেকোনো পূজা-অর্চনায় কাঁসা ও পিতলের বাসনপত্রের কদর চিরন্তন। দুর্গাপূজার মতো বিশাল আয়োজনের গুরুত্ব আরো অনেক গুণ বেড়ে যায়। শাঁখারী বাজারের প্রাচীন দোকানগুলোয় পূজার কাজে ব্যবহার করা নানা ধরনের পিতল বা কাঁসার তৈরি কোশাকুশি, ঘণ্টা, ঘটি, পঞ্চপ্রদীপ ও থালা পাওয়া যায়। পূজার মন্ত্রপাঠের সময় পবিত্র জল ছিটানো এবং দেবীকে নিবেদনের জন্য কোশাকুশি অপরিহার্য একটি উপাদান। এখানকার দোকানিরা বংশপরম্পরায় এই ধাতবশিল্পের সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের বাসনপত্রের নকশায় থাকে ঐতিহ্যের নিখুঁত ছোঁয়া। দীর্ঘস্থায়ী উজ্জ্বলতার জন্য পূজারিদের কাছে শাঁখারী বাজারের পিতলের পূজাসামগ্রী সবসময়ই পছন্দের শীর্ষ তালিকায় থাকে।
ধুনচি
দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো মনোমুগ্ধকর ‘ধুনচি আরতি’। ঢাকের তালে তালে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন পরিবেশে এই আরতি দুর্গোৎসবের এক অন্যরকম প্রাণশক্তি। আর এই আরতির প্রধান উপকরণ হলো ধুনচি, যা প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় শাঁখারী বাজারে। ঐতিহ্যবাহী এই বাজারে পূজার ঠিক আগে মাটি ও পিতলের তৈরি নানা আকার ও নকশার ধুনুচির পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। ধুনচির ভেতরে জ্বলন্ত নারকেলের ছোবড়া ও সুগন্ধি ধুনো দিয়ে যখন আরতি শুরু হয়, তখন ঢাকের তালে তালে চারপাশে তৈরি হয় এক অপূর্ব উৎসবমুখর পরিবেশ।
সিঁদুর ও আলতা
হিন্দু সধবা নারীদের কাছে সিঁদুর ও আলতার ধর্মীয় ও আবেগীয় মূল্য অপরিসীম। দুর্গাপূজায় দেবীর আরাধনা থেকে শুরু করে বিজয়া দশমীর ঐতিহ্যবাহী ‘সিঁদুর খেলা’ পর্যন্ত এই দুটি উপাদানের ব্যবহার অপরিহার্য। শাঁখারী বাজারে পূজার আগে সেরা মানের সিঁদুর ও আলতা কিনতে ভিড় জমান দর্শনার্থী ও পূজারিরা। এখানকার সিঁদুর গাঢ় লাল রঙের হয়। খাঁটি সিঁদুরের জন্য শাঁখারী বাজারই সবার ভরসা।
ধূপ, ধুনো ও চন্দনকাঠ
পূজামণ্ডপের পবিত্রতা এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে ধূপ, ধুনো ও চন্দনকাঠ। শাঁখারী বাজার সুগন্ধি এই উপাদানগুলোর এক বিশাল ভান্ডার। পূজার সময় এখানকার বাতাস ম-ম করে নানা সুগন্ধি ধূপকাঠি ও প্রাকৃতিক ধুনোর স্নিগ্ধ গন্ধে। দেবীর আরাধনায় চন্দনকাঠ ঘষে তৈরি করা চন্দনবাটা অতি পবিত্র একটি উপাদান, যা কপালে তিলক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শাঁখারী বাজারে পাওয়া যায় একেবারে খাঁটি চন্দনকাঠ।
শত শত বছরের ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে শাঁখারী বাজার আজও দুর্গাপূজার এক অপরিহার্য অংশ। এখানকার অনুষঙ্গগুলো ছাড়া বাঙালির শারদীয় দুর্গোৎসব যেন অনেকটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

