উড়ুউড়ু মন, ঘোরার জন্য ব্যাকুল। ঘুরতে ঘুরতে জীবনটাই একটা জীবন্ত বই হওয়ার উপক্রম। প্রকৃত প্রকৃতিবান্ধব ভ্রমণপিপাসুরা ডিভাইসের চাইতে আঁখি দুটো দিয়েই দেখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, যাতে তাদের মনের গভীরে সেই সৌন্দর্য অনন্তকাল গেঁথে থাকে। পর্যটক ঘুরে এসে ভ্রমণের গল্প বলতে পারেন, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য লিখতে পারেন অবলীলায়। একজন ভ্রমণপিপাসু সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পদ। এদের মাঝেই সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ নিহিত। এবার আসি মূল গল্পে।
দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা ছুটলাম মারিশ্যা। জায়গাটা রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন একটি দুর্গম ইউনিয়ন, যেখানে যখন-তখন হুটহাট নাশকতাকারীরা একে অপরের বিরুদ্ধে হামলে পড়ে। সেখানকার মাঝিপাড়া সীমান্ত সড়কই আমরা ভ্রমণ করব। সারা রাত গাড়ি চলার পর সকাল প্রায় ৭টায় মারিশ্যার চৌমুহনী পৌঁছাই। স্থানীয় সাংবাদিক ও পর্যটনবান্ধব সজ্জন ব্যক্তি ওমর ফারুক সুমন আগেই আমাদের জন্য সরকারি মারিশ্যা বিশ্রামাগার ও মোটরবাইক রেডি রেখেছিলেন। বিশ্রামাগারে কিছুটা সময় কাটিয়ে বের হয়ে যাই আশপাশ ঘুরে দেখার জন্য। স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপচারিতার সূত্রে তাদের জীবনমান ও দুঃখ-কষ্ট সম্পর্কে অবহিত হই। ভ্রমণ মানে জানা ও শেখা। ঘুরতে যাওয়া অঞ্চলে বসবাস করা মানুষের সংস্কৃতি জানাটাও ভ্রমণের অন্যতম অনুষঙ্গ।
এরই মধ্যে ঢাকা থেকে বন্ধু রতনের ফোনকল—‘বাঘাইছড়িতে দুপক্ষের তুমুল লড়াই ও গুলিবর্ষণ চলছে, সাবধানে থাকিস।’ ওদের লড়াইয়ে কারণে আমাদের ভাড়া করা মোটরসাইকেলগুলো আসতে লেট করল। সকাল ৯টায় টাইম বেঁধে দেওয়া বাইকগুলো এলো প্রায় দুপুর ১২টায়। দেরি না করে সামান্য ব্রিফ করেই ছুটলাম তাদের সঙ্গে। দ্রুতগতিতে বাইক চলতে চলতে মাদরাসাপাড়া গ্রাম পেরিয়ে মধ্যম বাঘাইছড়ি ছাড়িয়ে জিরো পয়েন্টে গিয়ে ব্রেক। পাহাড়ি পাকা কলা গোগ্রাস করে কচুছড়ি বিজিবি ক্যাম্পের কিছুটা পরে ১৪ কিলো এলাকায় ব্রেক; ব্রেক মানে পুরাই ব্রেক! পথের সৌন্দর্য আমাদের ব্রেক করতে বাধ্য করেছে। চারদিকে পাহাড় আর পাহাড়, সেই পাহাড়ের ফাঁক গলেই পথ চলে গেছে। পাহাড়ের ঢালুতে জুমঘর। লোভ সামলাতে না পেরে তরতর করে প্রখর রোদ উপেক্ষা করেই সড়ক থেকে কয়েক ফুট নিচে নেমে যাই। এরপর আর পায় কে? লেটিয়ে পড়লাম সবাই! সঙ্গে নেওয়া মুড়ি-চানাচুর মাখানো হলো তেল-লবণ ছাড়াই পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে। আকালের সময় তেল-লবণ ছাড়াও মুড়িভর্তা খেতে লাগে বেশ। ঝিরঝিরে বাতাসে মুড়ি খেতে খেতে শেষ অবধি জুমঘরের বাঁশের মাচাঙে শুয়ে পড়লাম। দৃষ্টির সীমানায় ঢেউ খেলানো পাহাড়ের মাঝে শুয়ে থাকার মতো তখনকার অনুভূতি এখন লিখে বোঝানো দায়। বেশ কিছুক্ষণ চুটিয়ে আড্ডা মেরে চাকমা সম্প্রদায়ের সংরক্ষণ করা কুত্তির (মাটির বদনা আকৃতির আধার) ঠান্ডা পানি পান করে আবারও ছুটে চলা। যতই যাই, ততই পথের প্রেমে মজে যাই।

যেতে যেতে ১৭ কিলো ব্রেক। ওয়াও! প্রকৃতির কী অসাধারণ রূপ! ক্ষণে ক্ষণে তার রূপের পসরা মেলে ধরছে—কোনটা রেখে কোনটা লিখব? মোটো চালক আব্দুল লতিফ একজন দক্ষ গাইডের মতোই আমাদের দেখেশুনে নিয়েছেন। যেতে যেতে ২০ কিলো মাঝিপাড়া। ডানে আর্মি ক্যাম্প, বাঁয়ে বিজিবি আর সামনে মাথা নষ্ট করা ভিউ—মিজোরামের পাহাড়সারি। ভারতের বিএসএফ ক্যাম্প প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কিছুটা মলিন করেছে। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করল—পুরো পৃথিবীর মানচিত্র একটাই, তাহলে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য কেন থাকবে কাঁটাতারের বেড়া? থাক, চিৎকার না করে নিজের ভূখণ্ডের সৌন্দর্যেই হই বুঁদ। উঁচু-উঁচু পাহাড়গুলো না কেটেও জঙ্গল-ঝোপঝাড় পরিষ্কার করেই পিচ করা সীমান্ত সড়কটি এগিয়ে চলছে সাজেকের উদয়পুর পর্যন্ত। বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে। এই কাজ বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে বেশ দক্ষতার সঙ্গেই তারা সড়কের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। নয়নাভিরাম প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেশ কিছুক্ষণ ফটোসেশন চলল। মাঝিপাড়া তীরচিহ্ন থেকে আরো কিছুটা উপরের পাহাড়ে থাকা আর্মি ক্যাম্পের কাছাকাছি যাই। সেখান থেকে মিজোরামের মোজাম গ্রামের বাজার স্পষ্টই দেখা যায়। আরো স্পষ্ট দেখা যায় দুর্গম মারিশ্যার নজরকাড়া প্রকৃতি। যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়—এ যেন পাহাড়েরই রাজ্য! মুগ্ধ নয়নে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করবে।

পর্যটকরা সাধারণত মাঝিপাড়া পর্যন্তই ঘুরেফিরে আসেন, কিন্তু দে-ছুট সর্বদাই ব্যতিক্রম। তাই আর দেরি না করে এবার ছুটলাম বড় হরিণার দিকে। সর্বনাশ! কিছুটা পথ যেতেই মনে হলো আমরা আর আমাদের মাঝে নেই, যেন অ্যানিমেশন জগতে রয়েছি। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এটা জিকজ্যাক পয়েন্ট। চলতে চলতে মনে হবে, আপনি মোটরবাইকসহ পাহাড়ের ভেতর ঢুকে যাচ্ছেন, কখনো মনে হবে পিসিতে বসে দেখা মোটরবাইকের গেম খেলছেন, আবার কখনোবা মনে হবে, বাইকসহ সবুজের গালিচায় ডিগবাজি দেওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। জিকজ্যাক পয়েন্টের সড়কটুকু সম্পূর্ণ ঢেউ-খেলানো পাহাড়ের মাঝে নির্মাণ করা হয়েছে। অনেক উঁচু থেকে বাইক চালিয়ে নিচে নেমে আবার উঁচুতে উঠতে হয়। এঁকেবেঁকে যাওয়া সর্পিল পথ, ওপর থেকে নিচে তাকালে মনে হয় বিশালাকৃতির অ্যানাকোন্ডা তার আপন মনে হেলেদুলে যাচ্ছে। সত্যিই অসাধারণ নির্মাণশৈলী! এপাশটায় না এলে ভ্রমণে অপূর্ণতাই থেকে যেত। ভাড়ায় চালিত বাইকাররা এবার ফিরে যেতে চাইলেন, কিন্তু নেশা আমাদের তুঙ্গে—যেতে হবে আরো দূরে। যেমনটা ইচ্ছা, তেমনটাই বাস্তবায়ন। চলল গাড়ি সামনে। যেতে যেতে বরকল উপজেলার বড় হরিণা ব্রেক। পিচঢালা পথ শেষ, সামনে চলছে নির্মাণকাজ। বাইক রেখে হাইকিং-ট্র্যাকিং। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পাহাড়িদের সঙ্গে সুখ-দুঃখের আলাপ করি। নিরাপত্তার দোহাই তুলে বাইকারদের তাড়া। ২৭ কিলো এলাকায় চাকমা দোকানির তৈরি সুস্বাদু দুধ-চা পান করে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ফিরতি পথ ধরি।
যাতায়াত : ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি/মারিশ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস রয়েছে। মারিশ্যার চৌমুহনী বাজার থেকে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে যাওয়া যাবে মাঝিপাড়া সীমান্ত সড়ক।
থাকা-খাওয়া : খাগড়াছড়ি/মারিশ্যায় মানভেদে বেশ কিছু হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁ রয়েছে।
ছবির ছৈয়াল : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

