পরিমিত মাংস খেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব

ইসরাত জাহান প্রিয়ানা

পরিমিত মাংস খেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি
নিয়ন্ত্রণ সম্ভব

কোরবানির ঈদ মানেই খাওয়া-দাওয়ার বিশেষ আয়োজন। পারিবারিক এই আয়োজনে আমাদের অনেকেরই খাদ্যতালিকায় লাল মাংসের পরিমাণ বেড়ে যায়, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গ্রহণ করা হয়ে যায়। গরু, খাসি, মহিষ ও ভেড়ার মাংস আমাদের শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু পুষ্টি উপাদানের উৎস। এতে ভালো পরিমাণে প্রোটিন, আয়রন, জিংক, কপার, ভিটামিন বি-১২,সেলেনিয়ামসহ বেশ কিছু পুষ্টি উপাদান আছে। তবে লাল মাংস ভালো হলেও অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত গ্রহণ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং আমাদের রেড মিট গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিমাণটা বুঝে খাওয়া উচিত। তাই লাল মাংস পুরোপুরি বাদ দেওয়ার চেয়ে পরিমিত, সঠিক রান্না পদ্ধতি ও ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী গ্রহণ করাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

লাল মাংসে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদান শরীরের পেশি গঠন, রক্ত তৈরি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো ও শক্তি উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী নারী ও দুর্বল ব্যক্তিরা (কম ওজনের ব্যক্তি) পরিমিত লাল মাংস খেলে উপকার পেতে পারে। তবে উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত গ্রহণ শরীরে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, কোলেস্টেরল ও অতিরিক্ত প্রোটিনের চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সাধারণত সুস্থ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য সপ্তাহে প্রায় ৩৫০-৫০০ গ্রাম রান্না করা লাল মাংস নিরাপদ সীমার মধ্যে ধরা হয়। তবে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী পরিমাণ পরিবর্তিত হয়। প্রতিদিন খাওয়ার পরিবর্তে সপ্তাহে দু-তিন দিন পরিমিত পরিমাণে খাওয়া ভালো। এক বেলায় প্রায় ৬০ থেকে ৯০ গ্রাম রান্না করা মাংস গ্রহণ যথেষ্ট। অনেকেই একসঙ্গে অতিরিক্ত মাংস খেয়ে ফেলেন, যার ফলে হজমের সমস্যা, গ্যাস্ট্রিক, অস্বস্তি, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ফাঁপা বা অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের আশঙ্কা তৈরি হয়।

লাল মাংস গ্রহণের সময় কোন অংশের মাংস বেছে নিচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চর্বিযুক্ত অংশের পরিবর্তে কম চর্বিযুক্ত লিন অংশ (সিনা) বেছে নেওয়া ভালো। দৃশ্যমান অতিরিক্ত চর্বি ও চামড়া বাদ দিলে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ কমে যায়। পাশাপাশি একইসঙ্গে অতিরিক্ত তেল, ঘি বা মাখন ব্যবহার না করে কম তেলে রান্না করা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।

এমনকি রান্নার পদ্ধতিও স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া বা ধোঁয়ায় ঝলসানো মাংসে ক্ষতিকর কিছু যৌগ তৈরি হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। এতে কার্সিনোজেনিক উপাদান থাকে। তাই ডিপ ফ্রাই বা অতিরিক্ত বারবিকিউয়ের পরিবর্তে সিদ্ধ, স্টু, গ্রিল বা কম তেলে রান্না করা ভালো। মাংসের সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি, সালাদ ও আঁশযুক্ত খাবার রাখলে এক্ষেত্রে হজম সহজ হয় এবং অতিরিক্ত চর্বির প্রভাবও কিছুটা কমে।

যাদের উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, উচ্চ কোলেস্টেরল বা স্থূলতার সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে লাল মাংস গ্রহণ আরো নিয়ন্ত্রিত হওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত লবণ, চর্বি ও প্রসেসড মাংস এড়িয়ে কম পরিমাণে গ্রহণ করতে হবে। সারা দিনে ১০০ গ্রামের বেশি গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকাটাই নিরাপদ। বিশেষ করে প্রসেসড মিট, যেমন সসেজ, নাগেট বা অতিরিক্ত সংরক্ষিত মাংস নিয়মিত খাওয়া স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে সতর্কতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ অতিরিক্ত প্রোটিন কিডনির ওপর বাড়তি চাপ ফেলে এবং কিডনির কার্যক্ষমতা আরো কমে যেতে পারে। যাদের কিডনি ফাংশন কমে গেছে বা ক্রিয়েটিনিন বেশি, তাদের চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রোটিনের পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত। অনেক ক্ষেত্রে অল্প পরিমাণ মাংস অনুমোদিত হলেও তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই প্রত্যেকের জন্য আলাদা পরিমাণ নির্ধারণ করে গ্রহণ করা প্রয়োজন।

লাল মাংস খাওয়ার সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যালেন্স করা। শুধু মাংস খেয়ে অন্যান্য খাবার বাদ দিলে শরীরে পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল ও গোটা শস্যও রাখতে হবে।

মনে রাখতে হবে, রেড মিট নিজে ক্ষতিকর নয়, বরং অতিরিক্ত, অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাস্থ্যকর উপায়ে গ্রহণ করাই মূল সমস্যার কারণ। তাই নিজের বয়স, শারীরিক অবস্থা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জীবনযাত্রা বিবেচনায় রেখে পরিমিত ও সচেতনভাবে লাল মাংস গ্রহণ করাই হবে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস।

পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান প্রিয়ানা

ড্রীম ফার্টিলিটি কেয়ার ও হেমায়েতপুর সেন্ট্রাল হসপিটাল

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন