সবুজের আহ্বানে বৃক্ষমেলায়

সবুজের আহ্বানে বৃক্ষমেলায়

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। আমাদের দেশে সারা বছরই গাছ বা বৃক্ষরোপণ করা যায়। তবে বর্ষায় আকাশজুড়ে থাকে মেঘের ঘনঘটা আর ঝুম বৃষ্টি। শরৎকালে তুলার মতো ভেসে বেড়ানো মেঘ আর হঠাৎ বৃষ্টি! আর এ বৃষ্টিঝরা মৌসুমই চারা গাছ লাগানোর সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। আষাঢ়-শ্রাবণ, ভাদ্র-আশ্বিন—পর্যাপ্ত বৃষ্টির এই চার মাস বৃক্ষরোপণের মোক্ষম মৌসুম।

বিজ্ঞাপন

সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে জাতীয় বৃক্ষমেলা

বৃক্ষরোপণের মৌসুম সামনে রেখে এবারও রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পুরাতন বাণিজ্যমেলার মাঠে ‘জাতীয় বৃক্ষমেলা-২০২৬’ শুরু হয়েছে।

‘বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা-২০২৬ এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬-এর উদ্বোধন করা হয়। সবুজে ঘেরা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ৯ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এই দুই আয়োজনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সবুজ-আহ্বানে-বৃক্ষ-মেলায়-২

বৃক্ষমেলার সময়সূচি

জাতীয় বৃক্ষমেলা-২০২৬ প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকছে। এটি ৯ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ৮ আগস্ট পর্যন্ত চলবে।

বৃক্ষমেলা ও প্রয়োজনীয় তথ্য

নতুন চারা রোপণের জন্য প্রয়োজন ভালো মানের গাছের চারা। আর সে চাহিদা পূরণের অন্যতম ঠিকানা বৃক্ষমেলা। প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় এবারো চলছে ম্যাসব্যাপী জাতীয় বৃক্ষমেলা। সবুজপ্রেমীদের জন্য এখানে মিলছে নানা জাতের ফলদ, বনজ, ঔষধি ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছের চারা। সবুজের সমারোহে জমজমাট এবারের মেলা প্রাঙ্গণ। এবারের মেলায় প্রায় আড়াই হাজার প্রজাতির গাছ রয়েছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ঢাকার জাতীয় বৃক্ষমেলায় অংশ নিয়েছে ১২০টি স্টল। এর মধ্যে ২২টি ডাবল নার্সারি স্টল, ৪৭টি সিঙ্গেল নার্সারি স্টল, ১৪টি নন-নার্সারি স্টল এবং ১০টি সরকারি নার্সারি স্টল রয়েছে। এ ছাড়া দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে মেলা প্রাঙ্গণে বন অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণকক্ষ, তথ্যকেন্দ্র, মেডিকেল বা প্রাথমিক চিকিৎসা, ব্রেস্টফিডিং কর্নার, বয়স্কদের জন্য বিশ্রামকক্ষ এবং মিডিয়া কর্নারেরও সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

মেলায় যেসব গাছ পাওয়া যাচ্ছে

বৃক্ষমেলায় এবারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ দেশি-বিদেশি বৈচিত্র্যময় ফল, ফুল, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী গাছের চারা। বিশেষ করে ইনডোর প্লান্ট বা ঘরের ভেতরে আবদ্ধ জায়গার জন্য উপযোগী গাছ দিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের মেলা।

মেলায় ফুলের চেয়ে গাছে ঝুলে থাকা রঙিন ফলেই আটকে যাচ্ছে সবার চোখ। এবার মেলায় ঢোকার পরই সারি সারি আম গাছে ঝুলে থাকা কাঁচা-পাকা আম সবার নজর কাড়ছে।আমের মাঝে আছে লাল-গোলাপি রঙের চিয়াংমাই, কিং আব চাকাপাত, জাপানের মিয়াজাকি, আমেরিকান রেড পালমারসহ অনেক জাতের রঙিন আম। আরো আছে রঙিন রামবুটান, লটকন, ডালিম, জাম, অ্যাভাকাডো, মিসরীয় ডুমুর, কামরাঙা, সফেদা, ডেউয়া, বিলাতি গাব, আতা, সরিফা, লেবু, বাতাবিলেবু, লিচু, পেয়ারা, ডালিম, কুলড্রাগন ফল, স্ট্রবেরি, কিউই ও কাজুবাদাম, রাম্বুটান, অ্যাভোকাডো, পার্সিমন ও ভিয়েতনামী কাঁঠাল, অ্যাবিউ ও আমাজনের হলুদ সফেদা, আমলকীসহ বিভিন্ন রকম ফলদ গাছ।

এ ছাড়া মেলায় রয়েছে প্রায় এক হাজার প্রজাতির শোভাবর্ধনকারী গাছ ও পাতাবাহার, যার মধ্যে ইনডোর প্লান্ট ক্রেতাদের নজর কাড়ছে। শোভাবর্ধক গাছ সানসেভেরিয়া, পিটুনিয়া, অ্যানথুরিয়াম, অ্যাগলোনিমা, মনস্টেরা, লাকি ব্যাম্বো, হুপারজিয়া, এয়ার প্ল্যান্ট, এক্সোটিক অর্কিড, বাগান বিলাস।

সবুজ-আহ্বানে-বৃক্ষ-মেলায়-৩

আরো রয়েছে দুর্লভ ঔষধি গাছ, ক্যাকটাস, নানা প্রজাতির বাঁশ (প্রায় ৬০ জাতের), বেইলমসহ বিভিন্ন বুনো ও কাঠজাতীয় গাছের চারা।

এছাড়া বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে আছে দীর্ঘ ৪০ বছরের নান্দনিক বনসাই গাছ। মেলায় বনসাই গাছের দাম প্রকারভেদে ছয় হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

ফুলের মধ্যে গোলাপ, জবা, জারবেরা, অলকানন্দা, কাঠগোলাপ, বাগানবিলাস এবং পদ্ম, শাপলার মতো জলজ ফুলও। আছে মাটি ছাড়াই ঝুলে থাকা হরেক রঙের অর্কিড ফুল। কাঁটায় ঘেরা সবুজ ক্যাকটাস ও রঙিন মুকুট মাথার ক্যাকটাসও রয়েছে।

শুধু গাছই নয়, আছে গাছ রোপণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী—জৈবসার, কাস্তে, নিড়ানি, শাবল, গ্লাভস, পানি দেওয়ার ঝাঁজরিসহ বাগানের জন্য প্রয়োজনীয় নানা অনুষঙ্গ। তাছাড়াও বিনামূল্যে বাগানবিষয়ক পরামর্শ নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে।

গাছের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে

বৃক্ষমেলায় আগত ক্রেতা ও দর্শণার্থীরা মেলায় বিভিন্ন ধরনের এবং নানা প্রজাতির ফল-ফুলের গাছ দেখে আনন্দিত। বিস্তৃত পরিসরে সবুজের দৃষ্টিনন্দন আয়োজন দেখে কেউ কেউ বিস্ময়ও প্রকাশ করেন। মেলায় ক্রেতার সংখ্যা এবং গাছের প্রতি ভালোবাসা প্রতি বছরই বাড়ছে, যা জনসচেতনতা ও আগ্রহের ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।

উত্তরা থেকে ফুয়াদ মল্লিক ও মনিরা তার পরিবারের সবাইকে নিয়ে মেলায় এসেছেন। মনিরা জানান, তারা প্রতি বছর বৃক্ষমেলায় তিন-চারবার আসেন; মেলায় এলে তাদের ভালো লাগে। তাদের একটি ছাদবাগান রয়েছে এবং তার পরিবারের ছোট-বড় সবাই গাছ ভালোবাসে। তারা বৃক্ষপ্রেমী পরিবার। সেই বাগানের জন্য গাছ কিনতেই তারা মেলায় এসেছেন। তারা লিচু, আম ও অর্কিড ফুলের গাছ কিনেছেন।

যাত্রাবাড়ী থেকে মেলায় আসা এক বৃক্ষপ্রেমী জানান, মূলত ছাদবাগান গড়ে তুলতে মেলা থেকে গাছের চারা কিনতে এসেছেন। আজিমপুর থেকে আসা ক্রেতা মাহিদুল ইসলাম বলেন, এবার মেলায় আম গাছের এত সংগ্রহ দেখে তিনি আপ্লুত। বারোমাসি ফলের চারা কিনতেই তার মেলায় আসা। মেলায় এক সঙ্গে অনেক নার্সারির স্টল পাওয়া যায়। তাই এই মেলার প্রতি তার বেশি আগ্রহ। তিনিও স্ত্রী-কন্যা সঙ্গে নিয়ে মেলায় এসেছেন।

বারান্দা ও নিজের রুমের সৌন্দর্য বাড়াতে গাছ কিনতে আসা শিক্ষার্থী সামিরা বলেন, ‘গাছ দেখতে খুব ভালো লাগে। তাই মেলায় আসা। নিজের বারান্দার জন্য কিছু সুন্দর ফুলের গাছ ও ক্যাকটাস কেনার ইচ্ছা আছে।’

সবুজ-আহ্বানে-বৃক্ষ-মেলায়-৪

মেলায় কথা হয় রংপুর, কিশোরগঞ্জ, সাভার থেকে আসা কয়েকজন নার্সারি মালিকের সঙ্গে। এসব গাছপ্রেমী এবারের বৃক্ষমেলা প্রসঙ্গে জানান, তাদের নার্সারিতে সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০ প্রজাতির গাছ আছে।

এসব গাছের দাম জানতে চাইলে তারা বলেন, আমরা প্রতিবছরই মেলায় নার্সারির চেয়ে অনেক কম দামে গাছ বিক্রি করে থাকি।

বিক্রেতারা প্রজাতি ও গাছের বয়সভেদে ১০০ থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে গাছ বিক্রি করছেন।

মেলায় অংশ নেওয়া নিরব আহমেদ বলেন, ‘মেলা শুরুর পর থেকেই বেশ বৃষ্টি হচ্ছে; বৃষ্টি কমলেই ক্রেতা-দর্শনার্থীরা আসছেন। তারা মেলা ঘুরে দেখছেন আর পছন্দের কিছু গাছও কিনছেন। আশা করা যায় গতবারের চেয়ে এবারের মেলা ভালো হবে।

বন অধিদপ্তর থেকে মেলায় দায়িত্বরত বন সংরক্ষক ওমর ফারুক বলেন, ‘মেলা শুরুর পর থেকেই বৃষ্টি, তারপরও দর্শনার্থীদের মধ্যে বেশ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। আশা করছি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এবার অনেক বেশি ভালো হবে।’

পরিবার নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন সবুজ-বৈচিত্র্যময় ফুল-ফল, লতাগুল্ম আর নানা জাতের গাছগাছালিতে সাজানো শতাধিক স্টল। স্টলের সামনের খোলা মাঠের নান্দনিক পরিবেশ আর সবুজের নিবিড় সন্নিবেশ। উপভোগ করতে পারবেন গাছের ডালে ডালে ঝুলে থাকা দেশি-বিদেশি নানা বর্ণ আর ধরনের ফল। মেলায় রয়েছে সহস্র ফলের সমাহার। নাম জানা-অজানা শত-সহস্র রকমের ফুলের রূপ দেখে চোখ জুড়াবে, মন হবে বিমোহিত। মন হারিয়ে যাবে বিলুপ্তপ্রায় নানাপ্রকার দৃষ্টিনন্দন গাছের পরশে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন