আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

গুলিয়াখালী—যেখানে ঘাস কথা বলে, সমুদ্র শোনে

ফাতিমা তামান্না

গুলিয়াখালী—যেখানে ঘাস কথা বলে, সমুদ্র শোনে

কাজের চাপ, ব্যস্ততা, শহরের ধুলোবালি, হীনম্মন্যতা, রাজনৈতিক তর্ক—সব মিলিয়ে বুকের ভেতর কোথায় যেন অদৃশ্য পাথর চেপে বসেছিল। নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তবু মনে হচ্ছিল ঠিকমতো শ্বাস নেওয়া হচ্ছে না। মনে হচ্ছিল, আমি এমন এক কোলাহলের ভেতরে বাস করছি, যেখানে নিজের ভেতরের শব্দগুলোও হারিয়ে যায়। নিজেকে নিজের মতো করে পাওয়ার তাগিদ থেকেই যাত্রা। গন্তব্য গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত।

ভোররাতে ঢাকা ছাড়ার সময় শহরটা অন্যরকম লাগছিল। আলো কম, মানুষ কম; অথচ মাথার ভেতর অদ্ভুত এক উত্তেজনা। বাস যখন ধীরে ধীরে শহর ছেড়ে মহাসড়কের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল আমি শুধু স্থান নয়, এক ধরনের মানসিক ভারও পেছনে ফেলে যাচ্ছি। জানালার কাচে ভেসে আসা আলো-ছায়ার খেলায় শহরের পরিচিত দৃশ্যগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল।

বিজ্ঞাপন

সকাল নাগাদ পৌঁছালাম সীতাকুণ্ড বাজারে। সেখানকার দৃশ্য পরিচিত শহরতলির মতো; দোকানপাট, চায়ের কাপে ধোঁয়া, রিকশার টুংটাং। সিএনজি নিয়ে যখন বেড়িবাঁধের দিকে যাত্রা শুরু হলো, দৃশ্য বদলাতে লাগল। কংক্রিটের দেয়াল সরে গিয়ে জায়গা নিল খোলা আকাশ। রাস্তার ধুলোর গন্ধের সঙ্গে মিশে এলো নোনতা বাতাস। বাঁধে নামার পর প্রায় ১৫-২০ মিনিট হাঁটা। এই হাঁটাটাই যেন আসল প্রস্তুতি। শহরের শব্দগুলো মিলিয়ে যায়; সঙ্গী থাকে কেবল বাতাস আর পাখির ডাক।

বাঁধে নেমে প্রথম যে জিনিসটি চোখে পড়ে তা সমুদ্র নয়, ঘাস। বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর, যেন মাটির ওপর বিছানো এক জীবন্ত কার্পেট। আঁকাবাঁকা সরু খাল সবুজের শরীর কেটে এগিয়ে গেছে। ভাটার সময় খালের গায়ে কাদার নকশা, ছোট কাঁকড়ার দাগ আর শ্যাওলার রেখা দেখা যায়। জোয়ার এলে সেই খালগুলো নীল জলে ভরে ওঠে এবং সবুজের ভেতর ছোট ছোট নদীর মতো ছড়িয়ে পড়ে। এখানেই গুলিয়াখালীর প্রথম বিস্ময়; সমুদ্র তার উপস্থিতি জানান দেয় ধীর তালে।

এই জায়গা একসময় ছিল জেলেদের নিরিবিলি মাছ ধরার স্থান। স্থানীয়দের ভাষ্যে, ২০১৪ সালের দিকে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী এখানে ঘুরে ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে জায়গাটি পরিচিতি পেতে শুরু করে। ধীরে ধীরে ভ্রমণপিপাসুরা আসেন। তবু এখনো এখানে বড় রিসোর্ট, উঁচু হোটেল কিংবা সারি সারি দোকানের দখল নেই। এই অনাড়ম্বরতাই গুলিয়াখালীর সৌন্দর্য।

চট্টগ্রাম জেলার উপকূলে অবস্থিত এই সৈকত অন্য সব সমুদ্রসৈকত থেকে আলাদা। এখানে বালুকাবেলা দীর্ঘ নয়—নেই কক্সবাজারের মতো সারি সারি হোটেল, কিংবা দোকানের কোলাহল; আছে বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাস, সরু খাল, আর দূরে নীল পাহাড়ের রেখা। সকালের আলো যখন ঘাসের ডগায় পড়ে, পুরো জায়গাটা যেন জাদুবাস্তব এক অসাধারণ দৃশ্য হয়ে ওঠে—পায়ের নিচে ভেজা ঘাস, সামনে সাগর, মাথার ওপর বিশাল আকাশ।

ড়ড়ড়

যখন প্রথম সাগরটা চোখে পড়ল, মনে হলো বুকের ভেতরের সেই অদৃশ্য পাথরটা একটু নড়ে উঠেছে। গুলিয়াখালীর বিশেষত্বই হলো এর ঘাসে ঢাকা তীরভূমি। জোয়ারে পানি উঠে এসে ঘাসের গোড়া ভিজিয়ে দেয়; ভাটায় সরে গেলে তৈরি হয় ছোট ছোট খাল। সেই খালের ধারে দাঁড়িয়ে সাগরের দিকে তাকালে মনে হয়—এ যেন প্রকৃতির নিজস্ব ক্যানভাস, যেখানে পানি আর জমি পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে।

আমি খালি পায়ে ঘাসের ওপর হাঁটলাম। মাটির গন্ধে ভেজা বাতাস বুকভরে নিলাম। হাঁটতে হাঁটতে পায়ের নিচে নরম মাটি, কোথাও ভেজা কাদা, কোথাও শক্ত ঘাস। চারপাশে কেওড়া গাছ; তাদের শ্বাসমূল মাটির ওপর উঠে আছে, যেন ছোট ছোট শিকড়ের বন। বাতাস ঢুকে সেই শ্বাসমূলের ফাঁক দিয়ে মৃদু শব্দ তোলে। এখানে শব্দ কম, কিন্তু নিঃশব্দ নয়; পাখির ডাক আছে, দূরে ইঞ্জিনচালিত নৌকার গুঞ্জন আছে, বাতাসের ছোঁয়া আছে।

সবুজ পেরিয়ে হঠাৎ করেই দিগন্তজোড়া জলরাশি চোখে পড়ে। সমুদ্র এখানে হঠাৎ বিস্ফোরিত হয় না; ধীরে সামনে আসে। ঢেউ এগিয়ে এসে ঘাসের কিনার ছুঁয়ে ফিরে যায়। জল আর জমির মাঝের এই নরম সংযোগই গুলিয়াখালীর স্বাক্ষর। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়, মন স্থির রাখার জন্য প্রকৃতির এ এক অপূর্ব নাটকীয়তা।

বিকালে দৃশ্য বদলে যায়। সূর্যের আলো পশ্চিমে হেলে পড়লে আকাশের রঙ স্তরে স্তরে পাল্টায়। হালকা হলুদ থেকে কমলা, কমলা থেকে লাল, শেষে বেগুনি। সেই রঙ খালের জলে প্রতিফলিত হয়ে দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। কেওড়া গাছের ছায়া লম্বা হয়ে ঘাসের ওপর পড়ে। দূরে জেলেদের নৌকা কালো রেখার মতো স্থির হয়ে থাকে। সূর্যাস্তের এই সময়টুকুতে গুলিয়াখালী কাব্যিক হয়ে ওঠে।

স্থানীয়দের মতে, একসময় এখানে ‘গুলিয়া’ নামে এক ধরনের ঘাস প্রচুর জন্মাত; সেখান থেকেই নাম গুলিয়াখালী। পর্যটকের আনাগোনা বেড়েছে গত এক দশকে। তবু জায়গাটি তার স্বভাব বদলায়নি; এখনো ধীরে ধীরে নিজেকে উন্মোচন করছে।

সীতাকুণ্ড ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রয়েছে চন্দ্রনাথ পাহাড়, প্রাচীন মন্দির ও ধর্মীয় নিদর্শন। ফলে গুলিয়াখালী ভ্রমণ মানে শুধু সৈকত দেখা নয়; পুরো অঞ্চলের এক ভিন্ন রূপের সঙ্গে পরিচয়।

গুলিয়াখালীর ভূপ্রকৃতি উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জোয়ার-ভাটা প্রতিদিন ভূমির আকার পাল্টায়। ভাটায় কাদার শরীরে সূক্ষ্ম ফাটল ও রেখা দেখা যায়; জোয়ারে সেগুলো মিলিয়ে যায়। কেওড়া বন সমুদ্রের দিকে বিস্তৃত ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষক হিসেবে কাজ করে। এখানে দাঁড়িয়ে জলবায়ু ও প্রকৃতির সম্পর্ক চোখে দেখা যায়।

সকালের দৃশ্য আলাদা। কুয়াশা সরে গেলে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ঘাসের মাথায় পড়ে। পাখির দল উড়ে যায়। দূরে পাহাড়ের রেখা স্পষ্ট হয়। কাছেই দাঁড়িয়ে থাকে চন্দ্রনাথ পাহাড়। প্রায় ৩৬৫ মিটার উচ্চতার এই পাহাড়ে উঠলে সমুদ্র, সবুজ প্রান্তর আর জনপদের সম্মিলিত দৃশ্য দেখা যায়। অনেকেই সকালবেলা পাহাড়ে উঠে দুপুরের পর গুলিয়াখালীতে আসেন; এক দিনে পাহাড় ও সমুদ্রের বৈপরীত্য অনুভব করেন।

যাতায়াত তুলনামূলকভাবে সহজ। ঢাকা থেকে বাসে সীতাকুণ্ডে নামা যায়। নন-এসি ও এসি উভয় বাসের ব্যবস্থাই আছে। ট্রেনে চট্টগ্রাম বা ফেনী হয়ে যাওয়া সম্ভব। সীতাকুণ্ড বাজার থেকে সিএনজি নিয়ে বেড়িবাঁধে পৌঁছাতে সময় খুবই কম লাগে। সন্ধ্যার পর যানবাহন কমে যায়, তাই ফেরার পরিকল্পনা আগে থেকে করাই ভালো।

খরচও বেশি নয়। ঢাকা থেকে যাওয়া-আসা মিলিয়ে জনপ্রতি দুই থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে ডে-ট্রিপ সম্ভব। চট্টগ্রামে থেকে গেলে আরো সাশ্রয়ী। জেলেদের নৌকা ভাড়া করলে দরদাম করে নেওয়া ভালো। সাধারণত ১ হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে পুরো নৌকা রিজার্ভ করা যায়।

সৈকতে থাকার ব্যবস্থা নেই। সীতাকুণ্ড বাজারে সাধারণ মানের হোটেল পাওয়া যায়, তবে খাবারের দোকান সীমিত। তাই প্রয়োজনীয় পানি ও হালকা খাবার সঙ্গে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। সবচেয়ে জরুরি প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বশীল থাকা। বিশেষ কর যেখানে-সেখানে কোনোরকম ময়লা বা প্লাস্টিক ফেলা যাবে না। ঘাস ও কেওড়া বনের যেন ক্ষতি না হয়, সেদিকে যত্নবান হতে হবে।

গুলিয়াখালীতে দাঁড়িয়ে শহরের ব্যস্ততার সঙ্গে এর ফারাক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে আকাশ বড়, দিগন্ত খোলা। বাতাসে লবণাক্ততা জমে, কিন্তু দৃশ্যের সরলতা মনকে স্থির করে। কোনো কৃত্রিম বিনোদন নেই; প্রকৃতির নিজের বিন্যাসই এখানে প্রধান আকর্ষণ।

সবুজ ঘাসের ফাঁকে দাঁড়িয়ে খালের পানিতে আকাশের প্রতিফলন দেখলে মনে হয়, দৃশ্যটি যেন দুবার ঘটছে—একবার ওপরে, একবার নিচে। দূরে একদল তরুণ ফুটবল খেলছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ নীরবে বসে আছে। মানুষের উপস্থিতি আছে, কিন্তু প্রকৃতি প্রাধান্য হারায় না।

তত

অক্টোবর থেকে মার্চ এখানে ভ্রমণের সবচেয়ে আরামদায়ক সময়। বর্ষায় সবুজ আরো উজ্জ্বল হয়, তবে কাদা চলাচলে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিকালের আলো সবচেয়ে নাটকীয়, তবে সকালের পরিবেশ সবচেয়ে শান্ত। জোয়ার-ভাটার সময় জেনে গেলে খালের রূপান্তর কাছ থেকে দেখা যায়। জোয়ার-ভাটার কারণে একই জায়গা দিনে দুবার ভিন্ন হয়ে ওঠে।

ফেরার সময় বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালে দেখা যায়, সবুজের ভেতর নীল জলরাশি মিশে গেছে। সূর্য ডুবে গেলে আকাশ ধীরে অন্ধকার হয়; জেলেদের নৌকায় ছোট বাতি জ্বলে ওঠে। বাতাস ঠান্ডা হয়ে আসে। দিনের দৃশ্যগুলো তখন মনে ভেসে ওঠে—স্তরে স্তরে ঘাস, খাল, কেওড়া বন, সমুদ্র, পাহাড়।

গুলিয়াখালী কোনো অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি দেয় না। এটি ধীরে ধীরে নিজের দৃশ্য খুলে ধরে। যে যত সময় দেয়, সে তত গভীরভাবে দেখতে পারে। এখানে এসে বোঝা যায়, উপকূল শুধু বালুর নয়; সবুজেরও হতে পারে। জল শুধু গর্জনের নয়; মৃদু স্রোতেরও হতে পারে। আর ভ্রমণ শুধু দূরত্ব পেরোনো নয়; দৃশ্যের ভেতর দিয়ে হাঁটারও নাম হতে পারে।

এই সৈকতকে যদি চোখ ভরে দেখা যায়, তবে মনে থাকে একটি ছবি—সবুজের ওপর দাঁড়িয়ে দিগন্তজোড়া জলরাশি, তার ওপরে রঙ বদলানো আকাশ। সেই ছবিটুকুই গুলিয়াখালীর আসল রূপ। গুলিয়াখালী চমক দিয়ে অভ্যর্থনা জানায় না; বরং ধীরে ধীরে তার সৌন্দর্য উন্মোচন করে। তাড়াহুড়ো করে এলে হয়তো কিছুই দেখা হবে না। কিন্তু একটু থামলে, ঘাসে বসে বাতাসের গান শুনলে, খালের জলে আকাশের প্রতিফলন দেখলে বোঝা যাবে—এই সৈকত আসলে নীরবতার এক বিস্তৃত কবিতা।

সমুদ্রের কাছে গিয়ে যদি মনে হয়, আপনি নিজের কাছেও একটু এগিয়ে গেলেন, তাহলে বুঝবেন, গুলিয়াখালী আপনাকে গ্রহণ করেছে। এটি কেবল একটি সমুদ্রসৈকত নয়; এক ধরনের আত্মদর্শনের জায়গা। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমরা যত জটিলতায় নিজেদের জড়াই, প্রকৃতি ততটাই সরল। শহরের রাজনৈতিক তর্ক, ব্যস্ততা, চারপাশের মানুষের নোংরামি, হীনতা, ব্যক্তিগত ক্লান্তি—সব মিলিয়ে বুকের ভেতর যে ভার জমে, তা এখানে এলে হালকা হয়ে যায়। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, জীবনের ঢেউও জোয়ার-ভাটার মতোই—সবসময় উচ্চতা থাকে না, আবার সবসময় শূন্যতাও নয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন