বাঙালির আভিজাত্যে কাঁসার তৈজসপত্র

আমানুর রহমান

বাঙালির আভিজাত্যে কাঁসার তৈজসপত্র

বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো কাঁসার তৈজসপত্র। আধুনিকতার ভিড়ে এর ব্যবহার কিছুটা কমলেও আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। শিকড়ের সন্ধানে খাঁটি কাঁসা চেনার উপায়, বর্তমান বাজারদর, স্বাস্থ্যগুণ ও যত্ন-আত্তির খুঁটিনাটি বিষয় তুলে ধরেছেন আমানুর রহমান

বিজ্ঞাপন

খাঁটি কাঁসার সন্ধানে

খাঁটি কাঁসার কথা উঠলেই সবার আগে মনে পড়ে ঢাকার অদূরে অবস্থিত ধামরাইয়ের কথা। ধামরাইয়ের কাঁসা-পিতলের কারিগরদের নিপুণ হাতের কাজের সুখ্যাতি আজ বিশ্বজোড়া। তবে শুধু ধামরাই নয়; রাজধানীর শাঁখারিবাজার ও তাঁতীবাজার, টাঙ্গাইলের কাগমারী, জামালপুরের ইসলামপুর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটেও ঐতিহ্যবাহী ও খাঁটি কাঁসার পণ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিয়ের তত্ত্ব সাজানো কিংবা পূজার যাবতীয় সামগ্রী কেনার জন্য শাঁখারিবাজারের শত বছরের পুরোনো দোকানগুলো আজও ক্রেতাদের কাছে সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয়। শিকড়ের সন্ধানে বের হলে এসব জায়গা থেকেই সংগ্রহ করতে পারেন আপনার পছন্দের ঐতিহ্যবাহী কাঁসার সামগ্রী।

বাজারদরের হিসাব : কাঁসার জিনিসপত্র সাধারণত আধুনিক বাজারের অন্য পণ্যের মতো সংখ্যা বা পিস হিসেবে বিক্রি হয় না, বরং আভিজাত্যের এই প্রতীক ওজনে বিক্রি হয়। বর্তমান বাজারে পণ্যটির মান ও কারুকাজের ওপর ভিত্তি করে প্রতি কেজি খাঁটি কাঁসার মূল্য ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে।

দৈনন্দিন ব্যবহৃত তৈজসপত্রের মধ্যে একটি সাধারণ ওজনের কাঁসার গ্লাসের দাম পড়তে পারে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকার মতো, আর মাঝারি মাপের একটি থালার দাম হতে পারে ১ হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা। এছাড়া খাদ্য পরিবেশনের জন্য কাঁসার বাটি ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা, চামচ ২০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং পানি পানের বড় জগ বা লোটা ২ হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়।

ধর্মীয় আচার ও পূজা-পার্বণেও কাঁসার জিনিসের বিশেষ কদর রয়েছে। পূজার আবশ্যকীয় উপকরণের মধ্যে কাঁসার পঞ্চপ্রদীপ বা আরতি প্রদীপের দাম ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, পূজার ঘণ্টা ৪০০ থেকে এক হাজার টাকা, কোশা-কুশি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং ধূপদানি ৬০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। এছাড়া খোদাই করা নকশাদার বিশেষ পূজার থালির দাম পড়তে পারে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। তবে কাঁসার যেকোনো পাত্রে যদি বিশেষ কারুকাজ কিংবা খোদাই করা সূক্ষ্ম নকশা থাকে, তবে এর শ্রম ও নান্দনিকতার কারণে মূল্য সাধারণ পাত্রের চেয়ে আরো কিছুটা বৃদ্ধি পায়।

ঘরোয়া যত্ন : বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে বিক্রিয়া করে কাঁসার পাত্রে কালচে ছোপ পড়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ঘটনা। তবে সঠিক যত্ন নিলেই এই কালচে ভাব পুরোপুরি দূর করে নতুনের মতো চমক ধরে রাখা সম্ভব। কাঁসা ঝকঝকে ও উজ্জ্বল রাখতে সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং কার্যকর উপাদান হলো তেঁতুল কিংবা পাতিলেবু। তেঁতুলগোলা জল অথবা পাতিলেবুর রসের সঙ্গে সামান্য লবণ বা বেকিং সোডা মিশিয়ে ভালোভাবে মাজলে কাঁসা নতুনের মতো চকচকে হয়ে ওঠে। এছাড়া বর্তমানে বাজারে ‘পীতাম্বরী’ বা ‘রূপম’ নামের বিশেষ পাউডারও কিনতে পাওয়া যায়, যা দিয়ে খুব সহজেই ঘরে বসে বাসনকোসন পরিষ্কার করা সম্ভব। ধোয়ার পর সুতির শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে রাখলে পানির বিশ্রী দাগ পড়ে না।

বাঙালির-আভিজাত্যে-কাঁসার-তৈজসপত্র-2

পলিশিং : অনেক পুরোনো বা দীর্ঘদিন অযত্নে ফেলে রাখা কাঁসার পাত্রে এমন জেদি ও গভীর দাগ পড়ে, যা সাধারণ ঘরোয়া উপায়ে তোলা সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে পাত্রগুলোর পুরোনো জৌলুস ফেরাতে পেশাদার পলিশিংয়ের প্রয়োজন পড়ে, যাকে চলতি ভাষায় ‘জাঁত দেওয়া’ বা ‘মেশিনে ঘষা’ বলা হয়। ঢাকার শাঁখারিবাজার, তাঁতীবাজার কিংবা পাড়া-মহল্লার পুরোনো কাঁসা-পিতল ও স্বর্ণকারের দোকানগুলোয় এই পলিশিংয়ের কাজ করানো যায়। পাত্রের আকার ও দাগের গভীরতার ওপর ভিত্তি করে একটি মাঝারি থালা বা বাটি পলিশ করতে সাধারণত ১০০ থেকে ২৫০ টাকা খরচ হয়। এছাড়া কেজি চুক্তিতে করালে প্রতি কেজি কাঁসা পলিশের জন্য ২০০ থেকে ৪০০ টাকার মতো ব্যয় হতে পারে।

আধ্যাত্মিক ও স্বাস্থ্যগুণ : সনাতন ধর্মে কাঁসাকে অত্যন্ত পবিত্র ও শুদ্ধ ধাতু হিসেবে গণ্য করা হয়। দেবদেবীর নৈবেদ্য বা ভোগ নিবেদন, পূজার জল শঙ্খ বা কোশাতে রাখা থেকে শুরু করে আরতির পঞ্চপ্রদীপ—সবকিছুতেই কাঁসার একচেটিয়া রাজত্ব ও অপরিহার্যতা রয়েছে। এর পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞানেও এর কদর রয়েছে। আয়ুর্বেদশাস্ত্র মতে, কাঁসার পাত্রে নিয়মিত খাবার খেলে বা জল পান করলে তা শরীরে ক্ষারীয় ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি মানুষের হজমশক্তি বাড়ায় এবং একই সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করে। তাই কাঁসার পাত্রের ব্যবহার কেবল আধ্যাত্মিক প্রশান্তিই দেয় না, বরং দৈনন্দিন জীবনে এটি একটি দারুণ স্বাস্থ্যকর ও বৈজ্ঞানিক মাত্রা যোগ করে।

চেনার কৌশল : কাঁসা কেনার সময় ক্রেতাদের অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে। কারণ বর্তমানে বাজারে পিতল বা অন্যান্য সস্তা ধাতুর ওপর প্রলেপ দিয়ে নকল কাঁসা বিক্রি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আসল কাঁসা চেনার সবচেয়ে পুরোনো ও নির্ভরযোগ্য উপায় হলো এর শব্দ। খাঁটি কাঁসার পাত্রে টোকা দিলে বা আঘাত করলে বেশ কিছুক্ষণ ধরে রিনরিনে একটি তীক্ষ্ণ ও মিষ্টি শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়, যাকে কারিগররা ‘টং’ শব্দ বলেন। এই সুরময় অনুরণন অন্য কোনো ধাতুতে হয় না। এছাড়া খাঁটি কাঁসার রঙ হবে কিছুটা কালচে সোনালি বা ছাই-সোনালি মিশ্রণের। এটি কখনোই অতিরিক্ত চকচকে হলুদ বর্ণের হবে না। কেনার সময় এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখলে সহজেই খাঁটি কাঁসা চেনা সম্ভব হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন