রাজশাহীর বিনোদপুরের একটি তিনতলা বাড়ির ছাদ। সেখানে গেলেই মনে হবে যেন শহরের কংক্রিটের ভিড়ে লুকিয়ে আছে ছোট্ট এক সবুজ অরণ্য। সারি সারি ফল, ফুল, ঔষধি, শৌখিন ও বিরল প্রজাতির গাছের সমাহারে মুখর পুরো ছাদ। গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত শারমিন আক্তার। কয়েক বছর আগেও তিনি শখের বশে কয়েকটি গাছ লাগিয়েছিলেন। আজ সেই শখই তাকে এনে দিয়েছে সফল উদ্যোক্তার পরিচয়, মাসে লাখ টাকা আয় এবং জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃতি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী নিজের ছাদবাগান থেকে বিভিন্ন প্রজাতির চারা ও টব বিক্রি করে এখন বছরে প্রায় ১২ লাখ টাকা আয় করছেন। পরিবেশবান্ধব এ উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার–২০২৫’-এ ‘ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সৃজিত ছাদবাগান’ বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন তিনি।
বিনোদপুর এলাকায় তার বাড়ির নিচতলা ও ছাদজুড়ে বিস্তৃত এ বাগান স্থানীয়দের কাছে এখন ‘কৃষিবাড়ি’নামে পরিচিত। তবে এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘নেচার্স টাচ’। শত শত গাছের সমাহারে গড়ে ওঠা এই ছাদবাগান এখন শুধু সবুজের ঠিকানাই নয়, বরং পরিবেশ সচেতনতা ও স্বনির্ভরতারও একটি অনন্য উদাহরণ।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো ছাদজুড়ে যেন সবুজের এক অনন্য জগৎ। দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির গাছ, রঙিন ফুল ও বাহারি পাতার সমাহারে বাগানটি যেন শহরের মাঝেই এক টুকরো প্রকৃতি। লাল, নীল, বেগুনি, হলুদ ও সবুজের রঙিন বৈচিত্র্যে সাজানো প্রতিটি কোণ সবাইকে মুগ্ধ করে।
বর্তমানে অনলাইন ও অফলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা এবং টব বিক্রি করছেন তিনি। তার এ উদ্যোগে বর্তমানে তিনজন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। ভবিষ্যতে রাজশাহীতে অর্ধশতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
২০২২ সালে নিজ বাড়ির ছাদে ছোট পরিসরে বাগান শুরু করেন শারমিন। বর্তমানে প্রায় ২৬০০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে তিন স্তরের আধুনিক ছাদবাগান গড়ে তুলেছেন তিনি। এখানে দেশি-বিদেশি প্রায় ১১০ প্রজাতির সাড়ে তিন হাজারের বেশি গাছ রয়েছে।
ফল-সবজিরও চাষ হচ্ছে
শারমিনের বাগানে রয়েছে ইনডোর ও আউটডোর গাছ, ফুল, ফল, সবজি, ঔষধি, বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় নানা প্রজাতির উদ্ভিদ। ইনডোর গাছের মধ্যে রয়েছে অ্যাডেনিয়াম, অ্যাগলোনিমা, এনথুরিয়াম, পিস লিলি, স্নেক প্ল্যান্ট, সাকুলেন্ট, ইউফোরবিয়া, পাথোস, জেডজেড প্ল্যান্ট, ফার্ন, ক্যাকটাস ও মানি প্লান্ট।
ঔষধি গাছের মধ্যে রয়েছে লেমন গ্রাস, স্টেভিয়া, কালমেঘ, ইনসুলিন গাছ, নিম, রোজমেরি, অরেগানো, পাথরকুচি ও উলটকম্বল। এ ছাড়া পারিজাত, মিষ্টি তেঁতুল, সাদা জাম, ফিডল লিফ ফিগ, সাইকাসসহ নানা বিরল প্রজাতির গাছও সংরক্ষণ করছেন তিনি।
একইসঙ্গে কর্পূর, অশোক, হিজল, পলাশ, মহুয়া ও বটের মতো হুমকির মুখে থাকা দেশি গাছ সংরক্ষণেও কাজ করছেন শারমিন। এ ছাড়া আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, স্ট্রবেরি, রামবুটান, অ্যাভোকাডো, আপেলসহ বিভিন্ন ফলদ গাছ এবং মরিচ, টমেটো, লাউ, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শসা, বেগুন, করলা, সজনেসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষও করছেন তিনি।
কটূক্তি পেরিয়ে জাতীয় স্বীকৃতি
শারমিন আক্তার বলেন, ছাদবাগান শুধু শখের বিষয় নয়, এটি পরিবেশ রক্ষা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের একটি সম্ভাবনাময় খাত। আমি চাই আরো বেশি মানুষ ছাদবাগানে আগ্রহী হোক এবং এটিকে আয়ের একটি মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলুক।
তিনি আরো বলেন, আমি পড়াশোনা শেষ করেছি বিজনেস স্টাডিজ থেকে। কিন্তু আমার ছোট থেকেই স্বপ্ন ছিল কৃষি নিয়ে কাজ করা। পরিবার থেকে বারণ করা সত্ত্বেও আমি কৃষিকাজ ছাড়িনি। এ যাত্রায় আমার স্বামী সব সময় পাশে ছিলেন এবং বাগানের একটি অংশে সময় দিয়ে কাজ করেন। ভবিষ্যতে আমি কৃষিতে বিপ্লব ঘটাতে চাই এবং রাজশাহীতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে বদ্ধপরিকর।
প্রথমে অনেক কটূ কথা শুনতে হয়েছে জানিয়ে শারমিন আক্তার বলেন, বাগান করার শুরুতে অনেকেই ছোট করে দেখত এবং অনেক কটূ কথা বলত। এখন বাগান বড় হওয়ায় এবং প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে জাতীয় পুরস্কার পাওয়ায় সবাই প্রশংসা করছেন। এ ছাড়া কীভাবে বাগান করে আয় করা যায়, সে সম্পর্কে এখন পরামর্শ চায়। তাই কখনো পেছনে তাকানো যাবে না।
নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার পরামর্শ
নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার বিষয়ে শারমিন বলেন, সবারই উচিত স্বাবলম্বী হওয়া। বাসার কাজ শেষে টেলিভিশন দেখা বা ফেসবুকিং না করে কোনো একটি কাজে সময় দেওয়া উচিত। সে কাজটি একসময় আপনার আয়ের উৎস হয়ে উঠবে। প্রথমে ধাক্কা খাবেন; এতে বিচলিত না হয়ে সামনে এগিয়ে গেলে ভবিষ্যতে ভালো কিছু হবে, ইনশাল্লাহ।
শারমিনের স্বামী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ছোটবেলা থেকে গাছের প্রতি আমার স্ত্রীর দুর্বলতা ছিল। রাজশাহীর বানেশ্বরে আমি চাকরি করি। আমাদের ছাদবাগানে বেশিরভাগ সময় আমার স্ত্রী পরিচর্যা ও দেখাশোনার কাজ করেন। আমি শুধু বিভিন্ন স্থান থেকে চারা সংগ্রহ করে দিই। বাগানটি এখন বাণিজ্যিকভাবে রূপ নেওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা অর্ডার করছেন। চারাগুলো কুরিয়ারের মাধ্যমে তাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে আমার স্ত্রীকে সহযোগিতা করি। জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পেছনে আমার স্ত্রী অনেক পরিশ্রম করেছেন। তার সাফল্যে আমিও আনন্দিত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

