আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

লেখালেখিই মৌরির পেশা

মোহনা জাহ্নবী

লেখালেখিই মৌরির পেশা

লেখক হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। কিন্তু চাইলেই সৃজনশীল কাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা সহজ নয়। মৌরি মরিয়ম সেই কঠিন কাজটাকেই তার জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন এবং খুব অল্প সময়ে নিজের পাকাপোক্ত অবস্থানও তৈরি করেছেন।

বিজ্ঞাপন

বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় জন্মগ্রহণ করা এই নারীর লেখালেখির হাতেখড়ি অনেক বছর আগে থেকেই। স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল তার প্রথম লেখা। লেখালেখির ইচ্ছাটা কখনো তার পিছু ছাড়েনি। তিনি ভাবতেন, যদি লেখালেখিটাকেই জীবনে পেশা হিসেবে নেওয়া যেত! তার এই ভাবনাকে একদিন বাস্তবে রূপ দেন তিনি।

শুরুর গল্প

২০১৫ সাল থেকে অনলাইনে লিখতে শুরু করেন মৌরি। ‘প্রেমাতাল’ নামে একটা সিরিজ উপন্যাস লেখায় ভার্চুয়াল জগতে বেশ কিছু পাঠক তৈরি হয়ে যায় তার। সেসব পাঠক রোজ ‘প্রেমাতাল’-এর নতুন নতুন পর্বের জন্য অপেক্ষা করতেন। লেখিকা হিসেবে মৌরি মরিয়মের নতুন যাত্রা শুরু হয় এখান থেকেই। অনেক পাঠক তাকে বই প্রকাশ করার জন্য উৎসাহিত করতে থাকেন। কিন্তু নিজের শব্দগুলোকে মলাটবন্দি করার যাত্রাটা কি একদম মসৃণ ছিল?

প্রতিবন্ধকতা

নতুন লেখকদের প্রকাশকরা সাধারণত খুব বেশি গুরুত্ব দেন না। যদিও আস্তে আস্তে এই মনোভাব পরিবর্তন হচ্ছে। মৌরি যখন প্রথম বই প্রকাশ করার জন্য প্রকাশকদের দ্বারস্থ হন, তখন তার ফেসবুক ফলোয়ার ছিলো মাত্র এক হাজার ৭০০। প্রকাশকরা তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে বিব্রত করতেন। ‘সারা জীবনে কী কী বই পড়েছেন, তার তালিকা পাঠান,’ কিংবা ‘আপনার কতজন পাঠক আছে, কতগুলো বই বিক্রি হবে?’—এমন নানা ধরনের প্রশ্ন। এসব প্রশ্ন শুনে মন খারাপ হলেও মনোবল হারাননি এই দৃঢ়চেতা নারী।

আলোর দেখা

২০১৮ সালে তার প্রথম বই (উপন্যাস) ‘প্রেমাতাল’ প্রকাশিত হলো। যে লেখিকার বই প্রকাশকরা প্রকাশ করতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন, তার প্রথম বইই ছুঁয়ে দিল তিন হাজার কপি বিক্রির মাইলফলক! তার এই আলো ছড়িয়ে পড়ল পাঠকজগৎ থেকে শুরু করে প্রকাশনা জগতে। এরপর বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে বই প্রকাশ করার প্রস্তাব আসতে লাগল।

ভাবনার বাস্তবায়ন

২০১৯ সালে ‘অভিমানিনী’ নামে তার আরেকটি উপন্যাস প্রকাশিত হয় এবং বলা বাহুল্য, এই উপন্যাসটিও তাকে এনে দেয় ভিন্ন মাত্রার জনপ্রিয়তা। তখন মৌরি চাকরিজীবী। যখন দেখলেন লেখালেখি করে বেশ ভালো উপার্জন হচ্ছে, যা চাকরি থেকে পাওয়া বার্ষিক আয়কেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তখন লেখালেখিতে পুরোপুরি মনোনিবেশ করার জন্য চাকরি ছেড়ে দিলেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুব কম লেখকই লেখালেখিকেই একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার মতো অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন, তিনি যাদের ভেতর একজন।

প্রকাশিত বইসমূহ

লেখালেখিই যখন পেশা আর নেশা হয়ে যায়, তখন একের পর এক বইয়ের জন্ম হবে, এটাই স্বাভাবিক। লেখিকা মৌরি মরিয়মও প্রেমাতাল এবং অভিমানিনীর পর বিগত কয়েক বছরে বেশ কিছু বই পাঠকদের উপহার দিয়েছেন; যেমন—তোমায় হৃদমাঝারে রাখব, সুখী বিবাহিত ব্যাচেলর, মহাযাত্রা, মহাযাত্রা ২, ফানুস, দুয়ারে দ্বিধার দেয়াল, দেয়াল ভাঙার গান (দুয়ারে দ্বিধার দেয়ালের ২য় খণ্ড), হাওয়াই মিঠাই, শিকদার সাহেবের দিনলিপি (হাওয়াই মিঠাইয়ের ২য় খণ্ড), অলিন্দ অনলে, নাইয়রি, লগ্নজিতা, এক হাজার টাকা ইত্যাদি। ২০২৫ সালের বইমেলায় তার আরেকটি বই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে—‘প্রেম-অপ্রেমের চৈত্রমাস’।

অনুপ্রেরণা

যেকোনো কাজের পেছনেই কিছু না কিছু আমাদের অনুপ্রাণিত করে। লেখালেখি করা বা লেখক হয়ে ওঠার পেছনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে জানতে চাইলে মৌরি মরিয়ম বলেন, ‘আমার অনুপ্রেরণা ছিলেন আমার প্রিয় লেখকেরা, যাদের লেখা পড়তে পড়তে প্রথম লিখতে ইচ্ছা করেছিল। আর এখন আমার অনুপ্রেরণা আমার পাঠকেরা।’

পছন্দের লেখক কে—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমার প্রিয় লেখক অনেক। তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও ড্যান ব্রাউন।’

অনাগত দিনের স্বপ্ন

গল্পে গল্পে এ লেখিকা জানালেন, লেখালেখি নিয়ে তার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন বা পরিকল্পনার কথাও। তার ইচ্ছা ভিন্ন ভিন্ন জনরায় বই লেখা। যে লেখিকা চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করেন, যার বুকের ভেতর অসীম সাহস, তিনি ভিন্ন ভিন্ন জনরায় লিখে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করবেন, এটাই স্বাভাবিক।

অর্জনসমূহ

যেকোনো লেখকের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন পাঠকের ভালোবাসা আর সম্মান পাওয়া। আর এই প্রাপ্তিতে মৌরি মরিয়মের ঝুলি ভরা। এছাড়া তিনি ‘ফানুস’ উপন্যাসের জন্য ‘এক্সিম ব্যাংক অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার ২০২২’ এবং ‘নাইয়রি’ উপন্যাসের জন্য ‘বিটিআই দ্য স্টেলার উইমেন অ্যাওয়ার্ড ২০২৪’ পেয়েছেন।

শেষ কথা

তরুণ লেখকদের উদ্দেশে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই তরুণ। তরুণ হিসেবে আমি যা করি তা হলো প্রচুর পড়াশোনা। প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে, এটা করতেই হবে।’

সবশেষে জানতে চাইলাম, ‘লেখক এবং একজন নাগরিক হিসেবে কেমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন?’ এ প্রশ্নের উত্তরে মৌরি মরিয়ম বলেন, ‘নিরাপদ পরিবেশ, সঠিক শিক্ষাব্যবস্থা ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ দেখতে চাই।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...