রমজানের ঈদের ঠিক ১০ দিন পর কুড়িগ্রামে যাই। সকালে অনেকের কথাবার্তায় ঘুম ভাঙে। উঠে দেখি পাশের ফ্ল্যাটে কাজ চলছে—নতুন ভবন তৈরি হবে। একই সঙ্গে কয়েকজন নারী ও পুরুষ কাজ করছেন। আমি এগিয়ে গিয়ে কাজ ও মজুরি সম্পর্কে জানতে চাই। দু-তিনজনকে জিজ্ঞেস করলেও তারা এড়িয়ে যান। একজন তো ইশারায় পাশের এক পুরুষকে দেখান। বুঝতে পারি, কথা বললে সমস্যা হতে পারে। আমিও সুযোগের অপেক্ষায় থাকি।
অতঃপর মাথায় বোঝা নিয়েই একজন নারী চুপিচুপি বললেন, তাদের (নারীদের) দৈনিক মজুরি ৪০০ টাকা আর পুরুষদের ৫০০। তিনি আবার ইশারা করে বোঝালেন, কথা বললে তিনি বিষয়টি জানিয়ে দেবেন। ভাবলাম, পার্থক্যটা মাত্র ১০০ টাকা। অনেক জায়গায় নারীদের আরো কম মজুরি দেওয়া হয়। তাদের ধারণা, নারীরা কম কাজ করেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে নারীদের কাজের পরিমাণ পুরুষদের চেয়েও বেশি।
খালেদা একজন সেবিকা (নার্স)। তিনি কয়েকটি হাসপাতালে ধারাবাহিকভাবে সেবিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করায় তার দুই সন্তান তার কাছেই থাকে। কিছুদিন সন্তানরা গ্রামে নানাবাড়িতে থাকলেও পড়াশোনার কথা চিন্তা করে তিনি তাদের শহরে নিয়ে আসেন।
খালেদা বর্তমানে একজন সিনিয়র সেবিকা। তিনি একটি নতুন ও নামকরা হাসপাতালে কর্মরত। নতুন হাসপাতাল হওয়ায় সেখানে অনেক সেবিকা নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে নামকরা হাসপাতাল থেকে আসা সেবিকাদের বেতন তার বেতনের চেয়ে দ্বিগুণ। অথচ খালেদার অভিজ্ঞতাও আছে এবং তিনি সিনিয়র।
অন্যদের বেতনের পরিমাণ শুনে তিনি অবাক হন। এ বিষয়ে অফিসে কথা বললে তাকে বেতন বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হয়। দুই মাস পর তার বেতন বাড়ানো হলেও, সেই নামকরা হাসপাতাল থেকে আসা সেবিকাদের বেতন আরো দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি করা হয়।
পরে অফিসে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে খালেদা নিজের চাকরি হারান। খালেদার অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের কাছে অনেকের সিভি রয়েছে; তাকে যে বেতন দেওয়া হয়, সেই বেতনে তারা নতুন দুজন কর্মী নিয়োগ দিতে পারবে।
নন-এমপিওভুক্ত একটি স্কুলে চার বছর ধরে চাকরি করেন দিলারা। এরই মধ্যে তার বিয়ে হয়। সন্তান জন্মের সময় ঘনিয়ে এলে তিনি দুশ্চিন্তায় পড়েন—ছুটিতে গেলে চাকরিটি থাকবে তো? পরে তিনি জানতে পারেন, স্কুল থেকে তিনি তিন মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন। তবে ছুটি শেষে কাজে যোগ দিতে পারলেও সেই সময়ের কোনো বেতন পাবেন না; আগের বেতনে চাকরি চালিয়ে যেতে হবে।
সব দিক বিবেচনা করে তিনি ভাবলেন, খারাপের মধ্যেও কিছুটা ভালো আছে। সেই অনুযায়ী তিনি ছুটিতে যান এবং তিন মাস পর আবার কাজে যোগ দেন। ঘরে মা থাকায় সন্তানের দেখাশোনার দায়িত্ব মায়ের ওপর দিয়ে তিনি চাকরিতে ফিরতে সক্ষম হন।
তবে দিলারার মতো সুযোগ তামান্না পাননি। তিন মাসের সন্তান রেখে কাজে ফেরার মতো পরিস্থিতি তার ছিল না। ফলে তিনি চাকরিতে ফিরতে পারেননি। পরে দুই বছর পর নতুন বেতনে (অর্থাৎ, শুরুতে যে বেতন দেওয়া হয়) তিনি একই স্কুলে আবার যোগ দেন।
একজন নিয়োগদাতার অধীনে যারা শ্রম দেন, তারা শ্রম আইনের আওতাভুক্ত। অথচ আমাদের দেশে বেশির ভাগ নিয়োগদাতাই এই শ্রম আইনের অনেক কিছুই মানেন না। শ্রমিকদের একটি বড় অংশও তাদের শ্রম ও মজুরি-সংক্রান্ত অধিকার সম্পর্কে অবগত নন।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘শ্রমিক নিয়োগ, মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক, সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ, মজুরি পরিশোধ, কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত কারণে শ্রমিকের আঘাতের জন্য ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শিল্পবিরোধ সৃষ্টি ও নিষ্পত্তি, শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কল্যাণ, চাকরির পরিবেশ এবং শিক্ষানবিসসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়—সবই শ্রম আইনের অন্তর্ভুক্ত।’
প্রতিবছর মে দিবস পালিত হয়। তিনশ পঁয়ষট্টি-ছেষট্টি দিনের মধ্যে মাত্র এক দিনই মে দিবস, কিন্তু যাদের দাবি আদায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলতে এই দিবস পালিত হয়, তারা প্রতিদিনই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। কারখানার মালিক, বিলাসবহুল কোম্পানির শিল্পপতি এবং রাজনৈতিক নেতারা মে দিবসে সমাবেশে দীর্ঘ ভাষণ দিয়ে শ্রমিকদের দাবি পূরণের কথা বলে হাততালি পান; কিন্তু সারা বছর শ্রমিকদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য দিতে গিয়ে তারা নানা অজুহাত তুলে ধরেন।
আইন থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শ্রমিকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। ১৮০০ শতকে বিশ্বে একটি বড় পরিবর্তন ঘটে। সে সময়ের আগে মালিক পক্ষ শ্রমিকদের দিয়ে নামমাত্র পারিশ্রমিকে দৈনিক ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা কাজ করাত। এতে শ্রমিকরা প্রতিবাদ করলে মালিকরা বিদ্রোহী শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার ও নিপীড়ন শুরু করে। এই শ্রমিক আন্দোলনে অনেক শ্রমিক প্রাণ হারান। তাদের মূল দাবি ছিল—একজন শ্রমিক দিনে সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা কাজ করবেন। মালিকরা এই দাবি উপেক্ষা করায় ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকায় শ্রমজীবী মানুষ ধর্মঘটের ডাক দেয়, যার প্রাণকেন্দ্র ছিল শিকাগো শহর।
১৮৮৪-৮৫ সালের দিকে মন্দাভাবের কারণে অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেলে অসংখ্য শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন। শিকাগো শহরের আন্দোলনে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ শ্রমিক যোগ দেন। ৩ মে আন্দোলনটি আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। সে সময় পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়, এতে ছয়জন শ্রমিক নিহত হন।
শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে ৪ মে বিশাল সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। ওইদিন শিকাগো শহরে আরো চার শ্রমিক নিহত হন এবং ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই বছরের ৯ অক্টোবর আরো ছয়জনকে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ফলে শ্রমিকদের আন্দোলন আরো তীব্র হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে মালিক পক্ষ নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত হয়, শিকাগোর আন্দোলনে প্রাণ দেওয়া শ্রমিকদের স্মরণে প্রতিবছর ১ মে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে। এরপর থেকেই দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে।
শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন শ্রম আইন প্রণয়ন করা হলেও, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে; বাস্তবে শ্রমিকদের ভাগ্যের চাকা তেমনভাবে ঘোরে না।
লেখক : সাহিত্যিক ও কলাম লেখক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

