আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

নিজের কাজকে ভালোবাসতে হবে: শর্মি

আয়েশা আক্তার

নিজের কাজকে ভালোবাসতে হবে: শর্মি

সেলিমা আক্তার শর্মি। জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ জেলা কুষ্টিয়ায়। শিল্পকলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করার দরুন অন্তরে ধারণ করা সৃজনশীলতা ডালপালা মেলে বেড়ে উঠেছিল তার ভেতর। সেই সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে পরে তিনি উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। ‘শর্মি’স আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট’ নামে তার একটি অনলাইন পেজ আছে।

শর্মি শোনালেন তার উদ্যোক্তা জীবনের শুরুর গল্প। তিনি বলেন, ‘আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটের প্রতি ভালোবাসা সেই ছোটবেলা থেকেই। ফেলে দেওয়া পণ্য দিয়ে এটা-সেটা বানিয়ে ঘর সাজাতে ভালোবাসতাম। এরপর গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্স থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করলাম শিল্প ও সৃজনশীল শিক্ষা বিভাগে। পড়াশোনা শেষ করে কোথাও চাকরি করা হয়ে ওঠেনি। যেহেতু ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন সময়ে এটা-সেটা বানিয়ে ঘরের সাজসজ্জা পরিবর্তন করতে ভালোবাসতাম আর পড়াশোনাটাও শেষ হলো পছন্দের বিভাগ থেকে, তাই কাজ করার সুযোগ আর ইচ্ছাটা দ্বিগুণ বেড়ে যায় । ভাবতে শুরু করলাম, নানা ধরনের দেশি কাঁচামাল ও ফেলে দেওয়া প্রাকৃতিক উপাদানের তৈরি জিনিসগুলো সবার ঘরে কীভাবে স্থান পেতে পারে; কীভাবে এগুলো কাজে লাগিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি সবার কর্মসংস্থানের সুযোগ করা যেতে পারে। এই ভাবনা থেকেই বিভিন্ন ধরনের কোলাজ পেইন্টিং শুরু করি। ২০১৯ সালে উদ্যোক্তা হওয়ার যাত্রাটা এভাবেই শুরু হয়।’

বিজ্ঞাপন

‘উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে কোন ব্যাপারটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল’—এ প্রশ্নের উত্তরে শর্মি বলেন, ‘আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে নিজে স্বাধীনভাবে কিছু করা ও কর্মহীন নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার ভাবনা। আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট নিয়ে কাজ করে একজন ব্যক্তির সৃজনশীলতাকে শতভাগ কাজে লাগানো যায়। এতে করে একজন ব্যক্তি শুধু স্বাবলম্বী হতে পারেন তা নয়, তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবেও সুস্থ থাকতে পারেন। এই সেক্টরে কাজ করে কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।’

শুরুর দিকে শর্মির পরিবার তার এই উদ্যোগকে একদমই সমর্থন করেনি, কারণ ব্যবসা শুরু করা মানেই ঝুঁকি নেওয়া। তবে যখন তারা শর্মির কাজের প্রতি ভালোবাসা এবং মানুষের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া দেখলেন, তখন সমর্থন করতে শুরু করেন।

উদ্যোক্তা জীবনের প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে শর্মি বলেন, ‘প্রথমত, মার্কেটে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সহজ ছিল না। প্রতিযোগিতা ছিল, মানুষ নতুন ব্র্যান্ডের প্রতি সন্দেহপ্রবণ ছিল, আর অনেক সময় কাঁচামাল সংগ্রহ করাও ছিল চ্যালেঞ্জিং। এ ছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম বুঝে মার্কেটিং করা এবং গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করাও একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া ছিল।’

প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি ভালো লাগার গল্পও বলেন শর্মি। তিনি বলেন, ‘একবার এক ক্রেতা আমাকে বলেছিলেন, তিনি আমাদের মাধ্যমে তার মায়ের জন্য একটি বিশেষ উপহার তৈরি করতে চান। আমি খুব যত্ন করে সেটি তৈরি করলাম এবং যখন তিনি সেটি পেলেন, তখন আবেগাপ্লুত হয়ে আমাদের একটি দীর্ঘ ধন্যবাদবার্তা পাঠালেন। এ ঘটনাটি আমাকে খুব আনন্দ দিয়েছিল এবং মনে হয়েছিল, আমার কাজ শুধু ব্যবসা নয়, এটি মানুষের অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।’

শর্মি মনে করেন, বাংলাদেশে উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ বাড়ছে, তবে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সরকারি কিছু সুবিধা থাকলেও বাস্তবে উদ্যোক্তাদের অনেক সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়; যেমন বিনিয়োগের সুযোগ, সঠিক গাইডলাইন ও কর ব্যবস্থাপনা। তবে অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসার উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল সুযোগ এনে দিয়েছে বলে জানান এই উদ্যোক্তা।

শর্মির ইচ্ছা, ‘শর্মি’স আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট’কে একটি সুপরিচিত ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলা, যেখানে শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও তাদের হস্তশিল্পের পণ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া নারীদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং লোকাল হস্তশিল্পীদের প্ল্যাটফর্ম দেওয়া তাদের অন্যতম লক্ষ্য।

নতুন উদ্যোক্তা কিংবা যারা উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাচ্ছেন, তাদের উদ্দেশে শর্মি বলেন, ‘নিজের স্বপ্ন ও লক্ষ্যের ওপর বিশ্বাস রাখুন, ধৈর্য ধরুন এবং কখনো হাল ছাড়বেন না। প্রথম দিকে চ্যালেঞ্জ আসবে, কিন্তু শেখার মানসিকতা থাকলে ধাপে ধাপে আপনি সফল হবেন। এছাড়া ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাহকসেবা এবং নতুন ট্রেন্ড সম্পর্কে আপডেট থাকা খুব জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের কাজকে ভালোবাসতে হবে, তবেই আপনি সফল হতে পারবেন।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...