আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

বাংলাদেশে নীরবে ছড়িয়ে পড়া একটি রোগ মানুষের জীবন ও পরিবারকে গভীর প্রভাবিত করছে—এটি কিডনি রোগ। ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, কিডনি রোগ শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়। এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও ভীষণ ধ্বংসাত্মক। কিডনি বিকল হলে চিকিৎসা ব্যয় এত বেশি হয় যে, অনেক পরিবার কয়েক মাসের মধ্যে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। অথচ অধিকাংশ মানুষ কিডনি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ, কারণ এবং প্রতিকার সম্পর্কে সচেতন নন।

কিডনির কাজ ও প্রাথমিক সমস্যা

বিজ্ঞাপন

মানবদেহে দুটি কিডনি রক্ত পরিশোধনের দায়িত্বে নিয়োজিত। প্রতিদিন রক্ত থেকে ইউরিয়া ও অন্যান্য বিপাকজনিত বর্জ্য প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়। একজন সুস্থ মানুষের শরীরে দৈনিক প্রায় ৩০ গ্রাম ইউরিয়া তৈরি হয়, যা বের হতে অন্তত ৭৫০ মিলিলিটার প্রস্রাব প্রয়োজন। কিডনিতে প্রদাহ, সংক্রমণ বা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হলে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়, বর্জ্য পদার্থ শরীরে জমতে থাকে এবং ধীরে ধীরে কিডনি ক্রনিক রোগে আক্রান্ত হয়। মূত্রতন্ত্রের মূল অঙ্গ হলো দুটি কিডনি, দুটি ইউরেটার (মূত্রবাহী নালি), ইউরিনারি ব্লাডার (মূত্রথলি) এবং ইউরেথ্রা (মূত্রনালি)। প্রতিটি কিডনি দৈর্ঘ্যে ৪-৫ ইঞ্চি, ডান কিডনি সামান্য নিচে থাকে। এগুলো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে অসুস্থ না হলে অধিকাংশ মানুষ তাদের গুরুত্ব বোঝে না।

কিডনি রোগের প্রকারভেদ

কিডনি রোগ প্রধানত তিনভাবে দেখা যায়

* এক্স-অ্যাকশন বা একেবারে ক্ষতি : হঠাৎ বা দ্রুত কিডনি বিকল হওয়া (Acute Kidney Injury)।

* দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি : ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া (Chronic Kidney Disease, CKD)।

* জটিলতা ও সংক্রমণ : পাইলোনেফ্রাইটিস বা কিডনিতে সংক্রমণ, কিডনির পাথর বা প্রোটিনাল বর্ধন।

লক্ষণ ও শনাক্তকরণ

প্রাথমিক অবস্থায় কিডনি রোগ স্পষ্ট লক্ষণ দেয় না। তবে কিছু ইঙ্গিত সচেতন রোগীর চোখে পড়েÑ

* ঘন ঘন প্রস্রাব বা হঠাৎ কমে যাওয়া।

* মুখ ও পায়ে ফোলা।

* অবসাদ, ক্লান্তি, মনোযোগ কমে যাওয়া।

* প্রস্রাবের রঙ পরিবর্তন বা রক্তমিশ্রিত হওয়া।

* হঠাৎ উচ্চ রক্তচাপ। সঠিক সময়ে এই লক্ষণ চিহ্নিত করলে রোগ ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

বাংলাদেশে কিডনি রোগের বাস্তবতা

সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ কোনো না কোনো কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত। এর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ। প্রতি ঘণ্টায় গড়ে পাঁচজন কিডনি রোগজনিত জটিলতায় মৃত্যুবরণ করছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো—প্রায় ৭৫ শতাংশ রোগী কিডনি প্রায় সম্পূর্ণ বিকল হওয়ার পর চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। তখন চিকিৎসা মানেই ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন।

প্রধান কারণ

কিডনি রোগের সাধারণ কারণগুলো হলো

* ডায়াবেটিস : দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ রক্তে গ্লুকোজ কিডনির ক্ষতি করে।

* উচ্চ রক্তচাপ : কিডনির ছোট রক্তনালিতে চাপ বাড়িয়ে ক্ষতি করে।

* অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস : অতিরিক্ত লবণ, ভেজাল খাবার, ফাস্টফুড।

* দীর্ঘমেয়াদি ওষুধের সেবন : ব্যথানাশক, অ্যান্টিবায়োটিক ও প্রেশারের ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার।

জটিলতা ও প্রভাব

কিডনি বিকল হলে শারীরিক এবং মানসিকভাবে জটিলতা দেখা দেয়Ñ

* শরীরে বিষক্রিয়া বৃদ্ধি।

* হঠাৎ বা দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ রক্তচাপ।

* হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি।

* ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরতা।

* পরিবারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ।

ডায়ালাইসিস শুধু কিডনির কাজকে বিকল্পভাবে চালানোর একটি যান্ত্রিক পদ্ধতি; এটি কিডনিকে সুস্থ করে না। একবার শুরু হলে, সাধারণত আজীবন চালাতে হয় অথবা কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া বিকল্প থাকে না।

কিডনি সুস্থ রাখতে করণীয়

১. বছরে অন্তত একবার পূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা।

২. ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।

৩. ধূমপান ও মাদক সম্পূর্ণ বর্জন।

৪. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ওষুধ সেবন না করা।

৫. পর্যাপ্ত পানি পান (দৈনিক কমপক্ষে ২ লিটার)।

৬. প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্টফুড ও কোমল পানীয় সীমিত করা।

৭. পারিবারিক কিডনি রোগ ইতিহাস থাকলে আগাম সতর্কতা নেওয়া।

পরিশেষে বলতে চাই, কিডনি রোগ মানেই ডায়ালাইসিস নয়। সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত পরীক্ষা কিডনি রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে জটিলতা কমানো যায় এবং জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখা যায়। তাই কিডনি রোগকে অবহেলা না করে, সময়মতো সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

drmazed96@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন