সেদিন কয়েকজন ছাত্র গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে কাতরাচ্ছিল। মোহাম্মদ উল্ল্যাহ মানবিকতার তাগিদে, ঠিক মীর মুগ্ধের মতো আহতদের পানি খাওয়াতে রাস্তায় নেমেছিল। মুগ্ধের মতো তিনিও সেদিন নিচে গিয়েছিলেন শুধু মানুষের পাশে দাঁড়াতে। কিন্তু নিয়তির অদ্ভুত খেলায়, ঠিক যখন সে দ্বিতীয়বার পানির বোতল আনতে উপরে উঠছিল, তখনই বাসার সামনে হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হয়। ঊরুর ঠিক মাঝ বরাবর। কয়েক ইঞ্চি এদিক-ওদিক হলেই আজ তাকে হয়তো আমরা শহীদের তালিকায় খুঁজতাম মীর মুগ্ধের মতো। সচেতন হওয়ার পর নিজেকে একটি হাসপাতালে আবিষ্কার করে সে। সেখানে তাকে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি বকাও শুনতে হয়। আন্দোলনে নেমেছিলে কেন? মনে মনে সে শুধু ভাবছিল, তৃষ্ণার্ত মানুষকে পানি দেওয়া কি অপরাধ? রাজধানীর পরিস্থিতি তখন ভয়াবহ। আন্দোলনে আহত মানেই সন্দেহ, জিজ্ঞাসাবাদ ও হেনস্তা। হাসপাতালগুলো একে একে ফিরিয়ে দিল। চার বোনের একমাত্র ভাই, গুলিবিদ্ধ অবস্থায়, রক্ত ঝরতে ঝরতে সে ছুটে বেড়াচ্ছে ঢাকা শহরের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে। বাড়িতে সবাই ভয়ের মধ্যে। কেউ জেনে গেলে যে সে আন্দোলনে আহত, তাহলে পুরো পরিবারকেই হেনস্তার শিকার হতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে ইনসাফ বারাকাহ কিডনি অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের অতিরিক্ত ম্যানেজিং ডিরেক্টর ফোন করলেন প্রতিটি অধ্যাপক, প্রতিটি কনসালট্যান্টকে। তিনি অনুরোধ করলেন, একটা ছেলে... গুলিবিদ্ধ... অপারেশনটা কেউ করবেন? সেই রাজনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কেউই রাজি হলেন না। শেষমেশ গভীর রাতে তিনি আমাকে ফোন দিলেন। ফোনটা পেয়ে আমি আর দেরি করিনি।
দৌড়ে হাসপাতালে গেলাম। রাতের নিস্তব্ধ থিয়েটারে তার ঊরুর হাড়ের পাশ থেকেÑযেখানে নার্ভ, আর্টারি আর জীবনের নরম সুতাগুলো মিশে থাকে, সেখান থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গুলিটি বের করলাম। সেই গুলিটি ছিল শুধু ধাতু নয়; বরং ভয়ের, অন্যায়ের, অস্থির সময়ের প্রতীক। দুই সপ্তাহ পর সে আবার এলো ড্রেসিং করতে। চিহ্নগুলো শুকিয়ে গেছে, কিন্তু চোখে ছিল অদ্ভুত আলো। হঠাৎ লাজুক কণ্ঠে বলল, স্যার, একটা ছবি তুলতে চাই। এটা আমার জীবনের স্বপ্ন। আপনার সঙ্গে একটা ছবি থাকবে। আমি তার স্বপ্ন ভাঙিনি। কারণ আমারও মনে হয়েছিল, এমন একজন সাহসী ছেলের সঙ্গে একটি ছবি থাকাটা জীবনেরই প্রাপ্তি। আজ যখন ছবিটি দেখি, মনে হয়Ñএ শুধু একজন চিকিৎসক আর রোগীর ছবি নয়। এ দুই সময়ের দুই নায়কের গল্প, একজন রাস্তায় পানি দিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ, আরেকজন গভীর রাতে ঝুঁকি নিয়ে তার গুলিটি বের করে বাঁচিয়ে দিল জীবন। জুলাই আন্দোলন শুধু রাজনীতি নয়। এ এক মানবিকতার, সাহসের, আর একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর গল্প। একজন মীর মুগ্ধ শহীদ হয়ে ইতিহাস হয়ে গেলেন আরেকজন মোহাম্মদ উল্ল্যাহ বেঁচে থাকলেন সময়ের সাক্ষ্য হয়ে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

