অভাবের সংসারে পরিবারের বড় মেয়ে সুমি। পরিবারের হাল ধরতে তিনি বছরের পর বছর বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠানে নামমাত্র বেতনে চাকরি করেছেন। করোনার প্রাদুর্ভাবে যখন জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন তার জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। দিশেহারা হয়ে তিনি কী করবেন, ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না। তার পরিবারের কষ্টের মুহূর্তগুলো এমন ছিল, যা দেখে যেকোনো হৃদয় বিষণ্ণ হয়ে যাবে। সুমির কঠিন মুহূর্তে আলোর দিশা দেখিয়েছিলেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন। তিনি সুমিকে ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদনের পরামর্শ দেন এবং তাকে সার্বিক সহযোগিতা করেন।
সুমি খাতুন করোনার প্রাদুর্ভাবের সময়টায় মাত্র ১০টা রিং এবং ৩ কেজি কেঁচো দিয়ে উৎপাদন শুরু করেন ভার্মি কম্পোস্ট সার। মূলত শাকসবজির ফেলে দেওয়া অংশ, অর্ধপচা গোবর একসঙ্গে মিশিয়ে সেখানে কেঁচো ছেড়ে দেওয়া হয়। কেঁচো সেসব ময়লা খেয়ে মলত্যাগ করে পচিয়ে ফেলে ও বংশবিস্তার করতে থাকে। কেঁচোর পচিয়ে ফেলা দ্রব্যই মূলত জৈব সারে পরিণত হয়। টাকা ধার করে তিনি সার তৈরির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনেন। সার উৎপাদনের প্রথম ছয় মাসেও তিনি কোনো সার বিক্রি করতে পারেননি। এতে দুঃখ পেলেও হতাশ না হয়ে সাহসের সঙ্গে সামনে এগিয়ে গেছেন।
ছয় মাসে তার ১৫ মণ সার উৎপাদিত হয়। বলা যায়, উদ্যোক্তা জীবনের শুরুতেই তিনি চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হন। এরপর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাকুরা নাম্ভীর সহযোগিতায় তিনি উৎপাদিত সার বিক্রির সুযোগ পান। বর্তমানে তার খামারে ১২টি সেট (চেম্বার) রয়েছে। ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদনের পাশাপাশি অদম্য সাহসী উদ্যোক্তা সুমি খাতুনের রয়েছে একটি পুষ্টি বাগান ও একটি আনারসের বাগান। পুষ্টি বাগানে মাল্টা ও পেঁপেসহ নানা ধরনের ফলের গাছ রয়েছে। আর আনারস বাগানে তিনি সাথি ফসল হিসেবে মরিচ, সরিষা ও কলার আবাদ করেছেন।
সুমি শুধু একজন উদ্যোক্তা নন, বরং তিনি একজন সচেতন নাগরিক। তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ইয়েস গ্রুপের সদস্য। তিনি দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বেশ কয়েকটি স্থানীয় রক্তদান সংগঠনের একজন সক্রিয় সদস্য। ২০২৫ সালে তার জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি প্রোগ্রাম থেকে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে তিনি দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। বিভীষিকাময় দুর্ঘটনায় তার দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের দুই সহযোদ্ধা মারা যান।
তারা হলেন মধুপুর উপজেলা সনাকের ইয়েস দলনেতা রুহুল আমিন রনি এবং ইন্টার্ন রুহুল আমিন। সেই দুর্ঘটনায় তার শরীরের মাজা ও মেরুদণ্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ হাড় ভেঙে যায়। শারীরিকভাবে পর্যুদস্ত সুমি দুর্ঘটনার স্মৃতি কাটিয়ে ওঠে সম্প্রতি তার কাজে অগ্রসর হচ্ছেন। সুমি খাতুন উপজেলাপর্যায়ে ২০২৪ সালে অর্থনীতিতে স্বাবলম্বী নারী জয়িতা পুরস্কার পান। একই বছর তিনি জেলাপর্যায়েও অর্থনীতিতে স্বাবলম্বী নারী হিসেবে জয়িতা পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়া, তিনি তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প পুরস্কার ২০২৪ ও ২০২৫ সালে অর্জন করেন। তার সফলতার সঙ্গী হিসেবে সবসময় পাশে ছিলেন ব্লক অফিসার জেরিনা ইয়াসমিন রিপা।
অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা উদীয়মান উদ্যোক্তা সুমি বর্তমানে আনন্দ মোহন কলেজে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। তিনি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, উপজেলা কৃষি অফিস কিংবা বিভিন্ন প্রকল্প থেকে আরো সহযোগিতা পেলে ভার্মি কম্পোস্ট সারের উৎপাদন বৃদ্ধি করার পাশাপাশি বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে চান।
লেখক : শিক্ষার্থী
আনন্দ মোহন কলেজ
ময়মনসিংহ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

