মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস

এম-আবদুল্লাহ
এম আবদুল্লাহ

মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল দুই দফা। লিটারে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ২৫ টাকা পর্যন্ত। রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি সিলিন্ডার ও অটোগ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে উচ্চহারে। মাসিক এক সিলিন্ডারে চলা পরিবারে এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ৬০০ টাকা। দুই সিলিন্ডার লাগলে বাড়তি খরচ যোগ হয়েছে এক হাজার ২০০ টাকা। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন খরচ বেড়েছে অন্তত ১০ শতাংশ। ঘর থেকে বের হলেই আগের চেয়ে বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। বর্ধিত পরিবহন খরচের প্রভাবে শাকসবজি, মাছ, তরকারি থেকে শুরু করে সব ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। উল্লম্ফন ঘটেছে সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয়ে। মূল্যস্ফীতি চলে গেছে অসহনীয় পর্যায়ে। এমন বাস্তবতায় বিদ্যুতের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি যেন ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। বাজারের আগুনে যেন আরেকবার ঘি ঢালার ব্যবস্থা।

সব উৎপাদনই বিদ্যুৎনির্ভর। মূল্যবৃদ্ধি শুধু বিদ্যুৎ বিল বাড়ায় না; বরং পুরো অর্থনীতিতে বাড়তি ব্যয়ের ঢেউ আছড়ে পড়ে। ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রভাবে সব ভোগ্যপণ্যের দাম আরেক ধাপ বাড়বে অবধারিতভাবে। তেল, সাবান, ডিটারজেন্ট, টুথপেস্ট থেকে শুরু করে সংসারের এমন কোনো পণ্য নেই, যার ওপর বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব নেই। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে মানুষের আয় বাড়েনি। সব মিলিয়ে স্বল্প ও সীমিত আয়ের মানুষ বাড়তি এ খরচের চাপে দিশাহারা। নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বহুমাত্রিক। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে কৃষি, শিল্প, পরিবহন, বিপণন এবং সেবা খাত—সবখানেই ব্যয় বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত এ ব্যয় পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার ওপর চাপানো হয়। উৎপাদন শিল্পের মালিকদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে, নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে, সেবা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং মূল্যস্ফীতি শেখ হাসিনার শেষ সময়ের মতো দুই ডিজিটে উন্নীত হতে পারে।

বুধবার সব শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর গতকাল লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের অর্থাৎ ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্যহার প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বলা হচ্ছে, ৬৫ শতাংশ গ্রাহকই এ দুই শ্রেণিতে রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের এ দাবির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত গ্রাহকের বিদ্যুতের ব্যবহার ১৫০ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত। দেশে মোট পাঁচ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহকের সিংহভাগই মাসে ৭৫ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। যার ঘরে দুই-তিনটি লাইট, ফ্যান, একটি ফ্রিজ ও একটি টেলিভিশন আছে, তার মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ কোনোমতেই ৭৫ ইউনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিভ্রান্ত করছেন বলেও সংশ্লিষ্ট ওয়াকিবহাল সূত্র জানিয়েছে।

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) গ্রাহকদের সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ধরনের গ্রাহক সংখ্যা গত অর্থবছরে ছিল তিন কোটি ৭২ লাখ। ৮০টি সমিতির মাধ্যমে খুচরা গ্রাহকদের মধ্যে তারা প্রতি মাসে গড়ে ৪০২ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করে। এ হিসাবে গ্রাহকপ্রতি মাসিক সরবরাহকৃত ইউনিট সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৮। ফলে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত দাম না বাড়ালে কত শতাংশ গ্রাহক সুবিধা পাবেন, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। তাছাড়া বিদ্যুৎ বিল ৭৫ ইউনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেও রেহাই নেই। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব তো সর্বব্যাপী, সব পণ্যে। যারা বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন না, তাদের ওপরও বাড়তি খরচের বোঝা চাপবে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার এবার ১৫-২০ শতাংশ দাম বাড়িয়ে বছরে ১০ থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তি আয় করতে পারবে। কিন্তু এর বহুমাত্রিক প্রভাবে বছরে লাখ কোটি টাকা চলে যাবে জনসাধারণের পকেট থেকে।

গত এপ্রিলে দুই দফায় ৫৯৯ টাকা বাড়ে এলপিজির ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম। মে মাসে দাম অপরিবর্তিত থাকে। তবে জুনের জন্য ১২ কেজিতে ৫৫ টাকা কমিয়ে দাম এক হাজার ৮৮৫ টাকা করা হয়েছে।

সরকার এপ্রিলে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। তখন অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা, পেট্রোলে ১৯ টাকা, ডিজেলে ১৫ টাকা এবং কেরোসিনে ১৮ টাকা বাড়ানো হয়। মে মাসে দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। জুনে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও অন্যান্য জ্বালানি তেলের দাম লিটারে পাঁচ টাকা বাড়ানো হয়।

অটোরিকশাচালক মুঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, তেলের দাম বৃদ্ধির পর আমাদের ব্যাটারি চার্জের বিল ৯০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২০ টাকা করা হয়েছে। এবার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে ব্যাটারি চার্জের বিল আরো বাড়বে। শুধু তাই নয়, অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের জন্য সামনের দিনগুলো আরো কষ্টের হবে।

ফিরোজা বেগম নামে পুরান ঢাকার পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী আট হাজার টাকা বেতনে দোকানে কাজ করে মেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে সংসার চালান। তিনি বলেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে আমাদের মতো গরিব মানুষের কষ্ট আরো বাড়বে। কারণ, সব জিনিসের দাম বেড়ে যাচ্ছে।

কেরানীগঞ্জের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মাসুদ রানা বলেন, আগে কারখানায় আট হাজার টাকা বিল দিতাম, এখন বিল আরো বাড়বে। এটাই শেষ কথা নয়, শ্রমিকের মজুরিও বাড়বে, আনুষঙ্গিক পণ্যসহ সব নিত্যপণ্যের দামও বাড়বে। সব মিলিয়ে সর্বত্র এর প্রভাব পড়বে।

গৃহবধূ আশা খাতুন বলেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব প্রত্যেক নাগরিকের ওপর পড়বে। বছরের বেশিরভাগ সময় তীব্র গরম থাকে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে যারা এসি চালাতেন কিংবা ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করতেন, তাদের বিল বাড়বে। সবচেয়ে বড় কথা, তেল-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে সব জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্তদের ওপর সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

কালীগঞ্জ এলাকার দোকান শ্রমিক ইয়ামিন ইসলাম বলেন, নির্বাচনের সময় ভালো ভালো কথা বলে ক্ষমতায় আসার পর এখন তেল-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দেশের মানুষকে কষ্টের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। তেল-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রভাবে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গিয়ে আমাদের মতো গরিব মানুষদের আরো বেশি কষ্টের ফেলে দেওয়া হচ্ছে।

আসন্ন বাজেট নিয়েও মানুষের মধ্যে আছে উদ্বেগ-আতঙ্ক। করজাল বিস্তৃত করার কথা জানান দিচ্ছে এনবিআর। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় মানুষের প্রত্যাশা আছে, আছে শঙ্কাও। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ঋণ পরিশোধের চাপ সামাল দেওয়া এবং অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনা। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের আগে সরকারকে কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

ঋণের চাপের পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সেই লক্ষ্য অর্জনকে আরো কঠিন করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে পড়ছে।

দুর্নীতির লাগাম না টেনে দাম বাড়ানো অন্যায়

বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে বলে জানান এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শেখ হাসিনার সরকারের আমলে সাড়ে ১৫ বছরে এ দুই খাতে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। এই দুর্নীতি মূলত হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কমিশন এবং কেন্দ্র ভাড়া ও অতিরিক্ত মুনাফা—এই তিনটি খাতে। বিদ্যুৎ খাত ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে পাচার করা টাকায় কেউ কেউ বিভিন্ন দেশে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। লুটের টাকায় একজন সিঙ্গাপুরের শীর্ষস্থানীয় ধনীর তকমাও পেয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধানে গঠিত বিশেষ কমিটি তাদের প্রতিবেদন পেশ করেছে। সেখানেও অনিয়ম ও লুটের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের লুটেরাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে দাম বাড়িয়ে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করা বড় ধরনের অন্যায় ও বেআইনি কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা।

দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিশিষ্ট বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম আমার দেশকে বলেন, বিদ্যুৎ খাতের বিশাল ঘাটতির জন্য লুটপাট ও অপচয় দায়ী। এ ঘাটতি ধরে দাম বাড়িয়ে বিইআরসি অন্যায় করেছে। সরকারের উচিত ছিল ঘাটতির বৈধতা নিরূপণ করে অপ্রয়োজনীয় খরচ বাদ দেওয়া। এটা করলে আর দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না। বিদ্যুৎ খাতের লুটপাটের দায় ভোক্তারা মেনে নেবে না বলেও মনে করেন খ্যাতিমান এ শিক্ষাবিদ।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের নাগরিকরা। এমন তথ্য উঠে এসেছে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর আয়োজিত গণশুনানিতেও।

লুটেরাদের পক্ষ নিয়েছে বিইআরসি

জ্বালানি তেলের পরপরেই বিদ্যুতের দামও বাড়ানোর কারণে জনজীবনে নাভিশ্বাস অবস্থা হবে। এমন আশঙ্কার কথা বলেছেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার নাগরিকরা। তারা বলেন, সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হবে নিম্ন আয়ের মানুষ। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে শুনানিতে ক্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মিজুর রহমান বলেন, জনগণের অবস্থা বিবেচনা করলে এখানে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব তো দূরের কথা শুনানির আয়োজনই করার কথা নয়। বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাটের চিত্র তুলে ধরে এ শিক্ষাবিদ বলেন, বিইআরসি দেশের ও জনগণের স্বার্থরক্ষার পরিবর্তে লুটেরাদের স্বার্থরক্ষা করেছে। বিদ্যুৎ খাত থেকে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হচ্ছে। এখনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে তাদের টাকা দিচ্ছে সরকার। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না। সবার আগে উচিত বিদ্যুৎ খাতের লুটেরাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বিইআরসি একটি গণবিরোধী সংস্থায় পরিণত হয়েছে। সরকার দাম বাড়াতে চায় আর বিইআরসি সেটাই বাস্তবায়ন করে। শুনানি একটি আইওয়াশ মাত্র।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, এই মুহূর্তে দাম বাড়ালে সেটা আমাদের জন্য হবে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’। বর্তমানে দেশের রপ্তানি খাত নিম্নমুখী অবস্থায় রয়েছে। এখন শিল্প খাত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাবে।

ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা

বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর বলেন, গত কয়েক বছরের বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি ঘনমিটার সিএনজি উৎপাদনে অতিরিক্ত ১ টাকা ৬০ পয়সা খরচ যুক্ত হয়েছে। এছাড়া বাজার পরিস্থিতি ও ক্রমবর্ধমান ব্যয় বিবেচনায় কমিশন বা মার্জিন ন্যূনতম ৩ টাকা ৫০ পয়সা বাড়ানো দরকার। আমরা এমন দাবি করে আসলেও সরকার তা আমলে নিচ্ছে না। এখন আবার এ খাতে বিদ্যুতের দাম আরো ১৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এতে ৮ টাকা কমিশনের ৬ টাকাই বিদ্যুতে খরচ হবে। বাকি ২ টাকা দিয়ে ব্যবসা কিভাবে হবে।

সিএনজি মালিকরা বিদ্যুৎ বিভাগকে দেওয়া এক চিঠিতে লিখেছেন, ২০১৫ সাল থেকে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়লেও সে অনুযায়ী সিএনজি স্টেশন মালিকদের কমিশন সমন্বয় করা হয়নি। এতে লাইসেন্স ফি, ইজারা ব্যয়, ব্যাংক সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, কর্মচারীদের বেতন ও যন্ত্রাংশের দামবৃদ্ধির কারণে অনেক স্টেশন এখন লোকসানে চলছে।

বিজিএমই-এর সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল আমার দেশকে বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে যেকোনো উৎপাদনমুখী শিল্পে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে কারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, যার কারণে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশক খাত, যা রপ্তানি আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ঝুঁকিতে পড়বে কর্মসংস্থান

‘বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে শিল্প উৎপাদন খরচ আরো বৃদ্ধি পাবে, বিনিয়োগ কমে যাবে এবং দেশের শিল্প প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হবে। এর ফলে কর্মসংস্থান ও শিল্প স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়বে।’ এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) নেতারা। এক বিবৃতিতে সংগঠনটির নেতারা বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যয় মারাত্মকভাবে বেড়ে যাবে।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, কোভিড-পরবর্তী সময়ে শিল্প খাত দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ ব্যয়চাপে রয়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদহার বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়া, নির্মাণ খাতের মন্দা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক কারখানা এখন লোকসান বহন করে চলছে। গত কয়েক বছরে বিদ্যুতের ট্যারিফ প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং ডিমান্ড চার্জ ১২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে গ্যাসের দামও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, স্টিল শিল্পের বড় কারখানাগুলো ৩৩ কেভি, ১৩২ কেভি ও ২৩০ কেভি লাইনের সরাসরি গ্রাহক হলেও ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও অন্যান্য অতিরিক্ত খরচে বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। নিজেদের সাবস্টেশন থাকলেও এসব ব্যয় থেকে রেহাই মিলছে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন