মিরপুর মিল্কভিটা গলি, সেকশন-৭, ওয়ার্ড-৬ এলাকার ঝিলপাড় বস্তির বাসিন্দা ১৮ বছর বয়সি বিলকিস বানু। এ বয়সেই তিন বছরের একটি কন্যাসন্তানের জননী সে। ১৫ বছরে বিয়ে?- এমন প্রশ্নের জবাবে ফ্যালফ্যাল চাহনি, নিরুত্তর বিলকিস। আছিয়া (১৬) নামে আরেক কিশোরী জানায়, তাদের গ্রামের বাড়ি রংপুরে, যেখানে বেশিরভাগ গরিব পরিবারের মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়া হয়। জন্মসনদ না থাকায় ‘আমাগো ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগে না।’
৬ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয় থেকে জানা যায়, ২৫ একর জমি নিয়ে গঠিত চারটি বস্তিতে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস, যেখানে আট থেকে ১০ বছর বয়সের শিশুর সংখ্যা আট হাজারের বেশি। তাদের অধিকাংশের জন্মনিবন্ধন হয় না। নিবন্ধন করাতে গেলে দালাল তাদের কাছে এক হাজার ৫০০ টাকা দাবি করে। এত টাকা দিয়ে নিবন্ধন করানো সম্ভব নয় বলে আমার দেশ প্রতিবেদকে জানান ভুক্তভোগীরা। তারা বলেন, এখানে জন্মই যেন আজন্ম পাপ।
গত ২১ মে বৃহস্পতিবার সরেজমিন রাজধানীর মিরপুরের ঝিলপাড়, চলন্তিকা, আরামবাগ বস্তি এলাকা ঘুরে দেখা গেল এ সমস্যা প্রায় সবারই। সেখানকার হাজার হাজার শিশু স্কুলে যাওয়া থেকে বঞ্চিত। বস্তি এলাকার লোকজন জানান, কাগজপত্রের জটিলতায় স্কুলে ভর্তি না হতে পেরে মোবাইলে আসক্তি, বাল্যবিবাহ, মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অপরাধে শিশু-কিশোরদের জড়িয়ে পড়তে দেখা যায় এলাকাগুলোয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বেসরকারি সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা না গেলে এসব সেবা থেকে বঞ্চিত হবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব আব্দুল সামাদ আমার দেশকে বলেন, ‘যাদের বাবা নেই, মা নেই, পথশিশু; আমরা তাদের জন্মনিবন্ধনও করছি।’
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে ৪০-৫০ হাজার জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হচ্ছে। সংশোধনের আবেদনও নিষ্পত্তি হচ্ছে। তবে ভাসমান ও স্থায়ী ঠিকানাবিহীন পরিবারের শিশুদের জন্মনিবন্ধন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। জন্মস্থান বা বর্তমান ঠিকানা থাকলেই নিবন্ধনের সুযোগ পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এমন শিশুদের অনেকে নিবন্ধন সেবার বাইরে রয়ে যাচ্ছে।
পথে বেড়ে ওঠা শিশুদের ৫৮ দশমিক ২ শতাংশেরই জন্মসনদ নেই। এছাড়া বস্তি এলাকার ৯১ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে রয়েছে। ফলে তারা শিক্ষার অধিকারসহ সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ নিয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাসের করা এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী শহরের ৬৬৭ পথশিশু ও বস্তি এলাকায় বসবাসরত এক হাজার ২৪৬ পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়। ওই জরিপে অংশ নেওয়া পথশিশুদের ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ বর্তমানে শিক্ষার বাইরে রয়েছে।
দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সি ৪১ শতাংশ শিশুর জন্মনিবন্ধন নেই। এ বয়সি শিশুদের জন্মসনদ আছে ৪৭ শতাংশের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপের সবশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর বয়সের শিশুদের জাতীয়ভাবে জন্মনিবন্ধনের হার বর্তমানে ৫৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে ছিল ৫৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ হার এখনো সর্বজনীন নিবন্ধনের লক্ষ্যের অনেক নিচে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিতের অঙ্গীকার রয়েছে সরকারের।
স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত সচিব) যাহিদ হোসেন বলেন, ঢাকায় স্থায়ী মানুষ কম থাকার কারণে এখানে জন্মনিবন্ধনের হার কম। ভাসমান প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের জন্মনিবন্ধন জটিলতা ও অন্তর্ভুক্তির ঘাটতির বিষয়ে তিনি বলেন, জন্মনিবন্ধনের জন্য বিধিবদ্ধ কিছু নিয়ম রয়েছে। সে বিধান অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে ভাসমান জনগোষ্ঠীর নিবন্ধনের ক্ষেত্রে তাদের জন্মস্থান বা বর্তমান ঠিকানা থাকলেই তারা জন্মনিবন্ধন করতে পারবে।
তিনি আরো জানান, শহরের ভাসমানদের নিবন্ধনের জন্য তারা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করছেন। এজন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এ নিবন্ধনের মূল দায়িত্ব পালন করে। আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে যাওয়া সব শিশুর জন্মনিবন্ধন রয়েছে। কারণ, এটি ছাড়া তারা শিক্ষাজীবন শুরু করতে পারে না।
কারিতাস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের পরিচালক থিওফিল নকরেক বলেন, জন্মসনদবিহীন শিশুদের ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ তাদের পিতামাতার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর জানে না। ফলে বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী জন্মনিবন্ধন করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, জন্মসনদ না থাকা শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি একটি মানবাধিকার সংকট। জন্মসনদ না থাকলে শিশুরা বিদ্যালয়ে ভর্তি, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, সরকারি ভাতা পাওয়া এবং ভবিষ্যতে বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ উদ্যোগটি প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে যেসব শিশুর পরিবার নেই বা যারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, ফুটপাত, বাজার কিংবা বস্তিতে বড় হচ্ছে, তারা এখনো রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে।
তিনি আরো বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও নিবন্ধন দপ্তরের মধ্যে সংযোগের অভাবে জন্মের পর শিশুর নিবন্ধন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও হাসপাতালে জন্ম নেওয়া শিশুদেরও খুব কম অংশের জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হয়। দেশে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন করতে পারে না। এক্ষেত্রে পরিবারকে ভিন্ন দপ্তরে গিয়ে এ নিবন্ধন করতে হয়।
তিনি জানান, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশ হাসপাতালে হওয়া জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দেওয়ায় প্রায় শতভাগ সাফল্য অর্জন করেছে।
এ পরিস্থিতি উত্তরণে কারিতাস বাংলাদেশের পক্ষে সংস্থার পরিচালক (কর্মসূচি) দাউদ জীবন দাশ সরকার ও বেসরকারি সংস্থার প্রতি কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন। এসবের মধ্যে রয়েছেÑপিতামাতাহীন শিশুদের জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক ক্যাম্পেইন চালিয়ে শতভাগ জন্মনিবন্ধন নিশ্চিতকরণ, শিশু জন্মের পরপরই হাসপাতাল-কমিউনিটি ক্লিনিকে জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা চালু, পথশিশুদের রাস্তা থেকে ফেরাতে বিশেষ কর্মসূচি চালু, যার মধ্যে শর্তযুক্ত ভাতা অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে পরিবার শিশুর জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে, শিশুশ্রম বন্ধ এবং শিশুশ্রম ও অন্য কারণে ঝরেপড়া শিশুদের শনাক্ত করে তাদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, পথশিশুদের শিক্ষাগ্রহণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা, যাতে এসব শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে শিক্ষা চলমান রাখে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা ভাতার পরিমাণ বাস্তবসম্মতভাবে বৃদ্ধি করা ও আবেদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ।
দাউদ জীবন দাশ বলেন, সরকারের নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় যে অল্পসংখ্যক পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী রয়েছে, তারা যে ভাতা পাচ্ছে তা খুবই নগণ্য। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় মাসিক ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা ভাতা কখনো বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী নয়। অন্যদিকে সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের জন্য সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচিও হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি। দেশে যে সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুরা রয়েছে, তাদের ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব পরিবার ও রাষ্ট্রের। আমরা যদি এসব শিশুর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই তাহলে রাষ্ট্র হিসেবে আমরা অনেকাংশে পিছিয়ে পড়ব। তাই তাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে অবিলম্বে সরকারসহ আমাদের সবার নজর দিতে হবে।
ঢাকা বিভাগে জন্মনিবন্ধনের হার সর্বনিম্ন হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল ১০-এর নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তারউন্নেছা শিউলী বলেন, ঢাকায় বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষই অস্থায়ী (ভাড়াটিয়া) এবং বাইরের জেলা থেকে আসা। জন্মনিবন্ধনের একটি নিয়ম হলো এটি স্থায়ী ঠিকানায় করতে হয়। যেহেতু গ্রামের বা জেলা-থানা পর্যায়ের মানুষ বেশিরভাগই স্থানীয়, তাই সেখানে নিবন্ধনের হার বেশি।
তিনি আরো বলেন, অফিসগুলোয় সেবা নিতে আসা মানুষের মধ্যে নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। কারণ, তারা কমফোর্ট জোনের বাইরে যেতে চান না। তবে তারা নারী-পুরুষ উভয়কেই অফিসে স্বাগত জানান বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

