হামে আক্রান্ত ১১ মাসের সন্তান তুবা মনিকে বাঁচাতে চট্টগ্রাম শহরের অন্তত ১০টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ছোটাছুটি করেছিলেন কক্সবাজারের বাসিন্দা সরওয়ার কামাল। কিন্তু কোথাও খালি আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) পাননি। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হলেও শেষ পর্যন্ত মেয়েকে বাঁচানো যায়নি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আইসিইউর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছি। শেষ পর্যন্ত সিট পেলেও মেয়েকে আর বাঁচাতে পারিনি।
তুবার ঘটনা ব্যতিক্রম নয়। দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সংকট এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে আইসিইউ শয্যা না পেয়ে একের পর এক শিশুমৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে রাজধানী ও জেলা শহরের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ যেন ‘সোনার হরিণে’ পরিণত হয়েছে। আইসিইউতে একটি শয্যা পেতে সেখানে থাকা কারো মৃত্যু অথবা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে অন্য রোগী বা তার স্বজনদের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট আইসিইউ শয্যা রয়েছে এক হাজার ৬২০টি। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ অচল। পাশাপাশি ১৯ জেলা সদর হাসপাতালের আইসিইউ সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, করোনা মহামারির সময় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত দেশের ১০টি বিভাগীয় ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ৪৩টি জেলা সদর হাসপাতালের অধিকাংশ আইসিইউ অচল হয়ে আছে।
এসব ইউনিটে সব ধরনের যন্ত্রপাতি সরবরাহ হয়েছিল। অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি দীর্ঘসূত্রতায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পের টাকার একটি অংশ ফেরত চলে গেছে। ফলে অনেক হাসপাতালে পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও আইসিইউ ও পিআইসিইউর যন্ত্রপাতি কেনা বা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। কিছু হাসপাতালে অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটা হলে তা বছরের পর বছর পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। কিছু হাসপাতালে আইসিইউ সচল থাকলেও তা মানসম্মত নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট শয্যার অন্তত ১০ শতাংশ আইসিইউ থাকার নিয়ম রয়েছে। মূলত করোনার সময়ে দেশজুড়ে আইসিইউর জন্য হাহাকার চলছিল। ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর ভয়াবহতায় আইসিইউর অভাব আবারও অনুভূত হয়। এখন আবার হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে আইসিইউর সংকট নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কারণ, আইসিইউর বড় একটি অংশই ঢাকাকেন্দ্রিক।
এদিকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে আইসিইউ শয্যা কতটি রয়েছে, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে নেই। ধারণা করা হচ্ছে, দেশে বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৮০০ থেকে ৯০০টি। তবে সেখানে চিকিৎসা ব্যয়বহুল, যা দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে। ফলে সরকারি হাসপাতালে ভিড় করেন সবাই। সেখানেও আইসিইউর একটি সিটের জন্য রীতিমত যুদ্ধ করতে হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আইসিইউ সংকট শুধু অবকাঠামোর নয়; এটি পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার ব্যর্থতারও প্রতিফলন।
১৯ জেলা হাসপাতালে বন্ধ আইসিইউ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৯ জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ সেবা বন্ধ রয়েছে। এসব হাসপাতালের মধ্যে রয়েছে বরিশাল জেনারেল হাসপাতাল, চুয়াডাঙ্গা জেলা হাসপাতাল, ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল, হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল, ঝালকাঠি জেলা হাসপাতাল, কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতাল, পিরোজপুর জেলা হাসপাতাল, রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল, সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যা আধুনিক সদর হাসপাতাল, দিনাজপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, নড়াইল জেলা হাসপাতাল, নরসিংদী ১০০ শয্যা জেলা হাসপাতাল, নীলফামারী ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল, নেত্রকোনা জেলা হাসপাতাল, পঞ্চগড় জেলা হাসপাতাল, বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, বান্দরবান ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল ও মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল।
আইসিইউর খরচ
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউর জন্য আলাদা কোনো ফি দিতে হয় না। তবে রোগীর বেশিরভাগ ওষুধপত্রই বাইরে থেকে কিনতে হয়। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আইসিইউর ভাড়া একেকরকম। এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম-ডাক যত বড়, আইসিইউর ভাড়াও তত বেশি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভিআইপি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ২৪ ঘণ্টার আইসিইউর ভাড়া ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত। কোনো কোনোটি আবার এক লাখ টাকাও রয়েছে। আবার কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের ভাড়া দিনে ৩০-৩৫ হাজার টাকা হলেও মানহীন সেবা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও কোনো কোনো ক্লিনিকের আইসিইউর সিঙ্গেল কেবিন সাত হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং শেয়ার কেবিন আইসিউর ভাড়া সাত হাজার থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
প্রকল্প বন্ধ, ঝুঁকিতে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, করোনা মহামারির সময় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সক্ষমতা বাড়াতে তড়িঘড়ি করে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার ‘কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (২য় সংশোধিত)’ (ইআরপিপি) প্রকল্প নেওয়া হয়। এ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শুরু করে জেলা সদর হাসপাতালে আধুনিক আইসিইউ, পিআইসিইউ, অক্সিজেন ব্যবস্থা, ল্যাব সুবিধা ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা চালু করা। প্রথমে প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০০০ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত। পরে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। পরবর্তীতে কয়েক দফা সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ছয় হাজার ৩৮৬ কোটি টাকার বেশি।
প্রকল্পটির আওতায় ৫০টি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার আইসিইউ, ২০ শয্যার আইসোলেশন ইউনিট, পিআইসিইউ, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা চালুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নে ভয়াবহ অব্যবস্থাপনা, দীর্ঘসূত্রতা, সমন্বয়হীনতা এবং অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পের টাকার একটি অংশ ফেরত যাওয়ায় সেই অবকাঠামোর বড় অংশই এখন অচল হয়ে পড়ে আছে। কোথাও তালাবদ্ধ ইউনিট, কোথাও যন্ত্রপাতি অকেজো হওয়ার পথে, আবার কোথাও জনবল না থাকায় চালুই করা যায়নি আইসিইউ।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের অধীনে দেশের ১০টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ১৩ জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ সেবা এবং ৩০টি সরকারি হাসপাতালে লিকুইড অক্সিজেন সেবা চালু হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, ৫০টি জেলা হাসপাতালে লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে মাত্র ১৩টি হাসপাতালে আইসিইউর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে আবার তিন হাসপাতালে কাজ করা আর সম্ভব নয়। আর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটসহ ১৬টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিআইসিইউর বিপরীতে একটির কাজও শেষ হয়নি। একইভাবে ১৫ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রসূতি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) কাজের হার শূন্য।
প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সবগুলো হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপন করা সম্ভব নয়। আবার যেসব হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোতে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি নেই, প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান ও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে তা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার কিছু কিছু হাসপাতালে শতভাগ যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হলেও কার্যত বন্ধ রয়েছে। নানা জটিলতার কারণে ফাংশনাল করা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রকল্প নথি অনুযায়ী যন্ত্রপাতি কেনার দায়িত্ব ছিল প্রকল্প অফিসের, আর অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তর। কিন্তু শুরু থেকেই নির্মাণকাজে ধীরগতি থাকায় আইসিইউ ও পিআইসিইউ স্থাপনের কাজ পিছিয়ে যেতে থাকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের একটি অংশ ফেরত চলে যায়। এতে কয়েকটি হাসপাতালে পরিকল্পনা অনুযায়ী যন্ত্রপাতি কেনা ও স্থাপনই সম্ভব হয়নি।
আইএমইডির মূল্যায়ন প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, সময়স্বল্পতার কারণে একাধিক দরপত্র আহ্বান বন্ধ রাখতে হয়। আবার কিছু হাসপাতালে অবকাঠামো প্রস্তুত হলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পৌঁছায়নি। ফলে কক্ষ, পাইপলাইন ও প্রযুক্তিগত সুবিধা তৈরি থাকলেও সেবা চালু করা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অসমাপ্ত কাজগুলো পঞ্চম জনস্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচির আওতায় শেষ করার আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরকার প্রকল্পভিত্তিক নতুন ব্যবস্থায় চলে যাওয়ায় সে উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত হয়নি। এতে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল যশোরের মতো অনেক হাসপাতালে অবকাঠামো বছরের পর বছর অচল অবস্থায় পড়ে আছে। তবে সিলেট, দিনাজপুর, ফরিদপুর ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বেশকিছু স্থানে নতুন করে ১০ শয্যার আধুনিক আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
প্রকল্পটির দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে বলেন, যখন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, তখনই কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ফলে কার্যক্রম ধীর হয়ে পড়ে। পাশাপাশি গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাজ, বিল জটিলতা, ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনসহ নানা কারণে বাস্তবায়নে বড় ধরনের বিলম্ব হয় এবং কাজ হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের টাকা ফেরত চলে যায়। ফলে কাজ আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ না দেওয়ায় আইসিইউগুলো সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ভেন্টিলেটর, মনিটর, অক্সিজেন সাপোর্ট ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান আমার দশকে বলেন, দেশে আইসিইউ ও পিআইসিইউর স্বল্পতা রয়েছে। তবে এ সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, অনেক দেশেই রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। আর যেখানে আইসিইউ নেই, কিংবা দক্ষ জনবলের অভাবে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না, তা অচিরেই চালু করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
শিশু হাসপাতালে আইসিইউ সংকট চরমে
হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে প্রতিনিয়তই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীরা ছুটে আসছেন। কিন্তু বিশেষায়িত ওয়ার্ডের পাশাপাশি আইসিইউতেও সিটসংখ্যা কম। ফলে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব এবং নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও নার্সদের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার সবগুলোই পরিপূর্ণ। ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুর বয়স এক বছরের কম। এসব শিশুর কারো কারো সারা শরীরে ছোপ ছোপ দাগ ও ফুসকুড়ি রয়েছে। শরীরে চলছে স্যালাইন, কারো নাকে নল; আবার কোনো কোনো শিশুর মুখে অক্সিজেন লাগানো। প্রচণ্ড জ্বর আর ব্যথায় অনবরত কেঁদেই যাচ্ছে শিশুরা। পাশেই বসা তাদের মা-বাবা কিংবা স্বজনদের দুই চোখ টলমল করছে। সন্তানের যন্ত্রণাকাতর মুখচ্ছবি দেখে নীরবে লড়াই করছেন অভিভাবকরা। অনেককেই আইসিইউ শয্যা ফাঁকা না পেয়ে রোগীদের নিয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরে যেতে দেখা গেছে। আইসিইউতে শয্যা পাওয়ার জন্য সেখানে থাকা কারো মৃত্যু অথবা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে অন্য রোগীদের।
হাসপাতালের তথ্যমতে, বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে শয্যা রয়েছে ৪৪টি। এ ওয়ার্ডের ভেতরেই আছে ১৬ শয্যার একটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। অথচ আইসিইউর একটি সিটের জন্য প্রতিদিন গড়ে ২০ জন আবেদন করেন। শুধু কোনো রোগী মারা গেলে কিংবা সুস্থ হয় বাড়ি ফিরলেই সিট ফাঁকা হয়।
এ ব্যাপারে শিশু হাসপাতালে আইসিইউর দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, আইসিইউ সংকট শুধু আমাদের এখানেই নয়, অনেক হাসপাতালেই হচ্ছে। আইসিইউ ইউনিটে যত রোগী ভর্তি থাকে, অপেক্ষায় থাকে তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি। কারণ, হামের পাশাপাশি বেশিরভাগ শিশুর মৃত্যু হচ্ছে নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতায়। ঢাকার বাইরের রোগীদের মূলত আইসিইউর জন্য এখানে আনা হয়। কিন্তু সময়মতো পিআইসিইউ বা ভেন্টিলেশন সাপোর্ট না পাওয়ায় রোগীর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে পড়ে। চাহিদা অনুযায়ী জনবল ও সাপোর্ট সিস্টেম না থাকায় অনেক রোগীকে আমরা আইসিইউ সেবা দিতে পারি না। আইসিইউর সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয়ভাবে ৪০০ কিংবা ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল চালু করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা জানান, আইসিইউ পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রয়োজন। মূলত অ্যানেসথেসিয়া ও জরুরি ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন শাখার বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসরা আইসিইউর দায়িত্বে থাকেন। কিন্তু দেশে সে ধরনের দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।
এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন আমার দেশকে বলেন, আইসিইউ স্থাপন করলেই তো হবে না, তা চালানোর সক্ষমতাও লাগবেÑযা আমাদের নেই। কোভিডের সময় সরকার বলেছিল, আইসিইউর সংখ্যা বাড়াবে। প্রকল্পও হাতে নিয়ে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান আরটি পিসিআর ও লিকুইড অক্সিজেন সিস্টেম চালু করেছিল। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে সে প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। সরকার আইসিইউর প্রয়োজনীয়তার প্রতি গুরুত্ব দেয়নি। ফলে সে প্রকল্পের টাকা ফেরত চলে যায়। সরকার ভেবেছিল, হয়তো আর ১০০ বছরেও করোনার মতো পরিস্থিতি হবে না। কিন্তু দেখা গেছে, শিশু নিবিড় পরিচর্যা সেবার সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় এখনো বিভিন্ন রোগে অনেক শিশু মারা যাচ্ছে। তার মতে, যে কোনো ধরনের রোগ নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালের ভেতরে-বাইরে ভালো ব্যবস্থা রাখা উচিত। কিন্তু সে ধরনের পরিস্থিতি আমাদের দেশে তৈরি হয়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

