চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও প্রবাসীদের ঘুমহীন রাত

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও প্রবাসীদের ঘুমহীন রাত
ড. মাহরুফ চৌধুরী

ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে রাজনৈতিক গতিধারা নতুন মোড় নেয়। সে মুহূর্তগুলো কেবল একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ হয়ে থাকে না; বরং সেটা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সব মানুষের সমগ্র জাতিসত্তার চেতনাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। ইতিহাসের প্রতিটি বড় গণআন্দোলন, গণজাগরণ কিংবা রাষ্ট্ররূপান্তরের প্রক্রিয়ায় দেখা গেছে, দেশের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে অবস্থান করেও প্রবাসীরা নানাভাবে সেই পরিবর্তনের অংশ হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান তেমনই এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ, যা দেশের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনোজগতে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও তারা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র বিনির্মাণ প্রশ্নে প্রত্যক্ষ অংশীদারের মতোই উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত ও সক্রিয় ছিলেন।

আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রবাসীদের জীবনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো জীবন-বাস্তবতায় তারা দেশান্তরিত হলেও স্বদেশ তাদের চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে দেশ ছাড়তে পারে; কিন্তু মনোজগতে দেশ কখনই প্রবাসীদের ছেড়ে যায় না। জন্মভূমির মাটি ও মানুষ, শৈশবের স্মৃতি, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের যে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা স্বদেশ থেকে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না।

বিজ্ঞাপন

প্রবাসীদের কাছে বাংলাদেশ কেবল একটি রাষ্ট্রই নয়; এটি তাদের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের চিন্তাচেতনা, আবেগ-অনুভূতি, ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বড় একটি অংশ জুড়েই থাকে প্রিয় স্বদেশ। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন তারা বাংলা ভাষায় কথা বলেন, সন্তানের কাছে বাংলাদেশের গল্প বলেন, জাতীয় দিবসগুলো পালন করেন কিংবা দেশের খবর অনুসরণ করেন, তখন প্রকৃতপক্ষে তারা তাদের অস্তিত্বের একটি অংশকে দৈনন্দিন জীবনচর্চায় বাঁচিয়ে রাখেন। নাড়ির এই অদৃশ্য সংযোগই প্রবাসীদের স্বদেশ চেতনাকে জীবন্ত রাখে। তাই দেশের সংকট তাদের হৃদয়কে নাড়া দেয়, আর জাতীয় অর্জন তাদের গর্বিত করে। দেশের মানুষ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তখন প্রবাসীরাও মানসিকভাবে সেই সংগ্রামের অংশ হয়ে ওঠেন। ‌ঐতিহাসিক সত্যের অংশ হিসেবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।

স্বদেশ চেতনার পাশাপাশি প্রবাসীদের উদ্বেগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো দেশে রেখে আসা আপনজনদের কল্যাণ-চিন্তা ও স্বদেশের প্রতি গভীর টান। পৃথিবীর যেখানেই তারা থাকুন না কেন, তাদের ধ্যান-জ্ঞান জুড়ে থাকে বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং ফেলে আসা জীবনের অসংখ্য দূর-অতীত ও নিকট-অতীতের স্মৃতি। দূরদেশে অবস্থান করলেও প্রতিদিন তাদের মন পড়ে থাকে দেশের খোঁজ-খবরে। কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা সামাজিক সংকট দেখা দিলে প্রথমেই তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আমার আপনজনরা কেমন আছে’? চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় এই উদ্বেগ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত, সহিংসতা, দমন-পীড়ন ও অনিশ্চয়তার খবর তাদের উৎকণ্ঠিত করে তুলেছিল। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় অনেকেই রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করেছেন, ফোনে পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং তাদের নিরাপত্তার সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর রেখেছেন। প্রবাসীদের এই মানসিক অবস্থাকে কেবল রাজনৈতিক উদ্বেগ বলে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে; এটি ছিল স্বজন, স্বজাতি আর স্বদেশের প্রতি গভীর আবেগ, দায়িত্ববোধ এবং মানবিক সংযোগের বহিঃপ্রকাশ।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে বিভীষিকাময় মুহূর্ত ছিল যখন স্বৈরাচারী সরকার বাংলাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। এর ফলে দেশের সঙ্গে প্রবাসীদের সেতুবন্ধন হঠাৎ ভেঙে পড়ে। তখন দূরত্বের বাস্তবতা নির্মমভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়, নিজেদের ভাবতে হয় ভিনগ্রহের বাসিন্দা। ১৯ জুলাই ২০২৪-এর সেই যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতার মুহূর্তে অসংখ্য প্রবাসীর কাছে মনে হয়েছিল যেন বাংলাদেশ হঠাৎ করেই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে আড়াল হয়ে গেছে। আমার মতো অনেকের চেতনায় বাংলাদেশ যেন এ দুনিয়া হতে হারিয়ে গিয়েছিল। সময় কাটাতে হয়েছিল দুর্যোগকালীন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে। দেশে কী ঘটছে, কারা নিরাপদ আছে, কারা বিপদের মধ্যে আছে, কীভাবে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা যেতে পারেÑএসব কোনো কিছুই আর নিশ্চিতভাবে জানার উপায় ছিল না।

রাষ্ট্র যখন তথ্যপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে দেয়, তখন মানুষের কল্পনা ও আশঙ্কা বাস্তবতার চেয়েও দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সেই অজানাকে, যার সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য ও ধারণা পাওয়া যায় না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত অসংখ্য বাংলাদেশির কাছে সেই দিনগুলো ছিল অসহায়ত্ব, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর মানসিক যন্ত্রণার এক দীর্ঘ অধ্যায়। অনেক প্রবাসী রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন। কর্মস্থলে থেকেও কাজে মনোযোগ দিতে পারেননি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বসেও মন পড়ে ছিল দেশের অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে।

আমি নিজেও সত্যিকার অর্থে সেই জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে কোনো কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারিনি। প্রবাস জীবনের ব্যস্ততা, পেশাগত দায়িত্ব কিংবা ব্যক্তিগত কাজÑসবকিছুই যেন অর্থহীন মনে হচ্ছিল। সারাক্ষণ মনে হতো দেশে কী হচ্ছে! আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা কেমন আছের, পরিচিতজনদের কেউ বিপদে পড়েছেন কি না? নানাভাবে মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বহু প্রবাসী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বাংলাদেশের সর্বশেষ সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার জন্য। কেউ তাদের পরিবারের খোঁজ জানতে চেয়েছেন, কেউ বন্ধুদের খবর জানতে চেয়েছেন, আবার কেউ কেবল নিশ্চিত হতে চেয়েছেন যে, তাদের প্রিয় মানুষগুলো এখনো কী নিরাপদে আছেন। সেই ফোনকল, বার্তা এবং উদ্বেগভরা প্রশ্নগুলো আজও স্মৃতিতে স্পষ্ট হয়ে আছে। সে সময় প্রবাসীদের অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাদের সম্মিলিত মানসিক যন্ত্রণা। একজনের উৎকণ্ঠা আরেকজনের উদ্বেগকে স্পর্শ করেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রবাসী গ্রুপ, কমিউনিটি ফোরাম এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের নেটওয়ার্কগুলো তখন পরিণত হয়েছিল উদ্বিগ্ন মানুষের অনানুষ্ঠানিক সহায়তা ব্যবস্থায়। কেউ সামান্য কোনো তথ্য পেলেই অন্যদের জানাতেন, কেউ সম্ভাব্য যোগাযোগের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন, কেউ আবার শুধু মানসিক সমর্থন দেওয়ার জন্য অন্যদের পাশে দাঁড়াতেন। এই সম্মিলিত উদ্বেগ ও পারস্পরিক সংযোগই প্রমাণ করে, প্রবাসী সম্প্রদায় কেবল বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের সমষ্টি নয়; বরং একটি বিস্তৃত মানবিক ও আবেগিক নেটওয়ার্ক, যার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে স্বদেশ চেতনা।

প্রবাসীরা সেদিন নতুন করে উপলব্ধি করেছিলেন যে, দূরে থাকলেও তাদের হৃদয়, চিন্তা এবং অস্তিত্বের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের সঙ্গেই বাঁধা। স্বদেশের সংকট তখন তাদের ব্যক্তিগত সংকটে পরিণত হয়েছিল। সেই ঘুমহীন রাতগুলো, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটানো দীর্ঘ প্রহরগুলো এবং একটি ফোনকলের অপেক্ষায় থাকা অসংখ্য মানুষের মুখ আজ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের এক নীরব কিন্তু গভীর মানবিক দলিল হয়ে আছে।

প্রবাসীদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু পরিবারের জীবনমান উন্নত করে না; জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ফলে প্রবাসীরা যখন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, তখন সে উদ্বেগের সঙ্গে অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে। তারা জানেন, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন কেবল দেশের মানুষের জন্যই নয়; তাদের নিজেদের পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপরে তুলে ধরা এ তিনটি বাস্তবতা তথা স্বদেশ চেতনা, আপনজনের প্রতি আবেগগত বন্ধন এবং অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রবাসীদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ভৌগোলিক দূরত্ব তাদের শারীরিক উপস্থিতিকে সীমিত করতে পেরেছিল; কিন্তু তাদের চিন্তাভাবনা, গণদাবির পক্ষে অবস্থান এবং স্বৈরাচারী সরকারবিরোধী কর্মতৎপরতাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ তাদের আন্দোলনের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর বিশেষ সক্ষমতা দিয়েছে। ফলে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নাগরিকদের আন্দোলন ছিল না; এটি ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক বাংলাদেশি চেতনারও বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়েছিল, যার সক্রিয় অংশীদার ছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বিশেষ করে রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধের আন্দোলনে অংশ নিয়ে লাখ লাখ প্রবাসী সেদিন মাফিয়া সরকারের হৃৎপিণ্ডে আঘাত করেছিলেন। প্রবাসীদের একটি অংশ মনে করেছিল যে, রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাদের অবস্থান প্রকাশের অধিকার রয়েছে। এই উদ্যোগের ব্যাপ্তি ও কার্যকারিতা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও এটি ঐক্য ও সহযোগিতার এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, প্রবাসীরা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের প্রভাব প্রয়োগের সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং প্রয়োজনে অর্থনৈতিক শক্তিকেও নাগরিক অবস্থানের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে প্রস্তুত ছিলেন।

গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসীদের সবচেয়ে দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল তথ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় তথ্য কেবল সংবাদ নয়; এটি ক্ষমতা, প্রতিরোধ ও জনমত গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, যখন কোনো রাষ্ট্র তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তখন বিকল্প তথ্যব্যবস্থা সামাজিক প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যখন তথ্যপ্রবাহ নানা সীমাবদ্ধতা, বিভ্রান্তি আর নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়ছিল, তখন প্রবাসীরা বিকল্প তথ্যপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবিনার, লাইভ আলোচনা, ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা দেশের পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া খণ্ডিত তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, ভিডিওচিত্র, আলোকচিত্র এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রচারে অনেক প্রবাসী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একইসঙ্গে দেশের ভেতরের আন্দোলনকারী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মধ্যে একটি কার্যকর যোগাযোগ-সেতু তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই, অনুবাদ, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মহলে প্রচারের দায়িত্ব পালন করেন। ফলে দেশের অভ্যন্তরে যে কণ্ঠস্বর কখনো কখনো সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল, তা প্রবাসীদের মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিসরে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। প্রবাসীরা কেবল তথ্যের গ্রহীতা ছিলেন না; বরং তারা তথ্য নিয়ন্ত্রণ ও তথ্য-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তথ্যসংগ্রাম তথা ‘ইনফরমেশন অ্যাক্টিভিজম’-এর সক্রিয় অংশে পরিণত হয়েছিলেন। একবিংশ শতাব্দীর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আন্দোলন-সংগ্রামে তথ্যপ্রবাহের গুরুত্ব বিবেচনা করলে এই ভূমিকার তাৎপর্য আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসীদের ভূমিকার একটি বিশেষ দিক ছিল তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা। তারা স্থানীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফিং দেন, বিবৃতি প্রদান করেন, তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। অনেক দেশে স্মারকলিপি প্রদান, চিঠি প্রেরণ, গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন, সংবাদ সম্মেলন এবং প্রতিনিধি বৈঠকের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন।

রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, আলোচনা সভা এবং সংহতি কর্মসূচির আয়োজন করেন। লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, টরন্টো, সিডনি, বার্লিন, প্যারিস, রোম, স্টকহোমসহ বিশ্বের নানা শহরে অনুষ্ঠিত এসব কর্মসূচি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও জনমতের দৃষ্টি আকর্ষণে সহায়ক হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে এসব কর্মসূচিতে শুধু বাংলাদেশিরাই নন, বরং স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন দেশের নাগরিকও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফলে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ একটি জাতীয় ইস্যুর গণ্ডি অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। বিদেশের মাটিতে এই সংহতি প্রকাশ দেশের আন্দোলনকারীদের জন্য নৈতিক শক্তির উৎস হয়ে ওঠে।

গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন সময়ে প্রবাসীদের এই সম্পৃক্ততাকে কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল মূলত স্বদেশপ্রেম, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। প্রবাসীরা কেবল অর্থনৈতিক অবদানের উৎস নন; তারা একইসঙ্গে জাতীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক শক্তি। দেশ ও দশের কল্যাণে তাদের ভূমিকা বহুমাত্রিক।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন