জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রাক্কালে সংঘটিত দুটি ঘটনা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে গভীর বিতর্কের জন্ম দেয়। প্রথমটি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একদল জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সম্পাদক ও কলামিস্টের মতবিনিময়। দ্বিতীয়টি, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আওয়ামীপন্থি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সমাবেশ ও বক্তব্য। এই দুটি অনুষ্ঠানে কিছু সাংবাদিকের প্রকাশ্য মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠেÑসেগুলো কি স্বাধীন সাংবাদিকের ভাষা ছিল, নাকি রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন? নাকি ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে আরো বেশি উসকে দিয়েছিল? হাসিনার হত্যাযজ্ঞকে বৈধতা দিয়েছিল? সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক নীতিমালা, পেশাগত নিরপেক্ষতা ও জনআস্থার মানদণ্ডে ঘটনাগুলো আজও আলোচনার বিষয়। তাই আবেগ নয়, তথ্য ও নৈতিকতার আলোকে এসব ঘটনার মূল্যায়ন জরুরি।
‘শেখ হাসিনার সঙ্গে আছেন, প্রয়োজনে যে কোনো কিছু করতে প্রস্তুত’Ñএই বক্তব্যটি ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকদের একটি মতবিনিময় সভায় উঠে এসেছিল। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যে এডিটরস গিল্ডের উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই সভার আয়োজন করা হয়।
এই বিষয়ে ওইদিন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) যে সংবাদটি পরিবেশন করে সেটি আমরা এখানে তুলে ধরছি।
দেশব্যাপী নাশকতা ও নৃশংসতার ঘটনায় কোনো অপরাধীকে ছাড় না দেওয়ার দাবি জানিয়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা কোটা সংস্কার আন্দোলনের আড়ালে জামায়াত-বিএনপি কর্তৃক সংঘটিত ধ্বংসাত্মক তাণ্ডবকে ব্যর্থ করতে গোয়েন্দা প্রতিবেদন বাস্তবায়নে কোনো ব্যর্থতা ছিল কি না, সে ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন।
সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা ছাত্রলীগে আরো মেধাবী শিক্ষার্থীদের যোগদানে আকৃষ্ট করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালীকরণ এবং জনপ্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কার্যালয়ে মতবিনিময় সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকরা এসব কথা বলেন। এডিটরস গিল্ডের উদ্যোগে এ আয়োজনে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও হেড অব নিউজসহ ৩২ জন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিকরা বলেন, তারা শেখ হাসিনার সঙ্গে আছেন এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় যে কোনো কিছু করতে প্রস্তুত।
মহাখালীতে অগ্নিসংযোগের ঘটনার কথা তুলে ধরে ডিবিসি সম্পাদক জায়েদুল আহসান পিন্টু বলেন, বেলা তিনটার পর সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য ছিলেন না। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘কেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্য সেখানে ছিলেন না এবং কেন একজন কর্মকর্তা তার বাহিনী নিয়ে জায়গা ছেড়ে চলে গেলেন?’ তিনি বলেন, গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল এবং সে কারণেই পুলিশ রাজধানীর আশপাশে চেকপোস্ট বসায়। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেছেন, রাজধানীতে কোনো পিঁপড়া প্রবেশ করতে পারবে না, অথচ হাতি প্রবেশ করেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে।
ভোরের কাগজ সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, বিএনপি-জামায়াতের এই বিপর্যয় ও নৃশংসতায় দলের দুর্বলতা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম এই নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তির আওতায় আনার ওপর জোর দেন।
ডিবিসির এডিটর ইন চিফ ও সিইও মনজুরুল ইসলাম সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে আত্মসমালোচনা করার এবং জনপ্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করার পরামর্শ দেন।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবেদ খান বলেন, তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তাদের আস্থা ও বিশ্বাস থাকায় তার জন্য যা প্রয়োজন তা করতে পারেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করার সময় এসেছে। কারণ, তারা এখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের যন্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এছাড়া দৈনিক যুগান্তর-এর সম্পাদক সাইফুল আলম, ঢাকা জার্নাল-এর প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাসহ মোট ১৮ জন সাংবাদিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। আরো উপস্থিত ছিলেন আজকের পত্রিকার সম্পাদক অধ্যাপক গোলাম রহমান, সময় টেলিভিশনের আহমেদ জুবায়ের, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর সম্পাদক ইনাম আহমেদ, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের শামসুর রহমান, একুশে টেলিভিশনের রাশেদ চৌধুরী, মাছরাঙা টেলিভিশনের রেজানুল হক রাজা, আমাদের নতুন সময়ের সম্পাদক নাসিমা খান, ডিবিসির সম্পাদক প্রণব সাহা, এটিএন নিউজ-এর প্রভাষ আমিন, নিউজ ২৪-এর রাহুল রাহা, বৈশাখী টেলিভিশনের সাইফুল ইসলাম, এক টাকার খবরের সুকান্ত গুপ্ত, বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব মো. নাঈমুল ইসলাম খান অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এবং স্বাগত বক্তব্য দেন এডিটরস গিল্ডের সভাপতি মোজাম্মেল হক বাবু।
২০২৪ সালের ২৭ জুলাই আওয়ামীপন্থি সাংবাদিকরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সরকারের সমর্থন এবং বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে সমাবেশ করে। সমাবেশে সরকারের দমন-পীড়নের প্রতি সমর্থন জানান এই সাংবাদিকরা। সমাবেশে সাংবাদিক নেতারা কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ‘বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের দেশজুড়ে চালানো হত্যাকাণ্ড, সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় সম্পদ ধ্বংস এবং অগ্নিসংযোগের তীব্র নিন্দা জানান। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশিত সরকারি পদক্ষেপগুলোর প্রতি তারা পূর্ণ সমর্থন ও সংহতি জ্ঞাপন করেন। সমাবেশে সাংবাদিক নেতারা বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একটি গোষ্ঠী দেশে অস্থিতিশীল ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছিল। তারা সহিংসতাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
ইকবাল সোবহান চৌধুরী সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। তিনি সারাদেশে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান। কোটা আন্দোলনের সময় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি, তারাই এসব হামলার সঙ্গে জড়িত। বিএফইউজের সভাপতি ওমর ফারুক বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে সহিংসতার নিন্দা জানান। মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল সহিংসতার নিন্দা ও দায়ীদের বিচারের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
আরো বক্তব্য রাখেন, শ্যামল দত্ত, আব্দুল জলিল ভূঁইয়া, সোহেল হায়দার চৌধুরী, আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া, সৈয়দ শুক্কুর আলী শুভ, নজরুল ইসলাম মিঠু, আব্দুল মাজিদ, রফিকুল ইসলাম রতন প্রমুখ।
সাংবাদিক, না রাজনৈতিক মুখপাত্র?
সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় কী? তিনি সত্যের অনুসন্ধানী। তিনি ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়ান। তিনি প্রশ্ন করেন। তিনি জবাবদিহি নিশ্চিত করেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র নন। হাসিনার সহিংসতার পক্ষে দাঁড়িয়ে এই সাংবাদিকরা প্রকাশ্যে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে সাংবাদিকের মৌলিক পরিচয়কে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময় সভায় হোক কিংবা পরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সমাবেশে-অনেক বক্তব্যে সাংবাদিকের চেয়ে রাজনৈতিক অবস্থানই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সোসাইটি অফ প্রোফেশনাল জার্নালিস্টস (এসপিজে)-এর প্রথম নীতি হলো-Seek Truth and Report It। অর্থাৎ সত্য অনুসন্ধান করো, তারপর প্রকাশ করো। দ্বিতীয় নীতি-Act Independently- স্বাধীন থাকো। কোনো রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত বা আর্থিক প্রভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করো না। সাংবাদিকের প্রথম দায়িত্ব সত্যের প্রতি। কোনো দলের প্রতি নয়। কোনো সরকারের প্রতিও নয়। ইউনেস্কোর সাংবাদিকতা নির্দেশিকায় বারবার বলা হয়েছে, সংবাদকর্মীর বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তার নিরপেক্ষতা, বহুমতের প্রতি সম্মান এবং প্রমাণভিত্তিক উপস্থাপনার ওপর। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের আচরণবিধিও একই শিক্ষা দেয়। সংবাদ প্রকাশে সতর্কতা, ন্যায়পরায়ণতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং অযাচিত পক্ষপাত এড়ানোর কথা সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
এই মানদণ্ড সামনে রাখলে কয়েকটি প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে। যখন একজন সাংবাদিক তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীকে নিশ্চিতভাবে দায়ী ঘোষণা করেন, তখন তিনি কি তথ্য দিচ্ছেন, নাকি রায় শুনিয়ে দিচ্ছেন?
যখন কোনো সাংবাদিক ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থনের ভাষা ব্যবহার করেন, তখন সাধারণ মানুষ তাকে স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে দেখবে, নাকি সরকারের সমর্থক হিসেবে? যখন সাংবাদিকের বক্তব্যে প্রশ্ন কম, প্রশংসা বেশি থাকে, তখন সাংবাদিকতার মৌলিক ভূমিকা কোথায় দাঁড়ায়?
সাংবাদিকের শক্তি তার বিশ্বাসযোগ্যতায়। সেই বিশ্বাসযোগ্যতা একদিনে তৈরি হয় না। আবার এক দিনের আচরণেই তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইতিহাসের প্রতিটি সংকট সাংবাদিকদেরও পরীক্ষা নেয়। কে সত্যের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আর কে ক্ষমতার পাশেÑসময় তার হিসাব রাখে। রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলায়। সরকার আসে, সরকার যায়। কিন্তু সাংবাদিকতার নৈতিকতা বদলায় না।
সাংবাদিক যদি জনগণের আস্থা হারান, তবে তিনি শুধু নিজের নয়, পুরো পেশার ক্ষতি করেন। নতুন প্রজন্ম তখন সাংবাদিকতাকে আর স্বাধীন পেশা হিসেবে দেখে না; দেখে রাজনৈতিক আনুগত্যের আরেকটি ক্ষেত্র হিসেবে। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সামনে তাই আজও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ একটাইÑদল নয়, সত্যের পাশে দাঁড়ানো। কারণ সাংবাদিকের একমাত্র দল হওয়া উচিত সত্য।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


