ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) হেফাজতে আটকে রাখা কোটা সংস্কার আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় ছয় ছাত্রনেতা ছাড়া পান ২০২৪ সালের ১ আগস্ট (৩২ জুলাই)। ওইদিন দুপুর দেড়টার দিকে কালো রঙের দুটি গাড়িতে করে তাদের নিজ নিজ বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
তাদের মধ্যে কেউ ছয়দিন, কেউ পাঁচদিন আবার কেউ চারদিন ডিবি হেফাজতে ছিলেন। ৩২ ঘণ্টা টানা অনশনে থাকার পর মুক্তি পেয়ে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
এ দিন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে সরকারের নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের শীর্ষনেতা নাহিদ ইসলামের বাবা বদরুল ইসলাম জানান, ১ আগস্ট ভোর ৬টায় সবার বাসায় ফোন দিয়ে ডিবি অফিসে যেতে বলা হয়। পরে দুপুর দেড়টার দিকে ডিবির গাড়ি দিয়ে তাদের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
তিনি আরো জানান, নাহিদরা দুদিন ডিবি অফিসে অনশন করে। তারা এখন শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত। নুসরাত তাবাসসুমকে আলাদাভাবে রাখা হয়েছিল। তিনি ৩২ ঘণ্টা অনশনে ছিলেন।
মুক্তির পর সারজিস আলম ছয় সমন্বয়কের পক্ষে ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘ছয়দিন ডিবি হেফাজতে আটকে রাখা যায়, কিন্তু বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে আটকানো সম্ভব নয়। যতদিন জুলুম চলবে, ততদিন আন্দোলন চলবে।’ এ স্ট্যাটাস দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট অকার্যকর হয়ে যায়।
প্রথম দফায় ১৯ জুলাই মধ্যরাতে খিলগাঁও থেকে নাহিদকে তুলে নেওয়া হয়। একদিন পর গুরুতর আহতাবস্থায় পূর্বাচলে ফেলে দেওয়া হয়। আসিফ ও বাকেরকেও একইভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পাঁচদিন পর চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। এরপর তারা গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে তাদের আবার তুলে নিয়ে যায় ডিবি।
এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের স্মরণে ১ আগস্ট সারা দেশে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি পালিত হয়। এতে প্রতিবাদী স্লোগান, গণসংগীত, পথনাটক, দেয়াল লিখন ও চিত্রাঙ্কন অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থী-শিক্ষক, আইনজীবী ও অভিভাবকরা এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজসহ অন্তত ১৬ জেলা ও মহানগরীতে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এ কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাধা দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আবার কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। কয়েকটি স্থান থেকে বেশকিছু শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়।
এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) শিক্ষার্থীরা মিছিল করেন। ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও নিপীড়নের প্রতিবাদে’ ঢাবি অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ৯ দফা দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মিছিল বের করেন তারা। এদিকে সারা দেশ ও ঢাবির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামীপন্থি নীল দল। লিখিত বক্তব্যে তারা শিক্ষার্থীদের দাবির কাঙ্ক্ষিত সমাধান হওয়ায় তাদের আন্দোলনের পথ পরিহারের আহ্বান জানান।
জাহাঙ্গীরনগর ও সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ চালিয়ে যান। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি), বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ (ইবি) বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি পালিত হয়। ময়মনসিংহ, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় পুলিশের বাধা ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
অনেক জায়গায় শিক্ষার্থীরা বৃষ্টির মধ্যে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন । এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কোথাও কোথাও শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের দাবি জানান বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের প্রাণহানি, হামলা, নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ করেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকানরা। তারা শিক্ষার্থী হত্যার বিচার দাবি করেন। একই সঙ্গে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স না পাঠানোর আহ্বান জানান।
নতুন কর্মসূচি ঘোষণা
কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নিয়ে হতাহত ছাত্র-জনতার স্মরণে ২ আগস্ট দেশব্যাপী ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণহত্যা ও গণগ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এবং শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ২ আগস্ট জুমার নামাজ শেষে দোয়া, শহীদদের কবর জিয়ারত, মন্দির, গির্জাসহ সব উপাসনালয়ে প্রার্থনা এবং ছাত্র-জনতার গণমিছিল অনুষ্ঠিত হবে। শ্রমিক, পেশাজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী, মানবাধিকারকর্মী, বুদ্ধিজীবী, আলেম-ওলামাসহ দেশের সর্বস্তরের নাগরিকদের এ কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
৭৮ শতাংশ শহীদের শরীরে প্রাণঘাতী ক্ষত
কোটা আন্দোলনের সহিংসতায় তৎকালীন সরকারের হিসাবে ১ আগস্ট পর্যন্ত ২১২ জন শহীদ হন, যাদের মধ্যে ১৩৭ জনের শরীরে প্রাণঘাতী গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। আহত প্রায় ছয় হাজার ৭০০ জনের মধ্যে ২৩১ জন গুলিবিদ্ধ, অনেকের চোখে ছররা গুলি লাগে, কয়েকজনের পা কেটে ফেলতে হয়। তবে হতাহতের সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি ছিল।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তখন বিবৃতিতে জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিক্ষোভ দমনকালে বেআইনিভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। সহিংসতা ও গুলির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, বাংলাদেশে গুলির দৃশ্য নিন্দনীয় এবং সরকারের প্রতি জনগণের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকার যে অন্যায় করছে, এ সরকারের আর কোনো অধিকার নেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার।
প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চান হাসিনা
পতিত ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১ আগস্ট কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে বলেন, সাম্প্রতিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। প্রয়োজনে জাতিসংঘ বা অন্য দেশের বিশেষজ্ঞ তদন্তকারী পাঠানো হোক। জামায়াত-শিবির ও বিএনপিকে এ সহিংসতার পেছনে দায়ী করে তিনি বলেন, তারা কোটা আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস চালিয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছে, যারা তদন্ত করছে।
তিনি আরো বলেন, যারা দেশের উন্নয়ন চায় না, তারা ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি গাজা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থী দমন প্রক্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, বাংলাদেশ সরকার এমন পথ অনুসরণ করছে না।
হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে জাতিসংঘ জানায়, সরকারি চাকরিতে কোটা আন্দোলনের মধ্যে সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশকে চাহিদা অনুযায়ী সহায়তা দিতে তারা প্রস্তুত। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে ১৬-২১ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণহানি, সহিংসতা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা তদন্তে হাইকোর্ট বিভাগের তিন বিচারপতির সমন্বয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে।
জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ
১ আগস্ট বিকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নির্বাহী আদেশে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮(১) ধারা অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করে সরকার। নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী জামায়াত-শিবির ও তাদের অঙ্গসংগঠন আর কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে না। তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের এ সিদ্ধান্ত কোটা আন্দোলনের সময় সহিংসতায় জামায়াত-শিবিরের জড়িত থাকার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপরাধের প্রমাণসহ সাম্প্রতিক সহিংসতায় তাদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য সরকার হাতে পেয়েছে। তিনি বলেন, যারা নতুন করে দলগত রাজনীতি করবে, তাদের ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ চলে যাওয়ার চেষ্টা আটকানো হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


