ফেনীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের হামলায় শহীদ হয়েছিলেন ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ। পরিবারের দাবি, আন্দোলনে যাওয়ার সময় তিনি মায়ের একটা ওড়না মাথায় বেঁধে বের হতেন। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট আন্দোলনে গিয়ে আর জীবিত ফিরে আসেননি; বন্ধুরা তার গুলিবিদ্ধ নিথর দেহ বাড়িতে নিয়ে আসে।
তিন ভাই-বোনের মধ্যে শ্রাবণ ছিলেন সবার বড় এবং পরিবারের একমাত্র ছেলে। ২০২৩ সালে ফেনী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
পরিবার ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি বন্ধুদের নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। ৪ আগস্ট দেশজুড়ে অসহযোগ কর্মসূচির দিনে সকাল থেকে ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে ছাত্র-জনতার সঙ্গে অবস্থান নেন। সেদিন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করছিল ছাত্র-জনতা। দুপুরে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী নেতাকর্মীরা অতর্কিতভাবে চারদিক থেকে ঘেরাও করে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়। এতে অন্যদের সঙ্গে শ্রাবণও গুলিবিদ্ধ হন। পরিবারের দাবি, তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছয়টি গুলি লাগে। পরে বন্ধুরা তাকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রাথমিক চিকিৎসা ও লাশ দাফনেও বাধা দিয়েছিল ফ্যাসিবাদীরা জানিয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে শ্রাবণের বাবা নেছার আহমেদ বলেন, সেদিন শ্রাবণের বন্ধু মাহফুজ তার লাশ নিয়ে আসে। হাসপাতাল থেকে লাশ আনার পরপরই দ্রুত সময়ের মধ্যে লাশ দাফন করে ফেলতে পুলিশের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হয়। ফলে বাধ্য হয়ে অল্প সময়ের মধ্যে তার নানা বাড়ির সামনে জানাজা আদায় করে ফুলগাজী উপজেলার দক্ষিণ আনন্দপুর গ্রামে দাদা বাড়ির নিকটবর্তী পারিবারিক কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।
তিনি আরো বলেন, ঢাকার রাজপথে অগণিত শিক্ষার্থীর রক্তস্রোত প্রতিবাদের ঢেউ তুলেছিল শ্রাবণের হৃদয়ে। বিবেকের তাগিদে মায়ের ওড়না মাথায় বেঁধে প্রতিদিন আন্দোলনে চলে যেত সে। পরিবারের কেউ বাধা দিলে বলত, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। আমাদের এখন আর কোনো আনন্দ নেই। আখিরাতে ছেলের সঙ্গে দেখা হলে সেদিনই আনন্দ হবে।
নেছার আহমেদ বলেন, কোটি কোটি টাকা বা অট্টালিকা আমরা চাই না। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সন্তানের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারই আমাদের একমাত্র চাওয়া। অনেক আসামি দেশের বাইরে চলে গেছে। আবার অনেকে দেশে থাকলেও আইনের আওতায় আসেনি। বিচার নিশ্চিত না হলে আমাদের হাজারো সন্তানের রক্ত ও আত্মত্যাগ বৃথা যাবে।
অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের প্রতি হতাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, তারা এখন রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। শহীদ পরিবারের দিকে কে তাকাবে? এজন্যই এখনো বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামতে হয়। আমরা ন্যায্য ও প্রাপ্য অধিকার চাই।
শহীদ শ্রাবণের মা ফাতেমা আক্তার শিউলি বলেন, আমার ছেলে বলত, আম্মু এখনই সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার। আমি বারণ করলেও শুনত না। প্রতিদিন আন্দোলনে চলে যেত। যাওয়ার সময় আমার একটি ওড়না মাথায় বাঁধত এবং তার নিজের নাম লেখা একটি জার্সি পরে যেত। তার মামা, বাবা সবাই তাকে না যাওয়ার জন্য বোঝালে সে উল্টো সবাইকে বলত, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে আল্লাহর দরবারে জবাব দিতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের সন্তানরা কোনো দলের পক্ষ হয়ে আন্দোলনে যায়নি। তারা দেশের মানুষের আজাদী ও রাষ্ট্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছে। এখন তাদের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। জুলাইকে নিয়ে, শহীদ পরিবারকে নিয়ে যখন কটূক্তি করা হয়; তখন কষ্ট লাগে।
শিউলি আরো বলেন, মৃত্যুর আগের রাতে ছেলের আচরণ কিছুটা অস্বাভাবিক ছিল। গভীর রাতে আমার কাছে এসে কিছুক্ষণ কথা বলে আবার নিজের কক্ষে চলে যায়। তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সেটিই ছিল আমার সঙ্গে তার শেষ কথা।
তিনি বলেন, মসজিদের ইমামকে সেদিন বাধ্য করা হয়েছিল যেন না বলেন শহীদ শ্রাবণের কয়টা গুলি লেগেছে। আমার ছেলে প্রথমে মহিপালের ইত্যাদি হোটেলের সামনে দু’টি গুলি খায়, পরে পাসপোর্ট অফিসের সামনে আরও চারটি গুলিতে লুটিয়ে পড়ে।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ৪ আগস্টের পর থেকে আমাদের জীবনের সব আনন্দ শেষ হয়ে গেছে। বড় মেয়েটি এখনো ভাইয়ের শোকে স্বাভাবিক হতে পারেনি। আমার আনন্দ বা সুখ-আহ্লাদ সবকিছু শ্রাবণের কাছে রয়ে গেছে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমান সরকারের ফেনীর তিনজন এমপি রয়েছেন, যাদের একজন মন্ত্রীও। কিন্তু কেউ শহীদ পরিবারকে সান্ত্বনা পর্যন্ত দিতে আসেননি। আমাদের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই। আমরাই বাংলাদেশ।
তিনি অভিযোগ করেন, আসামিরা বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বড় বড় আসামিরা দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে। দুই বছর হতে চললেও এখনো বিচার কার্যকরভাবে শুরু হয়নি। এ দুনিয়াতে বিচার না হলেও মহান আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি। সরকার জুলাই সনদও বাস্তবায়ন করেনি। ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। প্রয়োজনে আমি রক্ত দেব তবু জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং খুনিদের দ্রুত বিচার চাই।
শ্রাবণের বাল্যবন্ধু ইফরাদ বলেন, অনেক বন্ধু পাওয়া যায়, কিন্তু শ্রাবণের মতো মানুষ আর পাওয়া যাবে না। তিনি ন্যাশনাল চিলড্রেনস টাস্কফোর্স (এনসিটিএফ) ফেনী জেলা কমিটির সহ-সভাপতি এবং ফেনী ক্রিকেট একাডেমির সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
২০০৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া শ্রাবণ ফেনী শহরের বারাহীপুর এলাকায় বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করতেন। তাদের পৈত্রিক বাড়ি ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়নে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড় এবং পরিবারের একমাত্র ছেলে।
শ্রাবণ হত্যার ঘটনায় তার মা শিউলি বাদী হয়ে ফেনী মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীসহ ১০৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরো শতাধিক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

