‘মার্চ ফর জাস্টিস’-এ পুলিশি হামলা, প্রতিবাদে উত্তাল দেশ

নতুন কর্মসূচি ঘোষণা

‘মার্চ ফর জাস্টিস’-এ পুলিশি হামলা, প্রতিবাদে উত্তাল দেশ
ছবি: সংগৃহীত

কোটা সংস্কার আন্দোলনে হত্যা, গণগ্রেপ্তার, হামলা-মামলা ও গুমের প্রতিবাদে ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই সারা দেশে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ৯ দফা দাবিতে হওয়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এ কর্মসূচিতে উত্তাল হয়েছিল গোটা দেশ। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মার্চ ফর জাস্টিসে ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। বিভিন্ন জায়গায় লাঠিপেটা, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে পুলিশ। এতে সাংবাদিকসহ আহত হন শতাধিক ব্যক্তি, আটক করা হয় শতাধিক বিক্ষোভকারীকে ।

পতিত হাসিনা সরকারের সৃষ্টি করা ভীতিকর পরিস্থিতির কারণে আগের দিন ৩০ জুলাই রাতে টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচির ঘোষণা করেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের। আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের মুক্তি, শিক্ষার্থী হত্যা, গ্রেপ্তার শিক্ষার্থীদের মুক্তিসহ ৯ দফা দাবিতে ৩১ জুলাই ঢাকার শাহবাগ, টিএসসি, নীলক্ষেত, চট্টগ্রামের নিউ মার্কেট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গেট, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, কক্সবাজারসহ প্রায় সব শহরে একযোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়। বিক্ষোভে অনেকের হাতে ছিল রক্তমাখা পতাকা ও লাল কাপড়ের ব্যানার।

বিজ্ঞাপন

মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচির অংশ হিসেবে ওইদিন দুপুর ১২টা থেকে রাজধানীতে হাইকোর্টের মাজার গেট এলাকায় জড়ো হন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। সেখান থেকে কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ। বিক্ষোভকারীরা প্রায় তিন ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করে নানা স্লোগান দেন। হাইকোর্টের ভেতরেও আইনজীবীদের একটি দল মিছিল করেন। শিক্ষার্থীদের আরেকটি অংশ দুপুর ১টার দিকে মিছিল নিয়ে হাইকোর্টের দিকে যেতে চাইলে আটকে দেয় পুলিশ। পরে বিক্ষোভকারীরা দোয়েল চত্বরে কিছুক্ষণ অবস্থান করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে সমাবেশ করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মহুয়া মঞ্চের সামনে মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরা অংশ নেন। তারা গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। সিলেটে এ কর্মসূচিতে পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা অগ্রসর হতে গেলে সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। এতে শিক্ষার্থীসহ অন্তত ২০ জন আহত হন।

খুলনায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে পুলিশ। শিক্ষার্থীরাও পাল্টা পুলিশকে লক্ষ করে ইটপাটকেল ছোড়েন। এতে সাতরাস্তা মোড়, রয়েল মোড়সহ পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

বরিশালে মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করলে আন্দোলনকারীদের লাঠিপেটা করে পুলিশ। দফায় দফায় সংঘর্ষে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। এ সময় কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আটক করে পুলিশ। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিভাবকরাও একাত্মতা প্রকাশ করেন।

চট্টগ্রামে পুলিশের বাধা ভেঙে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আদালত চত্বরে প্রবেশ করেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেন আইনজীবীরাও। আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা বিক্ষোভকারীদের বাধা দেন।

রাজশাহীতে শিক্ষার্থীরা আদালতের সামনে সমাবেশ করার প্রস্তুতি নিলে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি সদস্যরা সতর্ক পাহারা দেন। এ সময় ১৫ জনকে আটক করা হয়। শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে সমর্থন দেয় জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম।

দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার ওপর নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তারের প্রতিবাদে শোভাযাত্রা ও সমাবেশ করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শিক্ষকদের একাংশ।

গাজীপুরের রেলগেট থেকে শুরু করে শিববাড়ী মোড় পর্যন্ত বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। দিনাজপুরে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি থেকে ১০ জনকে আটক করা হয়। ফরিদপুরে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। লক্ষ্মীপুর আদালত চত্বরে আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভের চেষ্টা করলে পুলিশি বাধায় পণ্ড হয়ে যায়। আইনজীবীরা বিক্ষোভের চেষ্টা করলে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা বাধা দেন। যশোরে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় লাঠিচার্জ করে পুলিশ ছয়জনকে আটক করে। ঠাকুরগাঁওয়ে কর্মসূচিতে লাঠিচার্জ করে পুলিশ, এতে আহত হন দুই শিক্ষার্থী। হবিগঞ্জের বৃন্দাবন সরকারি কলেজের সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে মিছিল হয় নরসিংদীতে। বগুড়া শহরেও মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। ময়মনসিংহে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি পালিত হয় পুলিশের বেষ্টনীতে।

এদিকে ১ আগস্ট ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ নামে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। আন্দোলনের সহসমন্বয়ক রিফাত রশিদের পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, এ কর্মসূচি অনুযায়ী ১ আগস্ট শিক্ষার্থী নির্যাতনের ভয়ংকর দিনরাতের স্মৃতিচারণ করা হবে। শহীদ ও আহতদের নিয়ে পরিবার ও সহপাঠীরা স্মৃতিচারণ করবেন। শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে চিত্রাঙ্কন, গ্রাফিতি, দেয়াল লিখন, ফেস্টুন, ডিজিটাল পোর্ট্রেট প্রভৃতি তৈরি করা হবে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) হেফাজতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে অবিলম্বে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান নব্বইয়ের ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতারা। ৩১ জুলাই ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদকে ডিবিপ্রধানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

কোটা আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে বন্ধ করে দেওয়া ফেসবুক, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ১৪ দিন পর ৩১ জুলাই সচল হয় । ওইদিন বেলা ৩টার পরপরই এগুলো ব্যবহার শুরু হলে শিক্ষার্থীসহ অনেকে তাদের ফেসবুক প্রোফাইলে মুখে লাল কাপড় বাঁধা ছবি আপলোড করে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। হ্যাশট্যাগ ‌#MarchforJustice, #JusticeforRifat, #JusticeforImran, #RedClothProtest ট্রেন্ড করা হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্রশ্নে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির দুপক্ষ। সমিতি ভবনে প্রথমে সংগঠনটির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং পরে সম্পাদক শাহ মঞ্জুরুল হক সংবাদ সম্মেলন করেন।

বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে ‘আন্দোলনকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচারে গ্রেপ্তার এবং নির্যাতনের মতো বিষয়গুলোতে গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লেখা এক চিঠিতে ভবিষ্যৎ নির্যাতন বন্ধে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা খাতের সংস্কার জরুরি বলে জানান জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক।

বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে আলোচনা স্থগিত করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। সেপ্টেম্বরে প্রথম দফার এ আলোচনা শুরুর কথা ছিল। বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতির আলোকে আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে বলে জানান ইইউর এক মুখপাত্র।

কোটা সংস্কার আন্দোলন দমাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই সিনেটর। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ওয়াশিংটন থেকে জারি করা বিবৃতিতে মার্কিন সিনেটর বেন কার্ডিন ও কোরি বুকার বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির নিন্দা জানান।

৩১ জুলাই ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি রাষ্ট্রদূতকে জানান, ‘সহিংসতাকারীরা আসলে তার সরকারকে উৎখাতের জন্য শ্রীলঙ্কায় যেমনটি ঘটেছিল, ঠিক সে রকম পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে।’

অন্যদিকে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-এমপি এবং দলটির অনেক প্রভাবশালী ও শীর্ষ নেতাদের দেশ ছাড়ার হিড়িক শুরু হয়। তাদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড, চীন ও দুবাই পাড়ি জমান।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন