নারীর অবদান যেন ইতিহাসে ঠাঁই পায়

নারীর অবদান যেন ইতিহাসে ঠাঁই পায়

দেখতে দেখতে দুই বছর হয়ে গেল। দীর্ঘ সতেরো বছর শেখ হাসিনার একচ্ছত্র ফ্যাসিবাদী শাসন এবং নির্যাতনে যখন দেশের মানুষ অতিষ্ঠ কিন্তু কোনো কার্যকর আন্দোলন গড়ে তোলা যাচ্ছিল না, তখনই তরুণ প্রজন্ম এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। আমাদের সৌভাগ্য আমরা তার সাক্ষী হয়েছি।

দুই হাজার চব্বিশ সালের জুলাই মাসের শুরু থেকেই রাস্তায় ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলন পত্র-পত্রিকা এবং বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছিল। আমরা সে সময় প্রথমে এ আন্দোলন নিয়ে মাথা ঘামাইনি, শুধু পর্যবেক্ষণ করছিলাম তারা কী করে এবং সরকার কী আচরণ করে। “কোটা না মেধা, মেধা, মেধা” স্লোগানটি ঘরে ঘরে শোনা যাচ্ছিল। তবে এটা যেহেতু সরকারি চাকরিতে বৈষম্যকেন্দ্রিক দাবি-দাওয়া ছিল তাই তাদের বাইরে থেকে সংহতি প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না বলেই মনে হয়েছিল। এটা কোটা সংস্কার আন্দোলন নামেই পরিচিত ছিল। কিন্তু ক্রমে দিন যত বাড়ছিল সরকারের দমন পীড়নও ততই কঠোর হচ্ছিল। জুলাইয়ের মাঝামাঝি এসে তা রক্তাক্ত রূপ নিল। এত দ্রুত পরিস্থিতি বদলে যাবে কেউ ধারণা করেনি। যারা সম্পৃক্ত নয় তাদের কারো আর ঘরে বসে থাকা সম্ভব ছিল না। তবে এ আন্দোলন তরুণদের দ্বারা পরিচালিত, এটা পরিষ্কার। তারাই রাজপথ উত্তাল করে রেখেছে। কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতা বা নেত্রীকে সামনের সারিতে দেখা যায়নি। এটাই ছিল আন্দোলনের শক্তি। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার, তার পুলিশও বিস্মিত হয়েছে, কারণ গুলি করেও কাউকে থামানো যাচ্ছে না। এক নেতাকে গ্রেপ্তার করলে অন্যরা এসে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

কোটা ব্যবস্থায় প্রায় ৫৬% নানা ধরনের কোটায় নিয়োগ হচ্ছে আর মেধার ভিত্তিতে থাকছে মাত্র ৪৪%। এই ব্যবস্থায় মূল আপত্তির জায়গা ছিল মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে। কারণ মুক্তিযোদ্ধার কোটাই সবচেয়ে বেশি ছিল। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ যারা করেছে তাদের সন্তানেরা এখন আর সরকারি চাকরির বয়সে নেই, তাই তাদের নাতিদের জন্যও কোটা রাখা হয়েছে, যা প্রায় ৩০%। এটা নিঃসন্দেহে কোটা ব্যবস্থার চরম অপব্যবহার ছিল এবং এর ফলে অনেক মেধাবী প্রার্থী বঞ্চিত হচ্ছিল। তাই এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন যৌক্তিক ছিল। এতে জনগণের সায় ছিল, কারণ মুক্তিযোদ্ধা কোটা মূলত দলীয় নেতাদের সুবিধা দেয়ারই একটা ব্যবস্থা হয়ে উঠেছিল। তবে নারী, প্রতিবন্ধী, আদিবাসী ইত্যাদি কোটাও ছিল। কোটার সংস্কার করে এর মাত্রা ৫৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত তা ৭%-এ নামিয়ে আনা হয়েছিল। অর্থাৎ ৯৩% মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হবে।

কিন্তু ততদিনে আন্দোলন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী চীন সফরের পর অনুষ্ঠিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন পরিস্থিতিকে একেবারে পালটে দেয়। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘কোটা বিষয়ে আমার কিছু করার নেই। ...মামলার পর আদালত যে রায় দেন, এতে নির্বাহী বিভাগের কিছু করার নেই। আদালতেই সমাধান হবে।’ এরই মধ্যে এক সাংবাদিকের অতি উৎসাহী প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা তার পতন ডেকে এনেছিলেন, তিনি রেগে গিয়ে এবং বিদ্রূপ করে বললেন ‘মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?’

শেখ হাসিনার এই কটূক্তির কড়া জবাব দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলসহ পাঁচটি হলের মেয়েরা রাতের অন্ধকারে গেটের তালা ভেঙে রাস্তায় নেমে আসে এবং উত্তাল স্লোগান দিতে থাকে। “তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার। কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার”। মুহূর্তে স্লোগানটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে গেল। এই ঘটনা পুরো আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। যদিও তাদের ওপর ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রলীগ নির্মমভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অনেক ছাত্রী আহত হয়েছে, কিন্তু তারা কেউ দমে যায়নি। টেলিভিশন, ইউটিউবে এগুলো আমরা দেখছি, আশপাশের মানুষের কাছে শুনছি। নানা ঘটনা, পুলিশের নির্যাতনÑএগুলো নিত্যদিনের আলাপ আলোচনা বিষয়।

কিন্তু আসলেই কি ছাত্র-ছাত্রীরা শুধু কোটা সৃষ্ট বৈষম্য নিয়ে বিরক্ত ছিল বলে আন্দোলন করেছিল নাকি শেখ হাসিনার ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে ফেলেছিল বলে তাদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছিল? গুম, খুন, রাহাজানি, দেশ থেকে টাকা পাচার, ব্যাংক লুট এসব শুনেই তো এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। এই আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেছে এবং নেতৃত্ব দিয়েছে তাদের বয়স ১৪ থেকে ২৫ বা সর্বোচ্চ ৩০ হতে পারে। তাদের এই ছোট জীবনের মধ্যে বেশিরভাগ সময় কেটেছে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের কঠিন শাসনের মধ্যে। গণতন্ত্র কী তারা জানে না। স্বাধীনভাবে কী করে কথা বলতে হয়, তারা দেখেনি, বরং দেখেছে মতপ্রকাশের জন্য জেল জুলুম হয়েছে। কেউ কেউ ভোটার হওয়ার বয়সে এসেও ভোট দিতে পারেনি। নতুন ভোটার হওয়ার আনন্দ থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছে। নির্বাচনের তামাশা দেখে দেখে তারা হতাশ হয়েছে। এরই মধ্যে আন্দোলনের কর্মীদের ওপর গুলি সবাইকে আরো মরিয়া করে তোলে। জীবন যায় যাক, তবুও এই ফ্যাসিস্টকে সরাতে হবে।

আমরা যারা নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম তারাও ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত না হলেও আমরা নিজেরাও রাস্তায় নামার কর্মসূচি দিলাম। বিভিন্ন সংগঠন থেকে আসা কর্মীরা একজোট হয়ে নাম দিলাম ক্ষুব্ধ নারী সমাজ। আওয়ামী সমর্থক নারী সংগঠনগুলো চুপ করে থাকল, কোনো সাড়া দিল না। কিন্তু শিক্ষক, শিল্পী, লেখক এবং সামাজিক আন্দোলনের এক্টিভিস্ট যারা ছিলেন তারা রাস্তায় নেমে আসলেন। শিল্পী ফারজানা ওয়াহিদ সায়ানকে গিটার নিয়ে রাস্তায় দেখা গেছে সাহসের সঙ্গে গান গেয়ে প্রতিবাদ জানাতে। ক্ষুব্ধ নারী সমাজের ব্যানারে আমরা বেশ কয়েকটি কর্মসূচি নিলাম। বলা বাহুল্য, শাহবাগে, কিংবা সাত মসজিদ রোডে যেখানেই কোনো সমাবেশ করতে যাই না কেন, পুলিশ না থাকলেও আওয়ামী নেতা-নেত্রী (সন্ত্রাসী কায়দায়) আক্রমণ করত। লাঠিসোটা, ইট ছুড়ে মারত। আমরা খালি হাতে; ব্যানার ও ফেস্টুন ছাড়া হাতে কিছু নেই। তবুও কেউ ভয় পায়নি। বরং এর পরবর্তীতে যে কোনো কর্মসূচিতে আবার গিয়ে হাজির হয়েছি। যাবার আকাঙ্ক্ষা আরো প্রবল হয়েছে। সে সময় প্রায় দিনই বৃষ্টি ছিল, কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছে বলে বড় জোর ছাতা নিয়ে গিয়েছি, কিন্তু না যাওয়ার কথা আমরা কখনো ভাবিনি। একদিন শাহবাগে গিয়ে দেখলাম অল্প বয়সি মেয়েরা, কেউ জিন্স প্যান্টের সঙ্গে জামা পরে আছে, তার পাশেই হিজাব পরা মেয়েটা একসঙ্গে মাটিতে কাগজ রেখে ফেস্টুন লিখছে। একে অপরকে সাহায্য করছে। ছেলেরা এসে তাদের পানি দিয়ে যাচ্ছে, কিংবা অন্য কোনো সহায়তা লাগলে করছে। এই সময় দেখলাম পিজি হাসপাতালের ভেতর থেকে আগুনের ধোঁয়া বের হচ্ছে। একেবারেই কাছে। পুলিশ দৌড়াদৌড়ি করছে। অবাক হয়ে দেখলাম শাহবাগের সামনে বসে যারা মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিল তাদের মধ্যে কোনো নড়চড় নেই। একটি মেয়ে আমাকে দেখে বলল, যদি পুলিশ এখানে আসে ও আক্রমণ করে, তখন আপনি দৌড়াতে পারবেন না। আন্টি, আপনি বরং চলে যান। আমার প্রতি এই সহানুভূতি দেখে বুঝলাম তাদের চোখ সব দিকে আছে। ভালো লাগল।

যেদিন প্রেস ক্লাব থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত মিছিল ছিল সেদিনও যোগ দিয়েছিলাম। সবার সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে একটু পিছিয়ে পড়লেই আবার দু’তিন জন ছেলে-মেয়ে এগিয়ে এসে পানি এগিয়ে দিচ্ছে, না হলে বলছে আপনি একটু সাইডে বসে যান আন্টি। হ্যাঁ, আমরা এখন তাদের আন্টি। কিন্তু তাদের সঙ্গে যখন যুক্ত হয়েছি বয়সের ব্যবধান থাকলেও তারা আমাদের স্বাগত জানিয়েছে।

শহীদ মিনারে প্রায় কর্মসূচি থাকত। একবার বৃষ্টির মধ্যেও শহীদ মিনারের প্রোগ্রামে গেলাম। উপরের বেদি পর্যন্ত গিয়েছিলাম। তিল ধারণের জায়গা ছিল না। স্লোগানের পর স্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত হচ্ছে। শহীদ মিনারের একটি গাছের আগায় বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়াচ্ছে দু’জন ছাত্র। তাদের সবার অভিবাদন জানাচ্ছে। এরই মধ্যে দেখলাম স্কুলের ইউনিফর্ম পরা একঝাঁক মেয়ে। তারাও স্লোগান দিচ্ছে। বললাম তোমরা কেন এসেছ। তারা বলল, এই স্বৈরাচার সরাতে হবে। তারা আমাদের ভাইদের গুলি করে মারছে। মেয়েটির পাশেই ছিলেন মধ্যবয়স্ক একজন ভদ্র লোক। তিনি নিজেই পরিচয় দিলেন, তিনি এই মেয়েটির বাবা। মেয়েকে কোনোভাবে ঘরে ধরে রাখা যাচ্ছে না বলে তিনি সঙ্গে চলে এসেছেন মেয়ের এবং তার সাথীদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য। এগুলো খুব সাধারণ গল্প মনে হয় কিন্তু এরই মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের এক ভিন্ন পরিচয় ও ইতিহাস রচিত হয়ে যায়। এই ঘটনাগুলো একটি দুইটি নয়, শত শত ঘটেছে। এক ভদ্রলোক আমাকে বলেছেন, তিনি দেখলেন তার মেয়ে গোপনে বেরিয়ে যাবার জন্যে একটি ব্যাগে কাপড় গুছিয়ে রেখেছে। তিনি মেয়েকে বললেন, তোমাকে কোথাও যেতে হবে না। আমি তোমার সঙ্গে যাব।

শহীদ মুগ্ধ পানি লাগবে পানি বলে পানি দিতে গিয়ে শহীদ হয়েছে। এরই সঙ্গে অনেক গৃহিণী ছিল যারা রাস্তায় ছেলেমেয়েদের দেখে তারা কি খাচ্ছে, তাদের কত পিপাসা লাগছে এই ভেবে শুকনো খাবার নিয়ে বেরিয়ে যতজনকে পেরেছেন খাইয়ে এসেছেন। একজন মহিলা ভাত রেঁধে নিজের হাতে ছেলেদের খাইয়েছেন এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে।

এরপর দুই বছর কেটে গেছে। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে, শহীদদের নামে জুলাই শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ দেশের ৬৪ জেলায় অভিন্ন স্তম্ভ স্থাপন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল এবং কয়েকটি নির্মাণও করা হয়েছে। অনেক আলোচনা ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছিল। এখন ২০২৬ সাল। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদল হয়েছে। জুলাই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান উদযাপনের বিষয় এখন দলীয় হয়ে গেছে। জুলাই কোনো দলের ছিল না কিন্তু এখন দলগুলো নিজেদের অবদান দাবি করে অনুষ্ঠান করছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জুলাইয়ে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র-ছাত্রীদেরই রাজনৈতিক সংগঠন। তাদের দাবি সবার আগে। কিন্তু এর বাইরেও অনেকে আছে যারা কোনো দলে যায়নি। তাদের তো দেখা যাচ্ছে না।

চব্বিশের জুলাই না হলে এদেশ আরো অন্ধকারে ডুবে যেত। তাই যারা এই আন্দোলন ঘটিয়েছে তাদের স্যালুট জানাচ্ছি। কিন্তু সামনের রাষ্ট্র গঠনের কাজও তাদেরই করতে হবে।

লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন