ফিরে দেখা জুলাই বিপ্লব

ঢাকার আট প্রবেশমুখে বিএনপির অবস্থান, ২০ জুলাই থেকেই প্রস্তুতি

ঢাকার আট প্রবেশমুখে বিএনপির অবস্থান, ২০ জুলাই থেকেই প্রস্তুতি
ছবি: সংগৃহীত

চব্বিশের ৫ আগস্টের সকালে রাজধানীর চারদিক যেন একসঙ্গে খুলে যায়। যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, সায়েদাবাদ, পোস্তগোলা, আব্দুল্লাহপুর, উত্তরা, আশুলিয়া ও গাবতলী —ঢাকার প্রায় প্রতিটি প্রবেশমুখ থেকেই মিছিলের পর মিছিল রাজধানীতে ঢুকতে শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিচ্ছিন্ন মিছিলগুলো মিলিত হয় গণভবনমুখী জনস্রোতে।

বিএনপির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার দাবি, বাইরে থেকে ঘটনাটি আকস্মিক মনে হলেও এর পেছনে ছিল অন্তত দুই সপ্তাহের সাংগঠনিক প্রস্তুতি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠার একপর্যায়ে রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নেয় বিএনপি। ২০ জুলাই থেকে সারা দেশের নেতাকর্মীদের ঢাকার ভেতরে না এনে বরং এর বিভিন্ন প্রবেশপথে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল, কেন্দ্রীয় নির্দেশ পেলেই একযোগে রাজধানীতে প্রবেশ করে আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।

বিজ্ঞাপন

বিএনপির একাধিক কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আন্দোলনের শেষ দুই সপ্তাহে রাজধানীর প্রবেশমুখগুলো কার্যত দলটির সাংগঠনিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ৫ আগস্ট সকালে কারফিউ ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা সত্ত্বেও এসব স্থান থেকেই হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থক মিছিল নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করেন।

১৬ জুলাইর পর বদলে যায় কৌশল

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, ১৬ জুলাই ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির পর আন্দোলনের চরিত্র পাল্টে যায়। বিশেষ করে ১৬ জুলাই আন্দোলনে ছয় ছাত্রের শহীদ হওয়ার প্রতিবাদে ১৭ জুলাই বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিল বের করে ছাত্র-জনতা। সেখানে হামলা হলে তার প্রতিবাদে ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর রাজধানীজুড়ে সংঘর্ষ এবং ২০ জুলাই কারফিউ জারির পর দলীয় কৌশলেও পরিবর্তন আনা হয়।

দলীয় সূত্রের ভাষ্য, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মূল্যায়ন ছিল—আন্দোলন সচল রাখতে প্রতিদিন রাজপথে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু রাজধানীর ভেতরে অবস্থান নিলে ব্যাপক গ্রেপ্তারের ঝুঁকি ছিল। তাই নেতাকর্মীদের ঢাকার ভেতরে না গিয়ে রাজধানীর চারপাশের প্রবেশমুখে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এরপর কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, ভোলা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা ও যশোরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীরা ঢাকার উপকণ্ঠে এসে অবস্থান নেন। আত্মীয়স্বজনের বাসা, মেস, ছাত্রাবাস ও ভাড়া করা কক্ষে তাদের থাকার ব্যবস্থা করে মহানগর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মীদের নির্দিষ্ট প্রবেশমুখে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়।

দলটির নেতাদের দাবি, পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং নির্ধারিত সময়ে একযোগে রাজধানীতে প্রবেশ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিরোধ অকার্যকর করে দেওয়া।

লন্ডন থেকে সমন্বয়

বিএনপি নেতাদের দাবি, পুরো আন্দোলনের রাজনৈতিক সমন্বয় করছিলেন দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডনে অবস্থান করেই তিনি কেন্দ্রীয় নেতা, মহানগর বিএনপি ও আশপাশের জেলার দায়িত্বশীলদের সঙ্গে অনলাইনে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।

দলীয় নেতাদের ভাষ্য, কোথায় কতজন অবস্থান নেবেন, কোন এলাকায় সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে হবে এবং কখন রাজধানীতে প্রবেশ করতে হবে—এসব বিষয়ে ধারাবাহিক নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল।

বিএনপি নেতাদের মতে, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, সায়েদাবাদ, পোস্তগোলা, আব্দুল্লাহপুর ও উত্তরা আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। কারফিউ চলাকালেও এসব এলাকায় একাধিকবার বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। তবু অবস্থান ধরে রাখার কারণেই আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি অটুট ছিল বলে দাবি তাদের।

যাত্রাবাড়ী ছিল অন্যতম হটস্পট

জুলাই বিপ্লবের সময় অন্যতম হটস্পট ছিল যাত্রাবাড়ী এলাকা। এখানে কারফিউ ভেঙে প্রতিদিন সড়ক বন্ধ করে আন্দোলন করা হতো। সেই স্পটে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব আমার দেশকে বলেন, ছাত্র-জনতার ওপর গুলি ও প্রাণহানির ঘটনার পরই দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সরকার পতনকে সময়ের ব্যাপার হিসেবে বিবেচনা করে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ২০ জুলাই থেকে সারা দেশের নেতাকর্মীদের ঢাকার প্রবেশমুখে অবস্থান নিতে বলা হয়।

তার ভাষ্য, রাজধানীর ভেতরে প্রবেশ করলে গ্রেপ্তারের ঝুঁকি ছিল। তাই সবাই প্রবেশমুখেই অবস্থান নেন এবং সেখান থেকেই আন্দোলনের শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়।

রাকিব জানান, ৩ আগস্ট এক দফা ঘোষণার পর সম্ভাব্য ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি সামনে রেখে আশপাশের জেলার নেতাকর্মীদের জরুরিভিত্তিতে ঢাকার প্রবেশমুখে চলে আসতে বলা হয়। কারণ, সরকার রাজধানীতে প্রবেশে বাধা দিতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। ফলে ঢাকার আশপাশের জেলাগুলো থেকে ৩ আগস্ট রাত থেকে নেতাকর্মীরা ঢাকা প্রবেশের প্রস্তুতি নিতে থাকে।

বিএনপির নেতাদের দাবি, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, সায়েদাবাদ ও পোস্তগোলা এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে ভোলা জেলার বাসিন্দাদের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য।

ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, ভোলা থেকে জীবিকার সন্ধানে আসা বহু মানুষ ঢাকার পোস্তখোলা, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী ও শনির আখড়া এলাকায় রিকশাচালক, পরিবহন শ্রমিক, মেকানিক, গ্যারেজকর্মীসহ বিভিন্ন পেশায় কর্মরত ছিলেন। তার দাবি—ছাত্র-জনতার ওপর গুলির ঘটনা দেখে তাদের অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে যোগ দেন এবং স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যুক্ত হন। তাদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণে হতাহতের সংখ্যাও বেড়ে যায়।

উত্তরার প্রস্তুতি

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম ও মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সভাপতি মেহেদী হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, ৩ আগস্ট রাত থেকেই গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীরা আব্দুল্লাহপুর, উত্তরা ও বেড়িবাঁধ এলাকার বিভিন্ন বাসায় অবস্থান নেন।

মেহেদী হাসান বলেন, ৪ আগস্ট রাতেই সিদ্ধান্ত হয়, পরদিন সবাই একই সময়ে রাস্তায় নামবেন। ৫ আগস্ট সকাল ১০টার পর গাজীপুর ও আশুলিয়ার দিক থেকে আসা মিছিল আব্দুল্লাহপুরে পৌঁছালে স্থানীয় নেতাকর্মীরাও যোগ দেন। তার দাবি, প্রথমে ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষের মিছিল পুলিশের ব্যারিকেড অতিক্রম করে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হয়। পরে সাধারণ মানুষ যুক্ত হওয়ায় সেটি বিশাল জনসমাগমে পরিণত হয়।

গণভবনমুখী জনস্রোত

বিএনপি নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট সকাল থেকেই যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, সায়েদাবাদ, পোস্তগোলা, আব্দুল্লাহপুর, উত্তরা, গাবতলীসহ রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে একযোগে মিছিল ঢাকায় প্রবেশ করতে শুরু করে। শুরুতে এসব মিছিলে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা থাকলেও রাজধানীতে প্রবেশের পর সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হতে থাকেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই মিছিলগুলো কয়েক গুণ বড় হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন দিক থেকে গণভবনমুখী জনস্রোতে রূপ নেয়।

বিএনপির নেতাদের দাবি, ৫ আগস্টের এই বিপুল জনসমাগম আকস্মিক ছিল না। বরং ২০ জুলাই থেকে ঢাকার প্রবেশমুখে গড়ে তোলা সাংগঠনিক অবস্থান, বিভিন্ন জেলা থেকে ধাপে ধাপে নেতাকর্মীদের আগমন, কেন্দ্রীয় সমন্বয় এবং নির্ধারিত সময়ে একযোগে রাস্তায় নামার পরিকল্পনার ফলেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাজধানীতে অভূতপূর্ব জনসমাগম সৃষ্টি হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন