হাসিনার পালানোর খবর যেভাবে বিশ্ব জানতে পারে

হাসিনার পালানোর খবর যেভাবে বিশ্ব জানতে পারে
ফাইল ছবি

হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার খবরটি সবার আগে প্রকাশ করা আমার সাংবাদিকতা জীবনের সেরা কাজ হিসেবে মনে করি। খবরটি প্রকাশের মধ্যে বড় ধরনের ঝুঁকি ছিল। কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে সে ঝুঁকি নিতে আমি দ্বিধা করিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে খবর পাচ্ছিলাম যে, শনির আখড়া ও যাত্রাবাড়ী থেকে কয়েক হাজার মানুষের একটি দল গণভবন অভিমুখে রওনা দিয়েছে। আরেকটি জনস্রোত উত্তরার দিক থেকে আসছে। পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। আমার অফিস ছিল কারওয়ান বাজারে। অফিসের বাইরে দেখছি এক ধরনের ভূতুড়ে অবস্থা। পুলিশ নেই, সাধারণ মানুষের চলাচল নেই বললে চলে । গোটা শহরের অবস্থা থমথমে।

বিজ্ঞাপন

দুপুর সাড়ে ১২টার পর আমি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে ফোন দিই । আমার কয়েকজন সোর্স ছিল। আমি যাকে ফোন দিই, তিনি আমাকে জানালেনÑহাসিনা তো একটু আগেই চলে গেছেন। বললাম, চলে গেছেন মানে? উনি বললেন, ফ্লাই করে ভারতে চলে গেছেন। আমি তার এ কথা শোনার পর স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। এর মধ্যে তিনি ফোন রেখে দিলেন।

এরপর বিস্তারিত খবর নেওয়ার জন্য আবার ফোন দিলাম। তখন তিনি বললেন, এসএসএফের সদস্যরা অনেকটা জোর করেই তাকে নিয়ে গেছে। কারণ, তাদের কাছে তথ্য ছিল, উত্তরা থেকে পাঁচ লাখের মতো লোক আসছে আর যাত্রাবাড়ী থেকে আসছে সাড়ে তিন লাখের মতো। এত লোককে কোনোভাবেই ক্র্যাকডাউন করে গণভবনে টিকে থাকা যাবে না। যারা হাসিনাকে নিয়ে বের হয়েছিল, তাদের পরিকল্পনা ছিল হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে। গণভবন থেকে বের হয়ে জাহাঙ্গীর গেটে যাবে, সেখান থেকে ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে একটি রাস্তা আছেÑসেটা দিয়ে এয়ারপোর্টে যাবে।

হাসিনাকে নিয়ে গণভবন থেকে বেরিয়ে তারা যখন বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের কাছে পৌঁছায়, তখন তাদের কাছে খবর আসে এয়ারপোর্টের ভেতরে উত্তরা থেকে আসা জনতার একটি অংশ ঢুকে পড়েছে। কাজেই তাকে সেখানে নেওয়া যাবে না। সিদ্ধান্ত হয় তাকে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দর দিয়ে হেলিকপ্টারে করে দেশ থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হবে।

আমি জানতে পারি, প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার আগে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে চেয়েছিলেন। বিটিভিকে সেভাবে জানানো হয়েছিল। কিন্তু বিটিভির একটি সমস্যা হলো, ভাষণ রেকর্ডের জন্য তাদের সেটআপ করতে এক ঘণ্টা সময় লাগে। প্রধানমন্ত্রীর হাতে সে সময় ছিল না।

হাসিনা পালানোর আগের এ বিষয়গুলো জেনে নিলাম। এরপর দিল্লিতে সাউথ এশিয়ায় এএফপির যিনি দেখাশোনা করেন, সেই পিটার মার্টেলকে জানালাম। তিনি বললেন, একক সোর্সে এ রিপোর্ট যাবে না, স্যরি। তোমাকে হয়তো সত্যি বলেছে ঠিকই কিন্তু পরে দেখা গেল আধা ঘণ্টা পর তিনি আবার ঘুরে গণভবনে চলে এলেন। তাহলে আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা তো প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আমরা খবর দিলাম হাসিনা পালিয়ে গেছেন। আধা ঘণ্টা পর এসে বললেন তিনি পালাননি, তোমরা মিথ্যা নিউজ দিয়েছ। এমন পরিস্থিতি হলে তোমার জেল হবে, আমাদের ব্যুরো বন্ধ হবে। এমনও হতে পারে, কন্সপিরেসি কেসে তোমার যাবজ্জীবনও হয়ে যাবে।

তিনি বললেন, ধরো আমি একটি বড় রেড ব্যানারে দিয়ে দিলাম ‘বাংলাদেশের প্রাইম মিনিস্টার হ্যাজ ফ্লেড দ্য কান্ট্রি’। তার আধা ঘণ্টা পর তিনি হয়তো ফিরে এলেন। কাজেইে একজন সোর্সের ভিত্তিতে আমরা খবরটি দেব না। তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন, দেখ আরো কয়েকজনের কাছ থেকে জানতে পার কি না?

এরপর আমি আরো দুজন সোর্সের সঙ্গে কথা বললাম। তারা বললেন, যা তথ্য আমার কাছে আছে, তা সঠিক। এরপর আমি খবরটি নিশ্চিত করি।

দুপুর ১টার পর এএফপি ব্রেকিং নিউজ প্রচার করে । খবরটি প্রকাশ হওয়ামাত্র আমাদের যারা ক্লায়েন্ট ছিল, তারা দেশ-বিদেশে এএফপিকে কোট করে খবরটি ছাড়তে শুরু করে । ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত আমি খুব ভয়ে ছিলাম। যদি অন্য কিছু হয়ে যায়! দোয়া-কালাম যা মুখস্থ ছিল, সবই পড়েছি। আতঙ্ক কিছুটা কাজ করেছে।

এরপর দুপুর ২টার দিকে বিটিভি থেকে ঘোষণা করা হলো সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। আমি ভারমুক্ত হলাম। আমি বুঝলাম, হাসিনার ১৬ বছরের কালো অধ্যায় শেষ।

লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিব

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন