গুলির শব্দ থেমে গেছে, রাজপথ বদলে গেছে, কিন্তু থামেনি পাঁচটি পরিবারের অপেক্ষা। জুলাই বিপ্লবের রক্তাক্ত দিনগুলোয় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো সাংবাদিকদের স্বজনরা দুই বছর পরও ঘুরছেন বিচারের আশায়। তাদের অভিযোগ, হত্যা মামলার তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই, অনেক আসামি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। কেউ আত্মগোপনে থেকে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন, আবার কেউ সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।
জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী সন্ত্রাসী ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের বাহিনীর গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন পাঁচজন সাংবাদিক। আহত হন আরো তিন শতাধিক সাংবাদিক। শহীদ সাংবাদিকদের পরিবারগুলো জানায়, উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে আছে তারা। কারো সন্তান এখনো বুঝতেই শেখেনি—বাবা নেই; কারো বৃদ্ধা মা শেষ ইচ্ছা নিয়ে বেঁচে আছেন। পরিবারগুলোর একটাই আকুতি, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার, প্রশাসনিক সংস্কার এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রকাশ্যে খুনিদের শাস্তি দেখতে চাই
মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ তৃতীয় বর্ষের ছাত্র শাকিল হোসেন পারভেজ ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে পারভেজ পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করতেন এবং সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
শহীদ সাংবাদিক শাকিল পারভেজের বাবা বেলায়েত হোসেন আমার দেশকে বলেন, আমি চাই যারা আমার সন্তানকে হত্যা করেছে তাদের জনসমক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। আমার ইচ্ছা করে, এই কুলাঙ্গার হাসিনাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রাখা হবে, এরপর আমরা শহীদ পরিবারের সদস্যরা নিজ হাতে ঢিল ছুড়ে তিলে তিলে ওকে শাস্তি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করব।
এপিসির গুলিতে নিহত হাসান
ঢাকা টাইমসের সিনিয়র রিপোর্টার হাসান মেহেদী ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে সংবাদ সংগ্রহের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পুলিশের একটি এপিসি থেকে ছোড়া গুলিতে তিনি শহীদ হন এবং প্রায় ১০ মিনিট সড়কে পড়ে থাকার পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সাড়ে তিন বছর বয়সি ও সাত মাস বয়সি দুই কন্যাসন্তান রেখে যান হাসান মেহেদী, যারা এখনো জানে না তাদের বাবা আর নেই।
হাসান মেহেদীর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম পপি বলেন, দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও তার স্বামীকে গুলি করা হয়। আমি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করেছি। ট্রাইব্যুনাল থেকে আমাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, প্রধান আসামিদের বিচারের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু দুই বছর পার হলেও বিচারের কোনো অগ্রগতি দেখছি না। যারা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে, তারা এখনো স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। আর আমরা প্রতিদিন কষ্টের মধ্যে দিন পার করছি।
তার অভিযোগ, মামলার সাক্ষীদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। তিনি দ্রুত বিচার ও অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
‘দায়ী সবার বিচার চাই’
সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকায় আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। পরদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে তার লাশ শনাক্ত করেন তার সহকর্মী ও বন্ধুরা। স্ত্রী ও শিশুকন্যা এবং মা শামসী আরা জামানকে রেখে যান তিনি।
শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা শামসী আরা জামান আমার দেশকে জানান, শুধু মাঠপর্যায়ের হত্যাকারী নয়, বরং যারা হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন এবং যারা তা বাস্তবায়ন করেছেন—সবার বিচার চান তিনি।
তুরাবের মায়ের শেষ ইচ্ছা
নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরো প্রধান এটিএম তুরাব ১৯ জুলাই সিলেটের কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার দৃশ্য দেখা যায় বলে পরিবারের দাবি। মাত্র তিন মাস আগে বিয়ে করা তুরাবের হানিমুনে যাওয়ার কথা ছিল লন্ডনে; তার আগেই তিনি শহীদ হন। শহীদের পরিবার শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি এখনো।
আসামি ধরে আবার ছেড়ে দিয়েছে
হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে ৫ আগস্ট নিহত হন দৈনিক লোকালয়ের স্টাফ রিপোর্টার সোহেল আখঞ্জি। জুলাই বিপ্লবে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর যখন পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা হামলে পড়েছিল, সে সময় ভিডিও ধারণ করাকালে তিনি হামলার শিকার হন। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন হবিগঞ্জের সাবেক ডিসির সামনেই সাংবাদিক আখঞ্জিসহ দুজনের প্রাণহানি ঘটে।
শহীদ সাংবাদিক সোহেল আখঞ্জির স্ত্রী মৌসুমী আক্তার আমার দেশকে বলেন, মামলার আসামিদের ধরা হলেও পরবর্তী সময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত মামলার কোনো অগ্রগতি নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


