বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা ছিল। একপর্যায়ে এই আন্দোলনকে সরকার পতনের এক দফায় রূপ দিতে ছক কষে তারা। এরই অংশ হিসেবে ৪ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ‘মার্চ টু ঢাকা’ প্রথমে ৬ তারিখে এবং পরে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদের মাধ্যমে ৫ তারিখে এগিয়ে এনে ঘোষণা দেওয়া হয়। তিনি সারা দেশ থেকে ছাত্র-জনতাকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানালেও মূলত তা বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করেছিল জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির।
চব্বিশের সেই আন্দোলনে পেছন থেকে সমন্বয়ে থাকা জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতারা জানান, তারা আগেই গণভবন ঘিরে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ আটটি স্পটে জড়ো হওয়ার জন্য ম্যাপিং করে। বিভাগভিত্তিক আলাদা সমন্বয় টিমও ছিল। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের কঠোর বাধা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা উপেক্ষা করে অনেকে ঢাকায় পৌঁছান এবং ৫ তারিখে নির্ধারিত স্পটগুলোতে কৌশলে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে নির্ধারিত সময়ে কারফিউ ভেঙে মিছিলসহ গণভবনের দিকে এগোতে থাকেন। পরে সেনাবাহিনীর বাধা তুলে নেওয়া এবং ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর তা চূড়ান্ত রূপ পায়।
সূত্রমতে, ৫ তারিখের মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি বাস্তবায়নে ঢাকা ও সারা দেশ নিয়ে আন্দোলন পরিচালনায় একটি কমিটি করে শিবির, যার আহ্বায়ক ছিলেন সংগঠনটির তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম। সদস্যসচিব ছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্র আন্দোলন সম্পাদক আমিরুল ইসলাম।
৫ আগস্ট ঘিরে সেই কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে জাহিদুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ঢাকার অনেক ‘হটস্পট’ ও গণভবন ঘিরে আমরা ম্যাপিং করেছিলাম। কোথায় কে দায়িত্বে থাকবে, তা ঠিক করা হয়েছিল। শিবিরের পাশাপাশি সাবেক শিবির সভাপতিদের কয়েকজনও তাতে যুক্ত ছিলেন। শাহবাগ-সায়েন্সল্যাবসহ বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। কখন কোথায় একযোগে মুভ করা হবে, তা আগে থেকেই ঠিক করা হয় এবং দায়িত্বশীলের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছানো হয়।
কারফিউ ভেঙে রাজপথে নামা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শাহবাগে প্রথম কারফিউ ভাঙা হয়। সেখানে সবাই বিক্ষিপ্তভাবে থাকলেও পূর্বঘোষিত নির্ধারিত সময়ে একযোগে মিছিল শুরু করেন। সে সময় যুবলীগ-ছাত্রলীগ হামলা করে এবং প্রশাসনও গুলি চালায়। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ধাওয়া দিলে যুবলীগ-ছাত্রলীগের হামলাকারীরা পিজি হাসপাতালে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং বিভিন্ন জায়গায় আগুন লাগিয়ে উল্টো ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা করে।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, সায়েন্সল্যাব, উত্তরা, মিরপুর— সব জায়গায় আমাদের একই পলিসি ছিল। নির্ধারিত সময়ে মিছিল নিয়ে একটি টিম স্পটে পৌঁছালে সেখানকার টিমও তার সঙ্গে যোগ দেয়। এভাবেই কারফিউ ভঙ্গ করা হয়।
এই আন্দোলনে আসলে সব দল-মত নির্বিশেষে অংশ নেয় উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, তবে আন্দোলন ও কর্মসূচি নিয়ে অনেকের দ্বিধাবিভক্তি ছিল। সমন্বয়কদের অবস্থাও তার ব্যতিক্রম ছিল না। অনেকে আন্দোলন সামনে টেনে নিয়ে যাওয়ার মতো সাহস হারিয়ে ফেলেছিল। সেই অবস্থায় শিবির ড্রাইভিং ফোর্স হিসেবে সবাইকে নিয়ে সমন্বয় করে।
সূত্রমতে, ৫ আগস্ট ঘিরে ঢাকায় শিবিরের অবস্থানের অন্যতম স্পট তাঁতীবাজারে প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন শিবিরের তৎকালীন কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ। শাহবাগ এলাকার প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ। জামায়াতের সমন্বয়ক ছিলেন সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেন। ধানমন্ডি-২৭ স্পটে প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রকল্যাণ ও ফাউন্ডেশন সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন। মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন কেন্দ্রীয় স্পোর্টস সম্পাদক আসাদুজ্জামান। অন্যতম হটস্পট রামপুরায় প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন কেন্দ্রীয় কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক শফিউল্লাহ। কেন্দ্রীয় আইন সম্পাদক আব্দুল্লাহ নোমানের সমন্বয় করছিলেন সায়েন্স ল্যাব এলাকা। এসব স্পটে জামায়াতের সমন্বয়করাও তাদের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ ও সার্বিক সহযোগিতার বিষয় নিশ্চিত করেন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকাসহ আশপাশের জেলার জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা এসব এলাকায় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন।
সূত্রমতে, জুলাই আন্দোলনের সময় প্রথমে দলের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জুলাই ছাত্র আন্দোলনের বিষয়ে সমন্বয় করেন। এক পর্যায়ে তারা আটক হলে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মা‘ছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, মাওলানা আব্দুল হালিম, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ, মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল ও উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে সরকার সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগ করে। সেদিন মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় তাদের কয়েকজন এমপির নেতৃত্বে শক্ত অবস্থান নেয়। পরে আমরা ছাত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে সেখানে একসঙ্গে নামার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু নামার সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রচণ্ড হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে শহীদ করে দেয়। উত্তরাতেও ওই দিন তারা ব্যাপক হামলা চালায়। এ অবস্থায় ৫ তারিখে মার্চ টু ঢাকা সফলে আমাদের নেতাকর্মীদের কাছে নানা কৌশলে বার্তা পৌঁছানো হয়।
সেদিন কারফিউয়ের মধ্যেও উত্তরা এলাকায় ব্যাপক লোক হওয়া প্রসঙ্গে সেলিম উদ্দিন জানান, উত্তরার উত্তরখান ও দক্ষিণখান এলাকায় অনেকটা গ্রামীণ পরিবেশ। সেজন্য পুলিশের চোখ এগিয়ে নানা কৌশলে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সেখানে আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনদের বাসা-বাড়িতে এসে অবস্থান নিতে সক্ষম হন অনেকে। এলাকার মানুষও নানা কারণে বিক্ষুব্ধ ছিল। যে কারণে ছাত্র-জনতা সেদিন রাজপথে নেমে আসে।
তিনি আরো জানান, ১ আগস্ট জামায়াত নিষিদ্ধ করার পর থেকেই আমরা সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নেমে যাই। ছাত্রদের আন্দোলনে অংশগ্রহণ ছাড়াও তাদের সার্বিক সহযোগিতায় ছিল জামায়াত। আহতদের চিকিৎসার জন্য পরিচিত-অপরিচিত সব হাসপাতালের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি এবং দলমত নির্বিশেষে চিকিৎসা খরচ সরবরাহ করা হয়।
সেলিম উদ্দিন আরো জানান, চব্বিশের ১৭ জুলাই ভোরে জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমান বিদেশ সফর শেষ করে দেশে পৌঁছান। ঢাকার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ওই রাতে মিরপুর ডিওএইচএসে তিনি এক জরুরি বৈঠক আহ্বান করেন। তবে পুলিশ স্থানটি ঘিরে ফেলায় মিটিং স্থগিত করতে হয়। মধ্যরাতে জামায়াত আমির অ্যাম্বুলেন্সে সরাসরি আমার বাসায় আসেন। সেখান থেকে আমরা জামায়াতের এক শীর্ষ দায়িত্বশীলের বাসায় যাই। সেখানে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে ডা. শফিকুর রহমান আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও আবেগঘন বক্তব্য দেন। এছাড়া আন্দোলন পরিচালনা ও ছাত্রদের সহযোগিতা করার জন্য তিনি জামায়াত ও শিবিরের নেতাদের নিয়ে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করে দেন। জামায়াত আমির ওই আন্দোলনের শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে তিনি শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দেন।
তৎকালীন শিবির সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম বলেন, ১৫ জুলাইয়ের পর থেকেই আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়। ১৬ জুলাই ছয়জন নিহত হওয়ার পর সেই প্রস্তুতি আরো জোরদার করা হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব ভাগ করে দিয়ে ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।
তিনি বলেন, ৩ আগস্টই গণভবন অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার চিন্তা থাকলেও বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কায় তা থেকে সরে আসা হয়। ৪ আগস্ট দেশব্যাপী সহিংসতায় ৯৮ জন নিহত হওয়ার পর রাজনৈতিক দল, আন্দোলনের সমন্বয়ক এবং বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আলোচনা করে ৬ আগস্টের পরিবর্তে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়। পরে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদের মাধ্যমে সেই ঘোষণা আসে।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, ৫ তারিখের লংমার্চের ঘোষণাটা ৪ তারিখ বিকালে দেওয়া হয়। তখন ঢাকায় স্বাভাবিকভাবে আসার কোনো সুযোগ ছিল না। এ অবস্থায় কর্মসূচিতে অংশ নিতে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার এড়িয়ে বিকল্প উপায়ে ঢাকায় আসার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। মোটরসাইকেল, সিএনজি, রিকশা কিংবা হেঁটে—যেভাবেই সম্ভব নিরাপদে রাজধানীতে পৌঁছানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি চেকপোস্ট পার হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখারও নির্দেশনা ছিল।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, ৫ আগস্ট সকাল থেকে আমি নিজে উত্তরায় অবস্থান করছিলাম। দুপুরে শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। এর মাঝেই উত্তরা থেকে ছাত্র-জনতার মিছিল এয়ারপোর্ট পর্যন্ত পৌঁছালে সেনাবাহিনী তাদের ছেড়ে দেয়। তবে বিকাল পর্যন্ত উত্তরা, শ্যামলী ও আসাদগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটে। তিনি দাবি করেন, হাসিনার দেশ ত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরও বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষ হতাহত হয়, যা খুব কষ্টদায়ক।
তিনি আরো জানান, আন্দোলনের সময় ঢাকায় শিবিরের মেস, শুভানুধ্যায়ী ও আত্মীয়স্বজনের বাসায় নেতাকর্মীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মহানগর জামায়াতের পক্ষ থেকেও অনেক সহযোগিতা করা হয়। ইন্টারনেট বন্ধ ও কারফিউ চলাকালে এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সমন্বয় ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন




