আবারও ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছে দেশ বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।
বুধবার রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে ১১ দলীয় ঐক্যের আয়োজনে ‘গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে’ আয়োজিত গণসমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশের গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, কারাগারে গেছেন, মামলা মোকাবিলা করেছেন কিংবা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন—তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এসব ত্যাগ কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর জন্য ছিল না। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের সাধারণ মানুষ এই ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
জামায়াত আমির ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানা হত্যাকাণ্ডের কথাও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ৫৭ জন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হারাতে হয়েছে। এরপর জামায়াতে ইসলামীর ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয় এবং মিথ্যা মামলায় দলের ১১ জন শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে।
‘জুলাই আন্দোলন কোনো দলের নেতৃত্বে হয়নি’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে গড়ে ওঠেনি। ছাত্র ও তরুণ সমাজের নেতৃত্বে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এই আন্দোলনের কৃতিত্ব জনগণের। কৃতিত্ব আমাদের তরুণ সমাজের।’
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। মানুষ জীবন দিয়েছে, কারাগারে গেছে, নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে যখন দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তখনই ক্ষমতাসীন সরকার ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
তিনি বলেন, এই আন্দোলনের কোনো একক ‘মাস্টারমাইন্ড’ নেই। কোটি কোটি নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষই এই আন্দোলনের মূল শক্তি।
জুলাই শহীদদের নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন বা কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা কোনো দলের সম্পদ নন, তারা জাতির সম্পদ।’
আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসার দাবি
জামায়াত আমির বলেন, জুলাই আন্দোলনে আহত অনেক মানুষ এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। অনেকের শরীরে গুলি ও স্প্লিন্টার রয়েছে। অনেকে বিদেশে চিকিৎসাধীন আছেন, কেউ কেউ ঘরে পঙ্গুত্ব নিয়ে কষ্ট করছেন।
তিনি বলেন, ‘এখনো ব্যাংককের হাসপাতালে অনেকে পড়ে আছেন। এখনো ঘরে ঘরে পঙ্গু যোদ্ধারা কাতরাচ্ছেন। কিন্তু তাদের দিকে নজর দেওয়ার ফুরসত সরকারের হচ্ছে না।’
তিনি বলেন, যারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন, তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে। শহীদ পরিবারগুলোর সম্মানের সঙ্গে পুনর্বাসন করতে হবে। আহতদের দেশে বা বিদেশে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
‘জুলাই সনদ নিয়ে সরকার প্রতারণা করছে’
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার জাতির সঙ্গে প্রতারণা করছে।
তিনি আরো বলেন, ‘সরকার সংসদে দাঁড়িয়ে বিষয়টি স্বীকার করেছে। এই স্বীকারোক্তির মাধ্যমে তারা জাতির সামনে নিজেদের প্রতারক হিসেবে নিবন্ধিত করেছে।’
তিনি বলেন, জনগণের গণরায় মেনে নিতে হবে। গণভোটে মানুষের দেওয়া সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য পাহারাদারের ভূমিকা পালন করবে। কোনো চাপ বা প্রলোভনে এই দাবি থেকে সরে যাবে না।
‘ফ্যাসিবাদী আচরণ বন্ধ করুন’
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদী আচরণ বন্ধ করতে হবে। জনগণের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করলে জনগণ সহযোগিতা করবে।
তিনি বলেন, অতীতে যারা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তারা যেন একই ধরনের আচরণের পুনরাবৃত্তি না করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার আগের সরকারের অনেক কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি করছে।
শিক্ষাঙ্গন ও দ্রব্যমূল্য নিয়েও অভিযোগ
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, দেশের শিক্ষাঙ্গনে আবারও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরে আসছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
গ্যাসের দাম বাড়ানো নিয়েও তিনি সরকারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, অতীতে দাম বাড়ানোর আগে সংকট তৈরি করা হতো। পরে দাম বাড়ালে মানুষ বেশি সুবিধা পাওয়ার আশায় তা মেনে নিত। এটিকে তিনি প্রতারণামূলক পদ্ধতি বলে মন্তব্য করেন।
‘আরেকটি বিপ্লব আসন্ন’
সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে আরেকটি বিপ্লব আসন্ন।
তিনি বলেন, বিপ্লব কোনো বয়সের বিষয় নয়। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষ অংশ নিয়েছিল।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন চলবে।
তিনি বলেন, কোনো ভয় দেখিয়ে জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন থামানো যাবে না।
‘জাতির মুক্তির জন্য প্রয়োজন হলে ফাঁসির রশিকেও ফুলের মালা হিসেবে গ্রহণ করব’—বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের দুর্ভোগ, সন্ত্রাস, ফ্যাসিবাদ ও অধিকার হরণের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আর কোনো শক্তির কাছে মাথা নত করবে না। একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত, মানবিক, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াই অব্যাহত থাকবে।
সমাবেশে তিনি বলেন, ‘লড়াই কেবল শুরু হয়েছে, শেষ হয়নি।’
তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


