রক্তের ঋণ শোধ হয়নি

রক্তের ঋণ শোধ হয়নি
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব

দুই বছর আগের জুলাইয়ে এ দেশের ছেলেমেয়েরা রাজপথে দাঁড়িয়েছিল খালি হাতে, বুক পেতে দিয়েছিল গুলির সামনে। আবু সাঈদ দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন; মুগ্ধ পানির বোতল হাতে বলছিলেন, ‘পানি লাগবে, পানি?’ সেই জুলাইয়ে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষ খুন হয়েছেন; ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন—কেউ চোখ হারিয়েছেন, কেউ পা, কেউ মেরুদণ্ড। তাদের কেউ শহীদ হওয়ার জন্য বের হননি। তারা বের হয়েছিলেন একটা সহজ এবং প্রায় লাজুক দাবি নিয়ে—এই রাষ্ট্রটা যেন মানুষের হয়; যেন ভোট দেওয়া যায়, কথা বলা যায়, চাকরির পরীক্ষায় মেধার মূল্য থাকে, ব্যাংকের টাকা লুট না হয়, কেউ গুম না হয়।

দ্বিতীয় বার্ষিকীতে এসে তাই প্রশ্নটা এড়ানোর উপায় নেই—‘যে দাবির জন্য এত রক্ত, সেই দাবি কি পূরণ হয়েছে?’ নির্মোহ উত্তরটা হলো, ‘না।’ ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে, কাঠামোর বদল হয়নি। মুখ পাল্টেছে, বন্দোবস্ত পাল্টায়নি। আর ঠিক এখানে দাঁড়িয়েই এই লেখা, শোকগাথা হিসেবে নয়, খতিয়ান হিসেবে; হতাশার দলিল হিসেবে নয়, আগামীর করণীয় রূপরেখা হিসেবে। কারণ শহীদের ঋণ শোধ হয় না অশ্রুতে; শোধ হয় কাঠামো বদলে।

বিজ্ঞাপন

খতিয়ান : বড় আশার বিপরীতে বড় হতাশা কেন

অভ্যুত্থানের পর সংস্কারের যে মহাযজ্ঞের প্রতিশ্রুতি এসেছিল, তার পরিণতি কী দাঁড়িয়েছে, সেই হিসাবটা আগে নেওয়া দরকার। কমিশনের পর কমিশন হয়েছে, সুপারিশের স্তূপ জমেছে, ১৩৩টি অধ্যাদেশ হয়েছে। কিন্তু নির্বাচিত সংসদে ঝরে গেছে ঠিক সেই অধ্যাদেশগুলো, যেগুলো ছিল অভ্যুত্থানের মর্মবস্তু, গুম থেকে সুরক্ষার আইন, মানবাধিকার সুরক্ষার আইন, স্বাধীন উচ্চ আদালত ও স্বাধীন বিচারক নিয়োগের আইন। যেগুলো টিকে গেছে, তার অনেকগুলোর ভেতর থেকেও মৌলিক দাঁতগুলো তুলে ফেলা হয়েছে, নজরদারি নিয়ন্ত্রণসহ বাকি আইনগুলোর মান নামিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন স্তরে, যেখানে সেগুলো আর ক্ষমতাকে জবাবদিহি করতে পারে না।

এটা কি নিছক গাফিলতি? না। সংস্কার মানেই বিদ্যমান বন্দোবস্তে কারো না কারো স্বার্থে আঘাত। যে অধ্যাদেশ গুম বন্ধ করবে—সেটা আটকাবে তারাই, নজরদারি ও বলপ্রয়োগের ক্ষমতা যাদের পুঁজি। যে আইন বিচারক নিয়োগ স্বাধীন করবে—সেটা আটকাবে তারাই, আদালতকে পকেটে রাখা যাদের প্রটেকশন। সংস্কার তাই কেউ ধারণ করে না, সংস্কারে হাত দিলেই চাঁদাবাজ, ব্যবসায়ী, টেন্ডারবাজ, কনসালট্যান্ট-ভেন্ডর চক্র, প্রশাসনের একাংশ, এমনকি সাংবাদিকদের একাংশও শত্রু হয়ে ওঠে। দুর্নীতি থামাতে গিয়ে উল্টো দুর্নীতিবাজের তকমা খেতে হয়। দুই বছরে আমরা এই পাঠটাই হাতে-কলমে পেলাম, সংস্কার ঘোষণায় হয় না, সংস্কার হয় শক্তিগুলোর মধ্যকার সামাজিক সনদের বাস্তবায়নে।

রোগের শিকড় : সংবিধানই যেখানে স্বৈরাচারের কারখানা

জন্মের ৫৪ বছর পরও বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থার মান আন্তর্জাতিক স্তরে উঠল না কেন—এ প্রশ্নের উত্তর ব্যক্তিতে নয়, নকশায়, কাঠামোয়। আমাদের সংবিধান ক্ষমতার এমন বিন্যাস করেছে, যেখানে নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগ—এ তিন বিভাগের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণই এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত। প্রধানমন্ত্রী একাধারে সংসদ নেতা, মন্ত্রিপরিষদের নেতা; রাষ্ট্রপতি তার পরামর্শ ছাড়া কার্যত কিছুই করতে পারেন না, বিচারকসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ তারই ইচ্ছায় হয়। শুরুটা হয়েছিল ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতায়িত করার অভিপ্রায়ে; কিন্তু পরে যিনিই এসেছেন, তিনিই এই কাঠামোয় সেজদা দিয়ে গেছেন। এমন নকশায় প্রধানমন্ত্রীর স্বৈরাচার হয়ে ওঠা ব্যক্তিগত বিচ্যুতি নয়, কাঠামোগত পরিণতি। এই সংবিধান স্বৈরাচার উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে উত্তরাধিকার হিসেবে বহন করে।

পাশের দেশের দিকে তাকালেই পার্থক্যটা ধরা পড়ে। ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হয়ে যে ভিত্তিপর্বটা পার করেছে—কেন্দ্র-রাজ্যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, নির্বাহী-আইনসভা-বিচার বিভাগের কার্যকর পৃথক্‌করণ—আমরা ৭৮ বছর পরেও সেই স্টেশনে পৌঁছাইনি। মৌলিক সংস্কারের দাবি কোনো বিলাসী স্লোগান নয়, এটা রাষ্ট্র গঠনের ‘বেসিক অ্যান্ড ফাউন্ডেশনাল কল’, যে ভিত্তি না গড়ে ওপরে যত তলাই তোলা হোক, ভবন হেলে পড়বেই। গত ৫০ বছরে বারবার হেলে পড়েছে।

তবুও সংবিধানই যথেষ্ট নয় : দরকার রাজনৈতিক বন্দোবস্ত

নিখুঁত সংবিধানও সুশাসনের নিশ্চয়তা নয়; নেপাল, চিলি, থাইল্যান্ডে দেয়নি। কারণ পাওয়ার প্লেয়াররা আইন মানে না। শেখ হাসিনা ও তার লুটতন্ত্র যা যা করেছে—এস আলমের হাতে সাত ব্যাংক তুলে দেওয়া, বন্ড জালিয়াতি, আর্থিক খাতের সীমাহীন লুট—তার কোনোটাই আইন বা সংবিধান অনুমোদন করেনি। আইন ছিল; আইন মানার বাধ্যবাধকতা তৈরি করার শক্তি ছিল না। অতএব কাগজে লেখা সংস্কারের পাশাপাশি লাগবে রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, এলিট পাওয়ার প্লেয়ারদের বর্তমান ‘রুল অব দ্য গেম’ ভেঙে নতুন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক খেলার নিয়ম প্রতিষ্ঠা এবং সেই নিয়ম ভাঙলে আটকে দেওয়ার মতো সংগঠিত শক্তি, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, সজাগ আদালত, আর জেগে থাকা নাগরিক।

সংস্কারের হার্ড পাওয়ার রাজনৈতিক দল, তারা না চাইলে কোনো দেশেই মৌলিক সংস্কার হয় না। সরকারি দল হিসেবে, আকারে বৃহত্তম দল হিসেবে, সেই দায় আজ সবচেয়ে বেশি বিএনপির। জামায়াত, এনসিপিসহ ডান-মধ্য-বাম সবাইকে লাগবে সংস্কার বাস্তবায়নে; কিন্তু চালকের আসনে যে বসে আছে, ব্রেক কষা বা গতি তোলার প্রথম দায় তারই। এক-এগারোর পর থেকে সিভিল প্রশাসনের প্রায় সব স্তরে, প্রতিষ্ঠানে ও প্রকল্পে সামরিক অনুপ্রবেশ ও এজেন্সির প্রভাব যেভাবে বিস্তৃত হয়েছে, তাতে মৌলিক সংস্কারে সামরিক বাহিনীর জোরালো সমর্থনও অপরিহার্য, নইলে যেসব প্রতিষ্ঠান ও মেগা-ব্যয়ে তাদের সংযোগ আছে, সেখানে সংস্কার ঢুকবেই না। সংস্কারের তৃতীয় শক্তি আমলাতন্ত্র, সরকারি দল যদি হয় সংস্কারের চালক, আমলাতন্ত্র তার প্রধান বাস্তবায়নকারী; তারা বেঁকে বসলে সবচেয়ে ভালো নকশাও ফাইলবন্দী হয়ে মরে। আর সিভিল সোসাইটি ও মিডিয়া, সফট পাওয়ার, আপসকামী হলে সংস্কার হয় না; ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে মিডিয়াকে দরকারি সংস্কারের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার পুরোনো খেলাটা, মৌলিক সংস্কারকে ‘ব্ল্যাকআউট’ করার হীনচেষ্টাও আমরা দুই বছরেও কম দেখিনি। রাজনৈতিক দল ও সিভিল সোসাইটি মিলে ক্ষমতার ভারসাম্য, বিকেন্দ্রীকরণ এবং রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠান-রাজনীতি কীভাবে চলবে তার ওপর একটা ‘সামাজিক সনদ’ না হলে স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো ভাঙবে না; কাঠামো না ভাঙলে প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে না, প্রতিষ্ঠান না হলে সুশাসন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান কিছুই হবে না। শৃঙ্খলটা এ রকমই নির্মম।

আগামীর করণীয় ১ : সংবিধান, ভিত্তির তিন কাজ

তাহলে করণীয় কী? প্রথম কাজ সংবিধান সংস্কার, গণভোট-সমর্থিত ধ্রুপদি পথে হোক বা সংবিধান সভার মাধ্যমে। সংসদের মাধ্যমে সংশোধনীর সমস্যা হচ্ছে, পরবর্তী সময়ে যেকোনো দুই-তৃতীয়াংশের মেজরিটির সরকার সেটা সংশোধন করে ফেলতে পারে। তাই সংবিধানের কোনো মৌলিক পরিবর্তনকে টেকসই করার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পথ গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ। এখানে তিনটি অগ্রাধিকার। ১. প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমিয়ে নির্বাহী, আইনসভা ও বিচারবিভাগের প্রকৃত পৃথক্‌করণ, এক ব্যক্তির জীবনে সর্বোচ্চ দুবার প্রধানমন্ত্রিত্ব, ৭০ অনুচ্ছেদের অবসান, দ্বিকক্ষ সংসদ, প্রধানমন্ত্রীকে অভিশংসনের বিধান, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মতো বিকল্পগুলোর গুরুত্ব বিবেচনা, সবই এই ঘরে। ২. সচিবালয়কেন্দ্রিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার, আর কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত আমলাতান্ত্রিক ওভারহেড ছাঁটাই। ৩. বাংলাদেশ ব্যাংক, নির্বাচন কমিশন, আদালত, দুদক, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব সাংবিধানিক ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানকে বাজেট থেকে জনবল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে শতভাগ স্বাধীন করা। যে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর থেকে ভিসি পর্যন্ত সবাই এক টেবিলের অনুগ্রহে নিযুক্ত হন, সে দেশে প্রতিষ্ঠান শব্দটাই প্রহসন, সেখানে সবই তোষামুদে সংগঠন, ইনস্টিটিউশন নয়। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান সমাজের সঙ্গে নেগোশিয়েট করে, গণকমিশনের মাধ্যমে নিজের নেতৃত্ব নিজে বাছবে, এই চর্চাটাই গড়ে তুলতে হবে।

আগামীর করণীয় ২ : ছয় ‘নতুন’, অভ্যুত্থানের ফসল ঘরে তোলার শর্ত

বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থানের সুফল ঘরে তুলতে অন্তত ছয়টি নতুন জিনিস লাগে—নিউ পলিটিক্স, নিউ সিভিল সোসাইটি, নিউ কনস্টিটিউশন, নিউ ইনস্টিটিউশন, নিউ বিজনেস ও নিউ মিডিয়া। এগুলো আলাদা ছয়টি প্রকল্প নয়; পরস্পরের সঙ্গে ব্যাকওয়ার্ড-ফরোয়ার্ড লিংকে বাঁধা একটাই ব্যবস্থা। রাজনীতির আয় ঠিক না হলে, চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি না থামলে রাজস্ব বাড়বে না; রাজস্ব না বাড়লে কল্যাণরাষ্ট্রের বাজেট হবে না। বাংলাদেশের পণ্যের উৎপাদন-ব্যয় প্রতিবেশী সব দেশের চেয়ে বেশি, শ্রম সস্তা হওয়া সত্ত্বেও; কারণ জ্বালানি, ভাড়া আর স্তরে স্তরে চাঁদা। উৎসে এই রক্তক্ষরণ বন্ধ না করে যত ভালো কথাই বলি, দিনশেষে ব্যর্থ হব। ব্যবসায় নতুন রক্ত আনতে হবে, উদ্যোক্তা, এসএমই, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ব্যাংকঋণের জোয়ার এনে নতুন ব্যবসায়ী শ্রেণি তৈরি; আর কালোটাকায় রাজনীতি কেনা ঠেকাতে ব্যবসায়ী ও রাজনীতির সীমানা টানা। মিডিয়ায় লাগবে পেশাদারি, মালিকের মতাদর্শিক দালালি নয়, ডেটা-ড্রিভেন, ফ্যাক্ট-ড্রিভেন সাংবাদিকতা; যে নতুন মিডিয়া মেগা-দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে জন্মায়, সে পুরোনো ব্যাধিরই নতুন উপসর্গ। আমলাতন্ত্রে লাগবে সম্পদের স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল রূপান্তরে ঘুসের উৎস বন্ধ; গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরদারি-ক্ষমতাকে আদালতের তত্ত্বাবধানে আনা। আর রাজনৈতিক দলগুলোকে সংস্কারের অঙ্গীকার নিজ নিজ ইশতেহারে লিখে জবাবদিহিতে বাঁধা পড়তে হবে, ঋণখেলাপি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীদের নির্বাচনের অযোগ্য করার মতো কঠিন নিয়মসহ। কেউ অবৈধ পাওয়ার প্লে করলে অন্যরা যেন আটকে দিতে পারে, আদালত, প্রতিষ্ঠান, আর সংগঠিত নাগরিক শক্তি, এই ভারসাম্যটাই আসল সংস্কার।

আগামীর করণীয় ৩ : শিক্ষা, ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্গঠন

সবচেয়ে গভীর ক্ষতটা কিন্তু ব্যাংকে নয়, ক্লাসরুমে। বিগত জমানা শিক্ষাকে ভেতর থেকে ধ্বংস করেছে, গণ-জিপিএ, গণপাস, খণ্ডিত কারিকুলাম, প্রশ্নফাঁস, দলীয় নিয়োগ-বদলির হাট; শিক্ষার সঙ্গে চিন্তা ও শ্রমদক্ষতার সম্পর্কটাই ছিঁড়ে ফেলে শিক্ষাকে নামিয়েছে কাগুজে সনদে। ব্যাংক লুট থামানো যাবে, বাজেট লুটও থামানো যাবে; কিন্তু শিক্ষার এই ধ্বংসস্তূপ পুনর্গঠন করতে না পারলে আমাদের সর্বনাশ কেউ থামাতে পারবে না। কারণ চিন্তাশীল ও দক্ষ প্রজন্ম ছাড়া বাকি সব সংস্কারের উত্তরাধিকারী কে হবে? করণীয় স্পষ্ট, আগে ব্যাপকতর অডিট ও ইমপ্যাক্ট স্টাডি করে ধ্বংসযজ্ঞ ‘আনডু’ করা; দেয়াল-গেট-রঙের সৌন্দর্য নয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও ক্লাস লেকচারের মানে বিনিয়োগ; আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম ও শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক কোর্স; শিক্ষকদের জন্য আলাদা সম্মানজনক বেতনকাঠামো, সঙ্গে প্রাইভেট-কোচিং বাণিজ্য ও দলীয় লেজুড়বৃত্তির অবসান; এবং পুরো ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর, লার্নিং সফটওয়্যার, শিক্ষক-প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন মডিউল, নিয়োগ-বদলির স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক প্রয়োগের উপযোগী তৈরি, যা একই সঙ্গে ঘুষের চক্র ভাঙবে এবং হাজারো তরুণের কর্মসংস্থান তৈরি করবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভ্যুত্থানের শহীদ শিক্ষার্থীদের স্মরণে সৌধ হোক, শুরু হোক বুয়েটে, আবরার ফাহাদকে দিয়ে, যেন প্রতিদিন ক্লাসে ঢোকার পথে প্রজন্ম মনে রাখে, এই অধিকার কারো দয়ায় আসেনি।

গণঅভ্যুত্থান সফল করতে হলে জুলাইয়ের তরুণদের হাতে হাতে গিগ-ওয়ার্কের বদলে মানসম্পন্ন কর্ম তুলে দিতে হবে, আর উচ্চমান কর্ম তৈরির জন্য দরকার উচ্চমান শিক্ষাদক্ষতার ভিত্তি নির্মাণ এবং চীনের আদলে নতুন ধারার টেকসই দারিদ্র্য বিমোচনের মডেল বাস্তবায়ন। শিক্ষাদক্ষতা ও দারিদ্র্য বিমোচনের বাংলাদেশের চলমান মডেল ব্যর্থ এবং সেকেলে।

হতাশাকে ‘না’, হাল ছাড়াকেও ‘না’ বলা

দুই বছরে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি, এই সত্যটা যেমন লুকানোর নয়, তেমনি এ থেকে ‘কিছুই হবে না’ সিদ্ধান্তে লাফ দেওয়াটাও ইতিহাস-নিরক্ষরতা। মৌলিক সংস্কার কোনো দেশেই ‘ওয়ান ফাইন মর্নিং’ হয়নি, কোনো ব্যক্তিবিশেষের নেকনজরেও হয়নি; হয়েছে দীর্ঘ, ক্লান্তিকর, বারবার পিছু হটা আর ফের এগোনোর যাত্রায়। জিয়াউর রহমান সফল হয়েছিলেন কেন; আবেগে নয়, নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে আর কর্মের পাইপলাইন তৈরি করে—গার্মেন্টসের সূচনা, বিদেশের শ্রমবাজার, খাল খনন, শিল্পে ইভনিং শিফট। অর্থাৎ পথ একটাই—প্রতিষ্ঠান আর কর্ম। অভ্যুত্থানের ছাত্র-জনতার মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান না হলে তারা অফিস নয়, রাস্তাকেই বেছে নেবে; ১৭ বছরের না-মেটা চাওয়া আর কর্মের হাহাকার, দুটো মিললে অভ্যুত্থানও বেহাত হয়।

তাই দ্বিতীয় বার্ষিকীর অঙ্গীকারটা হোক কাজ ভাগ করে নেওয়ার। সরকারি দলের কাছে দাবি, বাদ পড়া মৌলিক অধ্যাদেশগুলো (গুম থেকে সুরক্ষা, মানবাধিকার, স্বাধীন উচ্চ আদালত ও বিচারক নিয়োগ) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনুন, নজরদারি আইনের দাঁত ফেরান, আর সাংবিধানিক সংস্কারের সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ জাতির সামনে রাখুন, ক্ষমতার লোভে লুটেরা গোষ্ঠীর সঙ্গে গোপন সমঝোতার পথে গেলে ইতিহাস ক্ষমা করবে না। বরং বলি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ফেরাতে না পারলে, অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি ফেরাতে না পারলে, ব্যাপক কর্ম তৈরি করতে না পারলে সরকারের হাতে সংস্কার ছাড়া ভিন্ন কোনো টুল থাকবে না। তাই মৌলিক সংস্কারকে পরিত্যাগ করবেন না, কোনো লোকদেখানো সংস্কারও সমাজ গ্রহণ করবে না, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে সমাজের পলিটিক্যাল ম্যাচিউরিটি অনেক উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই ম্যাচিউরিটিকে সম্মান করুন। বিরোধী দলগুলোর কাছে দাবি, সংস্কারকে দলীয় স্কোরবোর্ডে রাখার পাশাপাশি সরকারের ওপর যৌক্তিকভাবে ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করুন। তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুরোধ, লোভ ও তদবিরের ঊর্ধ্বে উঠে জ্ঞানভিত্তিক প্রেশার গ্রুপ হয়ে উঠুন। হতাশা এখন আমাদের বিলাসিতা, বরং সংস্কারকে পাহারা দেওয়াই নিত্য কর্তব্য। আর নিজেদের কাছে, আমরা যারা লিখি, পড়াই, বিশ্লেষণ করি, তাদের প্রতিশ্রুতি হোক—আমরা ক্ষমতার সামনে সত্যটাই বলে যাব, যত অস্বস্তিকরই হোক।

১ হাজার ৪০০ কবরের ওপর দাঁড়িয়ে এই রাষ্ট্র আজ যে প্রশ্নটার মুখোমুখি, সেটা আসলে আমাদের প্রত্যেকের প্রশ্ন—আবু সাঈদের প্রসারিত দুহাত আমরা কী দিয়ে ভরাব? ক্ষমতার পুরোনো পাটিগণিত দিয়ে, নাকি নতুন বন্দোবস্ত দিয়ে? জুলাই কোনো স্মৃতি নয়, জুলাই একটা অসমাপ্ত সমাজ সংস্কারের দায়। সেই দায় শোধ করার দায় শহীদদের নয়, আমাদের, যারা বেঁচে আছি। রক্তের ঋণ কড়ায়-গণ্ডায় শোধ হোক সংবিধানে, সংসদে, শাসনে, বিচারে, প্রতিষ্ঠানে, আইনে, ক্লাসরুমে, কর্মে—এটুকুই দ্বিতীয় বার্ষিকীর প্রার্থনা, এটুকুই প্রতিজ্ঞা আমাদের।

লেখক : সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী; প্রযুক্তি ও নীতি বিশ্লেষক, টেকসই উন্নয়ন-বিষয়ক লেখক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন