চব্বিশের ৫ আগস্ট সাভার-আশুলিয়ায় পুলিশ ও ফ্যাসিবাদী সরকারের সন্ত্রাসীদের দ্বারা ঘটেছিল এক ট্র্যাজিক ঘটনা। আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণে শহীদ করা হয় অনেককে। হত্যাকাণ্ডের পর আশুলিয়া থানার সামনে ছয় শহীদকে পুড়িয়ে মারে পুলিশ নামের হায়েনারা। এ মর্মান্তিক ঘটনা সেদিন বিশ্ববাসীকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
সেদিন জুলাই বিপ্লব বিজয়ের পূর্বমুহূর্তে ও বিজয় মিছিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী ক্যাডারদের গুলিতে সাভার-আশুলিয়ায় ৩১ জন শহীদ হন। এ ঘটনায় আহত হন দুই শতাধিক মানুষ। ঘটনার পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচারের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি লংমার্চ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ধরে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করে। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যোগ দেন। মিছিলটি সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছালে তখনকার ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফির নেতৃত্বে মিছিলটিকে গুলি ছুড়ে বাধা দেওয়া হয়। এক পর্যায়ে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে বেশ কয়েকজন ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। তাদের মধ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাইউম ও কলেজছাত্রী নাফিসা হোসাইন মারওয়া অন্যতম।
আন্দোলনে অংশ গ্রহণকারীগণ সাময়িকভাবে ছত্রভঙ্গ হলেও পরবর্তী সময়ে তারা পাকিজা মোড় (বর্তমানে শহীদ ইয়ামিন চত্বর) ও সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আবারো সংগঠিত হন। ততক্ষণে ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার খবর চাউর হয়। ফলে আন্দোলনকারীরা দৃঢ় মনোবল নিয়ে পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের মিলিত গুলিবর্ষণ এবং হতাহতের প্রতিবাদ জানাতে সাভার থানার দিকে অগ্রসর হন। দুপুরের পর পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ছাত্র-জনতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মুখোমুখি অবস্থান নেয়। বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মুক্তির মোড় ও থানার মোড়ে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে অন্তত ১৫-১৬ জন নিহত হন। শত শত রাউন্ড গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয় শিল্পশহর সাভার।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এক পর্যায়ে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করলেও জনগণের আক্রমণ এবং উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে অসংখ্য গুলি ছুড়তে ছুড়তে তারা সাভার ক্যান্টনমেন্ট অভিমুখে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যায়।
এদিন যারা শহীদ হয়েছেন তাদের মধ্যে রমজান, মোজাহিদ, নাফিসা, তৌহিদুর রহমান, সাফোয়ান, রাসেল, রফিক, নিসান খান, মুন্না, সজিব, রানা, আলামিন, সাজ্জাদ, লালমিয়া ও আবদুল কাউয়ুম, শ্রাবণ গাজী অন্যতম।
আশুলিয়ার স্থানীয় বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এদিন আশুলিয়ায় অন্তত ১০-১১ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে জাহিদুর রহমান, স্বপন প্রামাণিক অন্যতম। আশুলিয়া থানার সামনের মহাসড়কে সেতুতে পথচারী দুই ব্যক্তির লাশ পা বেঁধে উল্টো করে ঝুলানো ছিল। সকালে লাশ দুটি নিচে নামানো হয়। তাদের দুজনের মুখ থেঁতলানো ছিল। লাশ দুটি ছিল পুলিশ সদস্যদের।
সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আশুলিয়ার একাধিক চিকিৎসা কেন্দ্রের তথ্য মিলিয়ে এদিন ৩১ জন শহীদ হওয়ার তালিকা পাওয়া যায় । এছাড়া গুরতর আহত ছিলেন শতাধিক ছাত্রজনতা।
ছয় জনের মৃত্যুদণ্ডের রায়
ইতোমধ্যে জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সাবেক এমপি সাইফুলসহ ছয় জনের মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে স্বাক্ষরের পর এ রায় প্রকাশ করা হয়।
রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এফ এম সায়েদ, সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল মালেক, সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) বিশ্বজিৎ সাহা, সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার এবং যুবলীগের কর্মী রনি ভূঁইয়া।
এ মামলায় আরো সাত আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন— ঢাকা রেঞ্জের সাবেক উপমহাপরিদর্শক সৈয়দ নুরুল ইসলাম, ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান রিপন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শহিদুল ইসলাম, সাবেক পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, সাবেক পরিদর্শক নির্মল কুমার দাস এবং ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সাবেক পরিদর্শক আরাফাত হোসেন। এছাড়া আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক আরাফাত উদ্দীন ও কামরুল হাসানকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করা হয়েছে। তিনি এ মামলায় অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
এর আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি মামলাটির সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। এ মামলায় মোট ১৬ জন আসামি। তাদের মধ্যে আটজন গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন এবং বাকি আটজন পলাতক রয়েছেন।কারাগারে থাকা আট জন হলেন—আবদুল্লাহিল কাফী (যাবজ্জীবন), শাহিদুল ইসলাম (যাবজ্জীবন), আরাফাত হোসেন (যাবজ্জীবন), আবদুল মালেক (মৃত্যুদণ্ড), আরাফাত উদ্দীন (সাত বছরের কারাদণ্ড), কামরুল হাসান (সাত বছরের কারাদণ্ড), শেখ আবজালুল হক (ক্ষমা) ও মুকুল চোকদার (মৃত্যুদণ্ড)।
পলাতকে আট আসামি হলেন—সাইফুল ইসলাম (মৃত্যুদণ্ড), সৈয়দ নুরুল ইসলাম (যাবজ্জীবন), আসাদুজ্জামান রিপন (যাবজ্জীবন), এ এফ এম সায়েদ (মৃত্যুদণ্ড), মাসুদুর রহমান (যাবজ্জীবন), নির্মল কুমার দাস (যাবজ্জীবন), বিশ্বজিৎ সাহা (মৃত্যুদণ্ড) ও যুবলীগ ক্যাডার রনি ভূঁইয়া (মৃত্যুদণ্ড)।
হাসিনার ফাঁসি দ্রুত কার্যকর করুন
পুলিশ ভ্যানে স্তূপ করে ছয় ছাত্রকে পুড়িয়ে হত্যার শিকারদের অন্যতম সাজ্জাদ হোসেন সজল। শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় গ্রামের বাড়িতে বসে জানতে পেরেছেন সজলের মা শাহীনা বেগম। মুঠোফোনে তার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিনিধির।
শাহীনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, রায় শুনে কী হবে? মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ফাঁসি অতিদ্রুত কার্যকর চাচ্ছি। জনসম্মুখে যেভাবে আমার সন্তানকে গুলি করে হত্যার পর পুড়িয়ে মেরেছে তেমনিভাবে হাসিনাকে প্রকাশ্য গুলি করে পুড়িয়ে মারা হোক। আমার ছেলেকে গুলি করার পর ছটফট করেছে। সে পানি খেতে চেয়েছিল। পরে নিস্তেজ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরো বলেন, সে সময়ের পুলিশ প্রধান ছিলেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। সে রাজসাক্ষী হয়েছে তাতে কী হয়েছে? বাহিনী প্রধানকে মাত্র পাঁচ বছর সাজা দেওয়া হয়েছে। এতো কম সাজার রায় আমি কিছুতেই মানতে পারছি না।
সাভারে সিটি ইউনিভার্সিটিতে বিএসসি পড়তেন সজল। ২০০৫ সালের ১২ এপ্রিল জন্ম । সজলের বয়স হয়েছিল মাত্র ২০ বছর। তার মা শাহীনা বেগম আশুলিয়ায় নারী ও শিশু হাসপাতালে ক্লিনার পদে চাকরি করে কোনোমতে ছেলের লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতেন। আশা ছিল ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে। গাঁয়ের মানুষ তাকে ইঞ্জিনিয়ারের মা বলে ডাকবে। কিন্তু সব আশা চুরমার হয়ে গেছে।
শাহীনা বেগম বলেন, আমি আমার এতিম নাতিন ও বৌমার দিকে তাকাতেই চোখে পানি এসে যায়। তাদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় আমি সবসময় চিন্তিত। তাই কিছুটা হলেও শান্তি পাব, ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে এনে এবং অন্যান্য দণ্ডিতদের রায় যদি দ্রুত কার্যকর হয়।
এছাড়া জুলাই আন্দোলনের অন্যান্য শহীদদের পরিবার ও আন্দোলনকারীরা একই দাবি জানিয়েছেন সরকারের প্রতি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা এবং প্রতিটি হত্যাকাণ্ডে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



