‘পাঠাও’ এবং আমার যাত্রার শুরুটা আলাদা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুটি পথ এক হয়ে গেছে। উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের একটি বড় সময় আমি যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছি। সেখানে কাজ করতে করতেই মনে হতো একদিন দেশে ফিরব এবং নিজের দেশের জন্য এমন কিছু করবÑযা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনবে। সে স্বপ্ন নিয়েই দেশে ফিরে বিনিয়োগ খাতে কাজ শুরু করি। সেখান থেকেই পরিচয় হয় পাঠাও-এর প্রতিষ্ঠাতাদের সঙ্গে। তাদের মধ্যে আমি দেখেছিলাম একদল তরুণ, যারা প্রযুক্তি দিয়ে নিজেদের এবং মানুষের প্রতিদিনের সমস্যার সমাধান করতে চায়। সে বিশ্বাসই আমাকে পাঠাওয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে অনুপ্রাণিত করে।
আমাদের কাছে ব্যবসা মানে শুধু লাভ-লসের অঙ্ক নয়; বরং মানুষের জন্য সুযোগ তৈরি করা। লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তার বিকাশের মধ্য দিয়ে আমার এই বিশ্বাস আরো সুদৃঢ় হয়েছে যে, প্রকৃত পরিবর্তন আসে মানুষকে সক্ষম করে তোলার মাধ্যমে।
এ বিশ্বাস থেকেই ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় আমি নিজেকে নিরপেক্ষ দর্শক হিসেবে ধরে রাখতে পারিনি। আমার কাছে এই আন্দোলন শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল মেধার মূল্যায়ন, সুবিচার, সম্মান ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবিতে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জেগে ওঠা। দীর্ঘদিন ধরে আমি দেখেছি, আমাদের অনেক মেধাবী তরুণ দেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না। তারা সুযোগের অভাবে নয়, ন্যায়সংগত মূল্যায়নের অভাবে দেশ ছাড়ার স্বপ্ন দেখে। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে, যার প্রতিদিনের কাজই মেধাবী তরুণদের সঙ্গে, এই বাস্তবতা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
১৬ জুলাই আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার দৃশ্য অন্য সবার মতো আমিও দেখেছি সামজিক মাধ্যমে। সে মুহূর্তেই আমার মনে হয়েছিল, এটি আর কেবল কোটা সংস্কারের আন্দোলন নয়। এরপর ১৭ ও ১৮ জুলাই যখন একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেল, শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতা নেমে এলো, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হলো, আর রাষ্ট্রীয় বয়ানের সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান ক্রমশ বাড়তে লাগল; তখন বুঝলাম আমরা একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। দেশের ভেতরে মানুষ সত্য জানতে পারছিল না, আর দেশের বাইরেও নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে উঠছিল।
এ সময় কয়েকজন সাংবাদিকের মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ সৃষ্টি হয়। আব্দুল হান্নান মাসউদ, আব্দুল কাদেরসহ কয়েকজন সমন্বয়ক তখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছিলেন। ২৯ জুলাই আবদুল হান্নান মাসুদ, আব্দুল কাদের ও মাহিন সরকারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে আমার স্ত্রী ও আমি তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করি। আমার স্ত্রী, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, তিনি নিজেই তাদের আমাদের বাসায় নিয়ে আসেন। দুদিন ধরে সেখান থেকেই তারা পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন, যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং আন্দোলনের বার্তা সমন্বয় করেন। সে দিনগুলো আমাদের পরিবারের জন্যও সহজ ছিল না। তবু আমাদের বিশ্বাস ছিল, শত ঝুঁকি থাকলেও সে সময় নীরব থাকা বিবেকের কাছে দায় এড়ানোর নামান্তর।
একই সময় সাংবাদিক বন্ধুদের সঙ্গে সমন্বয় করে আন্দোলনের নির্ভরযোগ্য তথ্য দেশ-বিদেশে আদান-প্রদানে সহায়তার চেষ্টা করেছি। যতটুকু পেরেছি, একজন নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত ছিলাম। ২ আগস্ট আন্দোলন যখন ‘এক দফা’ দাবির দিকে এগিয়ে যায়, তখন সে ঘোষণার বাংলা ও ইংরেজি ভাষা প্রস্তুত করার কাজেও সম্পৃক্ত ছিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, এমন একটি মুহূর্তে মানুষের দাবিকে স্পষ্ট ও দায়িত্বশীলভাবে তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩ ও ৪ আগস্ট আমি তখন রাজপথে। ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, প্রগতি সরণি, শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন স্থানে আমি মানুষের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ প্রত্যক্ষ করেছি। সেখানে আমি দেখেছি, রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে একটি অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা, একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পেশাজীবী সবাই যেন একই স্বপ্নে একত্রিত হয়েছিলেন।
৫ আগস্টের সকালটাও শুরু হয়েছিল অনিশ্চয়তা দিয়ে। আমরা গুলশান-বনানী এলাকা থেকে গণভবনের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঠিক সে সময় খবর এলো, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সামনে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর গুলি চলছে। আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা চলছিল, চারদিকে ছিল উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। এর কিছুক্ষণ পর বিভিন্ন দিক থেকে হাজার হাজার মানুষের মিছিল এগিয়ে আসতে থাকে। আমরা মহাখালী রেলগেটের কাছে পৌঁছাই। দুপুরের কিছু পরে একজন সাংবাদিক বন্ধু ফোন করে শুধু একটি বাক্য বললেন, ‘সি হ্যাজ লেফট গণভবন’। সে মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, আমরা কেবল একটি সরকারের পতনের সাক্ষী নই; আমরা একটি নতুন সম্ভাবনার সূচনারও সাক্ষী।
সে দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকালে আমার সবচেয়ে বড় উপলব্ধি একটাইÑএকটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণরা। আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, কীভাবে সাহস, সংগঠন এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যতের স্বপ্ন মানুষকে একত্রিত করতে পারে। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমি সব সময় বিশ্বাস করি, মানুষের ভেতরের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো আস্থা ও সুযোগ। জুলাইয়ের সেই দিনগুলো আমাকে এ সত্যটিকে আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে।
লেখক : সিইও, পাঠাও
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

