সাগর হাওলাদার (১৭) সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা ও বোনের লেখাপড়া খরচ জোগাতে কাজের জন্য ঢাকায় যায়। সে ধানমন্ডি-৩২-এর লেকপাড়ে একটি চায়ের দোকানে কাজ নেয়। স্বপ্ন ছিল টাকা জমিয়ে বিদেশে গিয়ে দরিদ্র পরিবারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার। জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেয় সাগর। গত বছরের ১৯ জুলাই আবাহনী মাঠের কর্নারে পুলিশ বক্সের কাছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল। এ সময় পুলিশের গুলিতে দুপায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয় সাগর। তাকে স্থানীয়রা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করে। সাগর হাওলাদার চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৪ জুলাই শহীদ হন। সাগরের স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। প্রতিটি মুহূর্তে ছেলের কথা মনে হয় মায়ের। কে জানত চায়ের দোকানে কাজ করা সেই ছেলেটি আন্দোলনে গিয়ে আর কোনোদিন ঘরে ফিবে আসবে না। শহীদ সাগর হাওলাদার বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের বাগধা গ্রামের নুরুল হক হাওলাদারের ছেলে।
শহীদ সাগর এখন শহীদের তালিকায়। একটি রক্তাক্ত আন্দোলনের গল্প হয়ে আছে মানুষের স্মৃতিতে। শহীদ সাগরের শোকে মা আম্বিয়া বেগম ছেলের স্মৃতি মনে করে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লেও ঘুম ভেঙে গেলে গভীর রাতে ছেলের ছবি নিয়ে ছুটে যায় কবরের কাছে। তার কান্নায় এখনো আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে। মা যেন শোকের অতলে ডুবে গেছেন। ছেলের স্মৃতিতে কবরের পাশে বসে অঝোরে কাঁদছেন তিনি। প্রতিদিন ছেলের কবরের পাশে গিয়ে বসে থাকেন। সেখানেই যেন খুঁজে ফেরেন হারিয়ে যাওয়া বুকের মানিক সাগরকে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পিতা নুরুল হক হাওলাদারও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। পিতা নুরুল হক ছেলের শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। কিছুতেই তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছে না।
সাগরের বাড়িতে কেউ গেলে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কান্না করতে থাকেন। তাদের পরিবারে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার কোনো আনন্দ ছিল না। ছিল শুধুই কান্না। তাকে ঘরে খুঁজে না পেলেও ছেলের কবরের কাছে গিয়ে কাঁদতে দেখতে পায়। ছেলে হারানোর এক বছর হলেও শোকে কাতর হয়ে আছেন তার বাবা নুরুল হক ও মা আম্বিয়া বেগম। সাগরের একমাত্র ছোট বোন সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী মরিয়ম খানম ভাইয়ের কথা মনে করে বাড়ির এককোনে একা-একা চুপচাপ বসে থাকে, কারো সঙ্গেই কথা বলে না। কেউ ডাকলেও সাড়া দেয় না। নিঃশব্দে দিন কাটছে তার। শহীদ সাগরের চাচা মইনুল হোসেন জানান, ২০২৪ সালের মে মাসে সাগর ঢাকায় গিয়েছিল, ওর স্বপ্ন ছিল বিদেশ গিয়ে বেশি টাকা আয় করে বাড়িতে পাকা ভবন তৈরি করবে। ওই ভবনে সবার জন্য আলাদা কক্ষ থাকবে ও বোনের লেখাপড়াসহ মায়ের জন্য কাজের লোক রেখে দেবে। সাগরের স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। আমাদের সাগরকে আর কেউ এনে দিতে পারবে না। যারা আমার ভাতিজাকে গুলি করে হত্যা করেছে আমি তাদের ফাঁসি চাই। সাগর নিহতের এক বছর হয়ে গেলেও আমাদের পরিবারের কারোরই কান্না থামছে না।
বাড়িতে শহীদ সাগরের বৃদ্ধ দাদা আব্দুল মজিদ হাওলাদার (৭৫) বাড়ির উঠানে বসে বাকরুদ্ধ হয়ে নীরবে চোখের পানি ঝরছে। কান্নার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছে, সে কাত্তে পারছে না। একমাত্র নাতি সাগরকে হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ায় আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

