৫ আগস্ট : সেনা ভবন-বঙ্গভবনে যা হয়েছিল

৫ আগস্ট : সেনা ভবন-বঙ্গভবনে যা হয়েছিল
ফাইল ছবি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। বেলা দেড়টার দিকে হাসিনার পালানোর খবর বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী পরিণত হয় মিছিলের নগরীতে। সব মিছিলের গন্তব্য যেন গণভবন। মগবাজার থেকে একটি মিছিলের সঙ্গে রওনা হই গণভবনের দিকে। এ সময় একটি রাজনৈতিক দলের প্রধানের ঘনিষ্ঠ সহযোগীর ফোন। জানতে চাইলাম, আপনি কোথায়? তিনি জানালেন, দলের প্রধানকে নিয়ে তিনি ক্যান্টনমেন্টে। সেনাপ্রধান ব্রিফ করবেন। সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, কয়েকজনের নাম বলুন, এখানে অনেকের নাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এলোমোলোভাবে কিছু নাম বললাম।

মগবাজার থেকে বাংলামোটরের দিকে না গিয়ে ভাবলাম সাত রাস্তা হয়ে বিজয় সরণি হয়ে যাব গণভবনের দিকে। কিন্তু ফ্লাইওভারের ওপর হাজারো মানুষ। ফলে মহাখালী হয়ে রাওয়া ক্লাবের সামনে দিয়ে এগোনোর চেষ্টা করছি। কিন্তু লাখো মানুষের ভিড়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে এলাম। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গেটে উঠে মানুষ উল্লাস করছে। ভিড় ঠেলে ভেতের ঢোকা অসম্ভব মনে হলো। ধীরে ধীরে বিজয় সরণির সামনে এসে দেখি শেখ মুজিবের মূর্তিতে রশি লাগিয়ে মানুষ ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে বিকাল হয়ে গেছে। দেখলাম জাহাঙ্গীর গেট দিয়ে একটি মিনিবাস ও কয়েকটি সেনাবাহিনীর জিপ আসছে। আবার ফোন করলাম সেই রাজনৈতিক দলের সহযোগীকে। জানতে চাইলাম মিটিংয়ে কী হলো? বললেন, বঙ্গভবনে যাচ্ছি; এখন বিজয় সরণির সামনে। আমিও তখন বিজয় সরণির সামনে। বললাম, একটি মিনিবাস যাচ্ছে সেনা পাহারায়। তিনি জানালেন, সেই বাসে তিনি আছেন। জেনে নিলাম আর কে আছে সেই বাসে। তিনি জানালেন নেতাদের নাম। এরপর সেখানে উপস্থিত রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলতে জানতে পারি সেনাভবন ও বঙ্গভবনের সেদিনের চিত্র বিষয়ে।

বিজ্ঞাপন

সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান হাসিনার পলায়নের আগের রাতেই রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। সেনাপ্রধান বিএনপি নেতা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরের মাধ্যমে বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। তিনি পরে আমাকে জানান, ৪ আগস্ট রাতে তাকে জানানো হয়, সেনাপ্রধান পরদিন ৫ আগস্ট সকালে তার সঙ্গে কথা বলতে চান। মিটিংটি হবে ওয়ান টু ওয়ান। এরপর তিনি সকাল ১০টায় সেনাভবনে উপস্থিত হন। সেনাপ্রধান তার সঙ্গে আলোচনায় তিনটি বিষয়ে কথা বলেন।

সেনাপ্রধান তাকে বলেন, ১. আমরা কোনো ধরনের রক্তপাতের অংশীদার হব না। ২. আমি কোনো ক্ষমতা চাই না। ৩. দেশের পরিস্থিতি নিয়ে দ্রুত সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কথা বলে সমস্যার ইতি টানতে চাই।

তখন মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর জানতে চান, ‘স্টেকহোল্ডার বলতে কাদের বোঝাচ্ছেন?’ জবাবে সেনাপ্রধান বলেন, ‘দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কথা তিনি বোঝাচ্ছেন।’ সেনাপ্রধান অনুরোধ করেন, ‘জেনারেল আকবর যেন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের এই দায়িত্বটি নেন। যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে তিনি তাদের সঙ্গে বসতে চান; তা দ্রুত করতে হবে।’

ফজলে এলাহী আকবরের সঙ্গে মিটিংয়ের সময় ১০টা ২৫ মিনিটে সেনাপ্রধান তাকে জানান, ‘ইনডিয়ার সেনাপ্রধান সাড়ে ১০টার দিকে তাকে ফোন করবেন।’ তাৎক্ষণিকভাবে মেজর জেনারেল আকবর চলে আসার জন্য উঠে দাঁড়ান। এ সময় সেনাপ্রধান বলেন, ‘আপনি ইচ্ছা করলে থাকতে পারেন। আপনি শুনতে পারেন, আমি তাকে কী বলি।’ মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর বলেন, ‘আমাকে বিশ্বাস করার জন্য ধন্যবাদ। তবে বিষয়টি না শোনা আমাদের জন্য ভালো হবে।’ এরপর তিনি দ্রুত সেখান থেকে বের হয়ে যান।

এরপর মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ও নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাকে জানানো হয়, দুপুরে সেনাপ্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন।

মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর বেলা দেড়টায় আবার সেনাভবনে আসেন। সে সময় তিনি আরো কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাকে সেখানে দেখতে পান, যাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক মেজর জেনারেল হামিদ যোগাযোগ করেছেন। বেলা ২টার দিকে সেনাপ্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের জানান, প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগ করেছেন। আমরা এখন একটি ইনটারিম গভর্নমেন্ট করব। তিনি এ সময় রাজনৈতিক দলের নেতাদের সহযোগিতা চান। এতে সবাই সম্মতি দেন।

বেলা ২টার কিছু আগে সেনাসদরে পৌঁছান জিএম কাদের ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। এরপর পৌঁছান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তারা পৌঁছার কিছুক্ষণের মধ্যে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান সেনাভবনে যান। এরপর আসেন জোনায়েদ সাকি, ফিরোজ আহমদ ও অধ্যাপক আসিফ নজরুল। এছাড়া জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আজাদ, মাওলানা মামুনুল হক ও মুফতি ফয়জুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় রাজনৈতিক দলের নেতারা সেনাপ্রধানের অফিসের বাইরে অতিথি কক্ষে অবস্থান করেন। সে সময় পরবর্তী সরকারে কারা আসতে পারে, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কেউ কেউ আলোচনা করেন। উপস্থিত একজন অধ্যাপক আসিফ নজরুলের কাছে জানতে চান, ‘অন্তর্বর্তী সরকারে কারা আসবেন, সে ব্যাপারে কোনো হোমওয়ার্ক আছে কী না।’ জবাবে আসিফ নজরুল জানান, ‘কদিন ধরে পালিয়ে থাকতে হচ্ছে, এসব চিন্তা করার সময় কোথায়!’

সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক শুরু হলে রাজনৈতিক দলের নেতারা সবাই পরামর্শ দেন, তিনি যেন জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেন এবং জানান, শিগগির একটি বেসামরিক সরকার গঠন করা হবে। সেনাপ্রধান এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানকে দেশবাসীকে শান্ত থাকতে টেলিভিশনে কথা বলার জন্য অনুরোধ জানান। এ সময় তারা বলেন, ক্যান্টনমেন্ট থেকে তাদের কথা বলা ঠিক হবে না। বাইরে গিয়ে বলবেন।

এরপর সেনাপ্রধান রাজনৈতিক নেতাদের তার সঙ্গে বঙ্গভবনে যাওয়ার অনুরোধ করেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথমে বঙ্গভবনে যেতে রাজি হননি। এ সময় আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের সবার বঙ্গভবনে যাওয়া উচিত।’ সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমার পাশে আপনারা থাকুন।’ এরপর সবাই বঙ্গভবনে যেতে রাজি হন। এর আগে বৈঠকে হেফাজত নেতা মুফতি ফয়জুল্লাহর উপস্থিতি নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন মাওলানা মামুনুল হকসহ আরো দুই আলেম। মুফতি ফয়জুল্লাহকে শেখ হাসিনার দোসর বলে আখ্যায়িত করা হয়। ফলে বঙ্গভবনে তাকে আর নেওয়া হয়নি।

একটি মিনিবাস ও জিপে চড়ে উপস্থিত রাজনৈতিক নেতারা বঙ্গভবনের পথে রওনা হন। অধ্যাপক আসিফ নজরুল, জোনায়েদ সাকি ও ফিরোজ আহমদ জিপে রওনা হন। মিনিবাসে ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ডা. শফিকুর রহমান, জিএম কাদের, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ফয়জুল করীম, মামুনুল হকসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা।

রাজনৈতিক নেতাদের বহনকারী জিপ ও মিনিবাস রাস্তায় লাখো মানুষের জনসমুদ্রে ধীরে ধীরে চলতে থাকে। পেছনে ছিল সেনাবাহিনীর কয়েকটি গাড়ি, যেগুলোয় ছিলেন সেনাপ্রধানসহ তিন বাহিনীর প্রধান।

জাহাঙ্গীর গেট পার হওয়ার পর জনস্রোতে আটকে যায় গাড়িগুলো। এ সময় আসিফ নজরুল গাড়ি থেকে নেমে জনতার উদ্দেশে কথা বলেন। অপরদিকে মিনিবাসে থাকা জিএম কাদের ও আনিসুল হক ছিলেন ভীতসন্ত্রস্ত। তারা এ সময় জানালার পর্দা টেনে নিচু হয়ে থাকেন, যাতে কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের নজরে না পড়েন।

মাগরিবের আজানের কিছুক্ষণ পর রাজনৈতিক দলের নেতা ও সেনাপ্রধানের গাড়িবহর বঙ্গভবনে প্রবেশ করে। মিনিবাসটি আগে বঙ্গভবনে প্রবেশ করে। তারপর সেনাপ্রধানের গাড়ি এবং আসিফ নজরুল ও অন্যদের বহন করা জিপ প্রবেশ করে।

বঙ্গভবনে প্রবেশের পর দরবার হলের পাশে একটি কক্ষে চরমোনাইর পীর মাওলানা ফয়জুল করীমের ইমামতিতে নামাজ আদায় করেন ডা. শফিকুর রহমান, মির্জা আব্বাস, মির্জা ফখরুল ইসলামসহ অন্যান্য নেতা।

এরপর সেনাপ্রধান বঙ্গভবনে পৌঁছালে তার সঙ্গে থাকা সেনা কর্মকর্তারা নামাজ আদায় করেন। এই জামাতে ইমামতি করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। এরপর দরবার হলে শুরু হয় বৈঠক। এর মধ্যে মাহমুদুর রহমান মান্না, সাইফুল হকসহ আরো কয়েকটি দলের নেতা বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন।

বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতির জন্য অপেক্ষা করছেন অতিথিরা। আসনে বসে আছেন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন নেতা। কিছুক্ষণের মধ্যে বিমর্ষ ও ভীতসন্ত্রস্ত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু দরবার হলে প্রবেশ করেন। একে একে সবার সঙ্গে হাত মেলান। বিষণ্ণ রাষ্ট্রপতির হাত তখন কাঁপছিল। এ দৃশ্য কিন্তু দরবার হলের সামনের সারিতে বসা রাজনীতিকদের দৃষ্টি এড়ায়নি।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক সে সময়কার পরিস্থিতি তুলে ধরে আমাকে জানান, রাষ্ট্রপতি এসে সবার সঙ্গে হাত মেলালেন। নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নাকে জড়িয়ে ধরেন। এরপর আমাকে সাইফুল ভাই বলে জড়িয়ে ধরেন। যদিও তার সঙ্গে আগে কখনো দেখা হয়নি। সে সময় তিনি অস্থির ছিলেন, কাঁপছিলেন।

বঙ্গভবনে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা শেখ মোহাম্মাদ মাসউদ। সেই সন্ধ্যার পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি যখন সামনে বসা জাতীয় নেতাদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছিলেন, তখন তিনি ছিলেন খুবই বিমর্ষ। তার সঙ্গে হাত মেলানোর সময় তিনি কাঁপছিলেন। তিনি ছিলেন ভীত-সন্ত্রস্ত। বঙ্গভবনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর। তিনি আমাকে জানান, রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিমর্ষ ও হতাশ।

রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে হাত মেলানোর পর রাষ্ট্রপতি তার আসনে বসেন। এরপর সূচনা বক্তব্য রাখেন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। দেশে বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়েছে। সেনাপ্রধান জানান, আমরা জাতীয় নেতাদের নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে বসেছিলাম। এমন পরিস্থিতিতে আমরা আলোচনা করেছি একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করার বিষয়ে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলো এগিয়ে আসায় তিনি ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, পরিস্থিতি সামাল দেওয়া দরকার। এখন একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়া প্রয়োজন।

সেনাপ্রধানের বক্তব্যের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। কারণ, তাকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে। বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। বর্তমান অবস্থায় খালেদা জিয়াকে নির্বাহী আদেশে মুক্তি দেওয়া হলে মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য সমর্থন করে জামায়াতে ইসলামীর আমিরসহ অন্যান্য নেতাও বক্তব্য দেন। মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর জানান, এ সময় দ্বিধান্বিত রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমরা তো কদিনের মধ্যে ইনটারিম গভর্নমেন্ট করব, তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’ তখন সেনাপ্রধান বলেন, ‘না। আপনি রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী। আপনি এটা কালই করতেই পারেন।’ প্রেসিডেন্ট এরপর চুপ করে থাকেন।

আলোচনার এক পর্যায়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চান, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্র তিনি পেয়েছেন কী না? বিষয়টি এখানে যারা উপস্থিত আছেন, তাদের এবং জাতির কাছে স্পষ্ট হওয়া দরকার। সাইফুল হকের এ প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপতি স্পষ্টভাবে জানান, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি পদত্যাগপত্র পেয়েছেন। সাইফুল হকের কাছে পরে আমি জানতে চেয়েছিলাম তিনি কেন বিষয়টি জানতে চেয়েছিলেন জবাবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে বিষয়টি জানতে চেয়েছিলেন।

রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক মেজর জেনারেল হামিদুল হক দেশের পরিস্থিতি অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরে বলেন, আপনারা দেশের যে অবস্থার কথা তুলে ধরেছেন, তারচেয়েও পরিস্থিতি ভয়াবহ। তিনি আরো বলেন, তার কাছে তথ্য আছে, সাতটি থানা সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সব পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে।

এ পর্যায়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এখন মার্শাল ল জারি করা দরকার। জিএম কাদেরের এমন বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান উপস্থিত রাজনৈতিক দলের নেতারা। প্রতিবাদের মুখে অবস্থান পরিবর্তন করে কাদের বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনা মোতায়েনের কথা বলেছেন। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের অবশ্য আমাকে জানান, মার্শাল ল জারির কথা তিনি বলেননি। ল অ্যান্ড অর্ডার ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এখনো দেশে ল অ্যান্ড অর্ডার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে তার মার্শাল ল জারির প্রস্তাবের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাইফুল হক ও শেখ মোহাম্মদ মাসউদ।

বঙ্গভবনে আলোচনার এক পর্যায়ে মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর আয়নাঘরে বন্দিদের সেদিনই মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান। এ সময় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, আয়নাঘর বলে তো আমার কিছু জানা নেই। আসলে এমন কিছু আছে কী?

সে সময়কার ঘটনা তুলে ধরে মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর বলেন, তিনি বঙ্গভবনে থাকা অবস্থায় জানতে পারেন গুম ও আটক থাকা ব্যক্তিদের স্বজনরা ডিজিএফআই অফিসের সামনে জড়ো হয়েছেন। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত কিছু সেনা অফিসার। বিষয়টি জানার পর রাষ্ট্রপতির সামনে তা তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপতি তখন বলেন, ‘আয়নাঘর বলে আসলে কিছু আছে নাকি?’ জবাবে মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর বলেন, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আয়নাঘর আছে কি নেই, আপনিও জানেন না, আমিও জানি না। এখানে ডিজিএফআইয়ের ডিজি উপস্থিত আছেন। তিনি বলতে পারবেন আয়নাঘর আছে কি নেই। যদি থেকে থাকে, তাহলে তাদের মুক্তি দেওয়া উচিত।’ তার বক্তব্যের পর সেনাপ্রধান বলেন, তিনি বিষয়টি দেখবেন। এর ফলে পরদিন গুম হওয়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজমিসহ অনেককে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এ সময় সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। রাষ্ট্রপতি এ সময় জানান, তিনি জানতে পেরেছেন সংসদ ভবনে ভাঙচুর চলছে। সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে জামায়াত ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাও কথা বলেন। এ বিষয়ে আলোচনার সময় বলা হয়, সংসদ ভেঙে দেওয়ার কিছু প্রক্রিয়াগত জটিলতা আছে। ফলে কিছুটা সময় লাগবে।

অপরদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মাওলানা ফয়জুল করীম নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন।

সরকার গঠন নিয়ে নানা প্রস্তাবের মধ্যে জামায়াতের আমির বলেন, ছাত্রদের আন্দোলনের কারণে ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে গেছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি এ সময় আন্দোলনে শহীদ ও আহত ছাত্রদের জন্য সবার কাছে দোয়া করার আহ্বান জানান। সিদ্ধান্ত হয় এক মিনিট নীরবতা পালন শেষে দোয়া করা হবে। সবাই উঠে দাঁড়ান। দোয়া করেন মাওলানা ফয়জুল করীম।

বঙ্গভবনে লিখিত সিদ্ধান্ত : তিন বাহিনী প্রধানের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির সভাপতিত্বে এ বৈঠকটি হয় বলে বঙ্গভবন থেকে গণমাধ্যমকে সেদিন জানানো হয়। এতে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বৈঠকে উপস্থিতি ছিলেন। বৈঠকে চারটি সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সভায় কোটাবিরোধী আন্দোলনে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং তাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করা হয়।

সভায় অনতিবিলম্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবাইকে ধৈর্য ও সহনশীল আচরণের আহ্বান জানানো হয়। সেনাবাহিনীকে লুটতরাজ ও হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণেরও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

সভায় সর্বসম্মতিক্রমে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে অনতিবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

এছাড়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে এবং সম্প্রতি বিভিন্ন মামলায় আটক সব বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি যেন কোনোভাবেই বিনষ্ট না হয়, সে ব্যাপারে সভায় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

এসব সিদ্ধান্তের আলোকে বঙ্গভবন থেকে ৬ আগস্ট সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার কথা জানানো হয়।

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন