রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও পতনের পাঠ

যে শিক্ষা কেউ নেয়নি

যে শিক্ষা কেউ নেয়নি
ফাইল ছবি

বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনা প্রথম শাসক যিনি জনতার তীব্র গণরোষের কারণে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। আর পালিয়েছেন এমন এক দেশে যে প্রতিবেশীর হয়ে তত দিনে নিজের দেশের সঙ্গে সব ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা করে ফেলেছেন। ২০২৪-এ বাংলাদেশের মানুষসহ সমস্ত বিশ্ব অবাক হয়ে দেখল সেই একজন ব্যতিক্রমী শাসককে, যিনি পালিয়ে তো গেলেনই, উধাও হয়ে গেল জাতীয় মসজিদের খতিবসহ পুরো সংসদ এবং স্থানীয় সরকারের এমনকি খড়কুটোও। জনতার রোষ থেকে বাঁচতে পালিয়ে গেলেন পুলিশ বাহিনীসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় সব সদস্য।

ইতিহাসের একটি অপ্রিয় শিক্ষা হলো, যে শাসনব্যবস্থা জনগণের সম্মতি, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে অস্বীকার করে, তার স্থায়িত্ব যত দীর্ঘই হোক, তার পরিণতি শেষ পর্যন্ত সংকটময় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমানের শেষ শাসনকাল এবং শেখ হাসিনার শেষ শাসনকাল, দুটি ভিন্ন সময়ের হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত মিল বহন করে।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচনি বৈধতার নিরিখে ১৯৭৩-এর নির্বাচনের সঙ্গে ২০১৪, ২০১৮ কিংবা ২০২৪-এর নির্বাচনের তুলনা করা যায়। ১৯৭৩-এর নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরের প্রথম নির্বাচন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ৭ মার্চ ১৯৭৩। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে বিজয়ী হয়; ১১টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে, তাদের প্রচারণায় বাধা ও কর্মীদের ওপর হামলা করা হয়। শেখ মুজিব, সৈয়দ নজরুল, জিল্লুর রহমান, তোফায়েল, এরা জিতলেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়Ñঅর্থাৎ বিপরীতে কাউকে দাঁড়াতেই দেওয়া হয়নি। ভোলা থেকে অপহরণ করা হয়েছিল মুজিবের বিপক্ষে দাঁড়ানো প্রার্থী আজহারউদ্দীনকে, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর-বিক্রমের বাবা।

২০১৩-এর একতরফা নির্বাচনে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন বর্জন করে। তাদের প্রধান দাবি ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, যা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করে দেওয়া হয়। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের উপস্থিতি সীমিত হয়ে পড়ে; পরে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের ভূমিকা নেয়, যদিও দলটি সরকারেও অংশ ছিল। ২০১৮-তে রাতের ভোটে এই একতরফা সরকার আরেক ধাপ অগ্রসর হয়ে আগের রাতেই ভোট সম্পন্ন করে ফেলে, দখল করে নেয় ২৮৮টি আসন। আর ২০২৪-এ বিরোধী দলগুলো আবার নির্বাচন প্রত্যাখ্যানকে ধামাচাপা দিতে আয়োজন হয় আমি-ডামির নির্বাচন। এই যে বাবার সঙ্গে মেয়ের শাসনামলের নির্বাচনগুলোর মিল, এর অনিবার্য পরিণতি ছিল গণতন্ত্রের যে ধারাকে এ দেশের মানুষ সংগ্রাম করে অর্জন করেছে, তাকে গোড়া থেকে উৎপাটন করে ফেলা।

শেখ মুজিব জনমত প্রকাশকে সীমাবদ্ধ করেছিলেন একদলীয় শাসন, তথা বাকশাল এবং সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধের মাধ্যমে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিরোধী নেতাকর্মীদের মামলা, গ্রেপ্তার, অফিস তালাবদ্ধ করে রাখা এবং গুমের সংস্কৃতি চালু হয়। শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ক্রসফায়ারের ক্রেডিট দাবি করেছিলেন সংসদে দাঁড়িয়ে, সিরাজ সিকদারকে হত্যা করার পর। আর চার দশক পর দেশ আবার দেখল তার মেয়ের নৃশংসতা। শুধু গুম করে ফেলা নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আটকে রাখা হয়েছিল আয়নাঘর নামের এক জঘন্য কারাগারে, আট-দশ বছর চোখ বেঁধে রাখা হয়েছে অন্ধকার কুঠরিতে। জানতে দেওয়া হয়নি মায়ের মৃত্যুসংবাদও। আবার আমরা দেখলাম ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে যাওয়া ও ব্যক্তিপূজার চল।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি যখন চার বছরেও শক্তিশালী হয়ে ওঠে না, তখন নজর দিতেই হয় অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার অসংগতির দিকে। ইতিহাস দেখায়, ১৯৭৪ সালের সংকট শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল ছিল না। বন্যা ও বৈশ্বিক খাদ্যবাজারের চাপের পাশাপাশি খাদ্য সংগ্রহ, মজুত, আমদানি, বাজার তদারকি এবং ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। বিভিন্ন গবেষণায় দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর সংখ্যা ১০ হাজার থেকে ১৫ লাখ পর্যন্ত অনুমান করা হয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৫০-৭০ শতাংশের মধ্যে পৌঁছায়, খাদ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অমর্ত্য সেন এ দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী করেন ক্রয়ক্ষমতার অভাবকে। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার শাসনামলে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় এবং অর্থনীতির আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তবে এর আড়ালে ছিল চরম দুর্নীতি আর লুটের আয়োজন। একই সময়ে ২০২২-২৪ পর্বে মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশের ওপরে পৌঁছায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২১ সালের প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৪ সালে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ২ লাখ কোটি টাকার বেশি অতিক্রম করে এবং অর্থ পাচার ছাড়িয়ে যায় এর আগের সব সময়ের রেকর্ডকে।

পরিণতি কী? কেন এই পরিণতিকে আমাদের সামনেই রাখতে হবে? এর জবাব হলো, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে, অন্তত যে পথ পরিত্যাজ্য, সে সিদ্ধান্তে আসা জরুরি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে তেজস্বী বক্তব্য এবং আবেগী নেতৃত্বে থাকা শেখ মুজিবকে তারই সহযোগী মুক্তিযোদ্ধারা হত্যা করেন স্বাধীনতার মাত্র চার বছর পরই। রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হিসেবে এ উপায় নিন্দনীয়, কিন্তু নিজেকে গণতান্ত্রিক কিংবা সাংবিধানিকভাবে অপসারণের সব উপায়কে নিজ হাতে বন্ধ করে দিয়ে শেখ মুজিব নিজেই সে পরিণতি ডেকে এনেছিলেন বলেই ইতিহাস পাঠে প্রতীয়মান হয়। এই একটি দিক দিয়ে তার মেয়ে শেখ হাসিনা ভাগ্যবতী, তিনি তার এত দিনের গড়ে তোলা সাম্রাজ্যের কয়েকজন শীর্ষপদস্থ ব্যক্তির সহায়তায় পালিয়ে যান ভারতে। দুটি পরিণতি একই ছিল না; কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমতার শীর্ষে থাকা নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত তীব্র রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।

আমাদের সামনে এখন আদিগন্ত বিস্তৃত সম্ভাবনা। সরকার বা বিরোধী দলে বিদ্যমান প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে আগের চেয়েও সতর্ক হতে হবে। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন বিচার আদালতে নয়, জনগণের রায়ে হয়। গণতন্ত্র শুধু ভোটের দিন ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়; গণতন্ত্র বেঁচে থাকে মানুষের আস্থায়। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে নির্বাচন এমন হতে হবে, যার ফল পরাজিত পক্ষও মেনে নিতে পারে। বিরোধী দলকে শত্রু নয়, গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে রাজনৈতিক পরিসর দিতে হবে। রাষ্ট্রকে কোনো দলের সম্পত্তি নয়, সব নাগরিকের অভিন্ন আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিচারব্যবস্থা হতে হবে নির্ভীক ও স্বাধীন, সংবাদমাধ্যম হতে হবে প্রশ্ন করার সাহসী কণ্ঠস্বর। আর সবচেয়ে বড় কথা, ক্ষমতার পরিবর্তন যেন সংঘাত, রক্তপাত বা অনিশ্চয়তার মাধ্যমে নয়, জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ঘটে। ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা হলো, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে। ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে পারলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক : সংসদ সদস্য

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন