জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর পাঁচ হটস্পটে শহীদ ৩২০ জন

পুলিশ-র‌্যাবের মুহুর্মুহু গুলিতেও রাজপথ ছাড়েননি যোদ্ধারা

জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর পাঁচ হটস্পটে শহীদ ৩২০ জন
ছবি: সংগৃহীত

জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর পাঁচটি এলাকা আন্দোলনকারীদের হটস্পটে পরিণত হয়ে উঠেছিল। যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও রামপুরা এলাকায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফার আন্দোলনে ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলে সর্বস্তরের জনতা। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনে অভিভাবক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমিকরাও যোগ দিয়েছিলেন। এমনকি গৃহিণীরাও আন্দোলনকারীদের খাবার ও পানি দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির নির্বিচার গুলি, রাতভর অভিযান এবং সড়ক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা সত্ত্বেও এসব এলাকা ছিল ছাত্র-জনতার দখলে। আন্দোলনকালীন সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনাগুলোর বেশিরভাগই ঘটে এসব এলাকায়।

ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ এতটা তীব্র ছিল যে, ওয়ারী জোনের তৎকালীন ডিসি ইকবাল হোসেন ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘স্যার গুলি করি একটা, মরে একটা, বাকিরা যায় না; ভয়ের কারণ এটা।’ সেই কথোপকথনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল সারা দেশে। এতে ক্ষোভের আগুন আরো ছড়িয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

সরকারের জুলাই শহীদের তালিকায় ৮৪৩ শহীদের মধ্যে এই পাঁচ স্পটেই শহীদ হয়েছেন ৩২০ জন। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ীতে ১১৫, মোহাম্মদপুরে ৪২, উত্তরায় ৬৯, রামপুরায় ৩২ ও মিরপুরে ৬২ জন পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। পুলিশ, র‌্যাব ও অন্যান্য বাহিনীর মুহুর্মুহু গুলিতেও সড়ক থেকে সরেননি আন্দোলনকারীরা। বিপ্লবী ছাত্র-জনতাকে দমাতে পুলিশের পাশাপাশি হায়েনার মতো হামলে পড়ে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা। তাদের অনেক স্থানে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়েও গুলি করতে দেখা গেছে। এছাড়াও মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে র‌্যাবের হেলিকপ্টার থেকে বেশি গুলি করা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ঢাকায় মোট মামলা হয় ৭৮৯টি। এর মধ্যে ‘হটস্পট’ বলে পরিচিত মোহাম্মদপুরে ৩৫টি, যাত্রাবাড়ী থানায় ১৯, রামপুরায় ২৫ ও মিরপুরে ২৭টি মামলার রেকর্ড হয়। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৪৭৯ এবং অন্যান্য মামলা ৩১০টি।

এসব মামলার মধ্যে ৫৯৭টির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৩২০ এবং অন্যান্য মামলা ২৭৭টি। এছাড়াও ঢাকার ১৫৫ মামলা তদন্ত করছে পিবিআই ও সিআইডি।

৭৮৯ মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র আট মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চারটি হত্যা মামলা এবং চারটি অন্যান্য মামলা। আর ২৭ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, ঢাকার হটস্পটের একাধিক মামলার ট্রাইবুন্যালে বিচার চলছে।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (জনসংযোগ ও মাল্টিমিডিয়া) শাহদাত হোসাইন গত সোমবার রাতে আমার দেশকে জানান, গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্ত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণ, ডিজিটাল আলামত ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে নিরপেক্ষ এবং আইনসম্মত তদন্ত নিশ্চিত করা হচ্ছে।

তিনি আরো জানান, তদন্তের মান বজায় রেখে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ বদ্ধপরিকর।

অদম্য লড়াই যাত্রাবাড়ীতে

জুলাই বিপ্লবের সময় ঢাকার প্রবেশদ্বার যাত্রাবাড়ী ও চিটাগাং রোড ছিল অন্যতম হটস্পট। বৃষ্টির মতো পুলিশের গুলিতে সড়কে পড়তে থাকে একের পর এক ছাত্র-জনতার লাশ। তবু দমে যাননি তারা। পাল্টা প্রতিরোধ গড়েছিলেন সাধারণ জনতা। স্লোগানে-স্লোগানে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন স্বৈরাচার হাসিনার ক্ষমতার মসনদ।

ওই এলাকার আওয়ামী লীগের পলাতক এমপি কাজী মনিরুল ইসলাম মনুর লেলিয়ে দেওয়া নেতাকর্মীরা পুলিশের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু পিছু হটেনি ওই এলাকার লোকজন। সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে যাত্রাবাড়ীর আশপাশের এলাকায়। এতে যাত্রাবাড়ী হয়ে উঠেছিল এক প্রতিরোধের নাম।

ছাত্র-জনতাকে দেখে গৃহিণীরাও রাজপথে সহযোগিতা করেছিলেন খাবার ও পানি দিয়ে। ওই এলাকার পোশাক শ্রমিকরাও রাস্তায় নেমেছিলেন ছাত্র-জনতাকে সমর্থন করে। গুলির প্রতিবাদে তারা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছিলেন।

যাত্রাবাড়ীতে জুলাই আন্দোলনের শেষ দিন, অর্থাৎ ৫ আগস্ট চলে পুলিশের বর্বর হত্যাকাণ্ড। যাত্রাবাড়ী থানার পাশেই একদিনেই ৮০ জনের অধিক ছাত্র-জনতাকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে সারা দেশের মানুষ শিউরে ওঠে।

যাত্রাবাড়ী মোড়ের ফলদোকানি সোহেলের কাছে সেদিনের কথা জানতে চাইলে তিনি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকেন। পরে জানান, সেই আন্দোলনে তিনিও যোগ দিয়েছিলেন। আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ছাত্রদের ওপর পুলিশের নির্যাতন দেখে তিনি আর ঘরে ফিরে যাননি। প্রত্যেক দিন তিনি ছাত্রদের পানি ও চিড়া দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। ওই সময় তার বাম পায়ে একটি রাবার বুলেট লেগেছিল।

দনিয়া হাইস্কুলের শিক্ষার্থী মামুন জানান, জুলাই আন্দোলনে আমাদের ভাইয়েরা যখন রক্তাক্ত হয়েছিলেন, তখন কেউ বসে থাকতে পারেনি। আমাদের অনেক সহপাঠী ক্লাস থেকে যোগ দিয়েছিল আন্দোলনে। ওই সময় পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রলীগও আমাদের ওপর হামলা করেছিল।

অপ্রতিরোধ্য উত্তরা

যাত্রাবাড়ীর মতো উত্তরাও ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এ এলাকাটি ছিল ছাত্র-জনতার দখলে। পুলিশের এপিসি থেকে অবিরাম গুলি ও আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারীদের গুলিতেও পিছু হটেনি ছাত্র-জনতা।

উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে আন্দোলনকারীদের পানি বিতরণের সময় বিইউপি শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ জাহিদুজ্জামান তানভীন, শেখ ফাহমিন জাফর, শাকিল হোসেন, সাব্বির হোসেন ও সজীব সরকার গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদতবরণ করেন।

মুগ্ধ নিহত হওয়ার পর তার কথা ‘পানি লাগবে, পানি’—এ বাক্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেটি সারা দেশের মানুষকে আন্দোলনে উজ্জীবিত করে। এছাড়া একই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁজোয়া যানের নিচে পিষ্ট করে উবারচালক মোখলেসুর রহমান দুর্জয়কে হত্যা করা হয়।

উত্তরায় জুলাই আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থী সুমন জানান, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শাটডাউনে আমরা উত্তরবঙ্গ থেকে কোনো গাড়ি ঢাকায় ঢুকতে দিইনি। ওই এলাকা ছিল ছাত্র-জনতার নিয়ন্ত্রণে। পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে গুলিবর্ষণ করতেই থাকে; কিন্তু আমরা পিছু হটিনি।

উত্তরা এক নম্বর সেক্টরের ব্যবসায়ী আরমান জানান, পুলিশের নির্বিচার গুলিতে এলাকাবাসী রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছিল।

মোহাম্মদপুরে হেলিকপ্টার থেকে গুলি

হটস্পটগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল মোহাম্মদপুর এলাকা। বিশেষ করে বসিলা এলাকাকে গোটা ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল স্থানীয় জনতা। পুলিশ গুলি করে নিরীহ ছাত্র-জনতাকে যখন কোনোভাবেই সরাতে পারেনি, তখন প্রথম র‌্যাবের হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয় মোহাম্মদপুর এলাকায়।

জানা যায়, পুলিশ ও অস্ত্রধারী আওয়ামী ক্যাডারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। বিশেষ করে ২৪-এর ১৫ জুলাইয়ের পর প্রত্যেক দিন ছাত্র-জনতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের সংঘর্ষ হয়। সে সময় ওই এলাকার সর্বত্র গর্জে উঠেছিল ছাত্র-জনতা।

বসিলার বাসিন্দা আহত আব্দুর রহমান জানান, ছাত্র-কিশোরের লাশ পড়ে থাকতে দেখে আর ঘরে বসে থাকতে পারিনি। আমার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নিজেও রাস্তায় নেমে পড়ি এবং ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে যুক্ত হই।

আরেক বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন জানান, আমি নিজের চোখে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করতে দেখেছি। তারপরও ছাত্র-জনতা সড়ক ছেড়ে যায়নি।

ছাত্র-জনতার দখলে মিরপুর

মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ছিল আন্দোলনকারীদের অন্যতম সূতিকাগার। পুলিশ রাজপথের পাশাপাশি ছাদ থেকেও গুলি করে আন্দোলনকারীদের। তারপরও সেখান থেকে সরাতে পারেনি তাদের। সর্বস্তরের জনতা মিরপুরের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে যোগ দিয়েছিল। বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের নির্বাচার গুলির প্রতিবাদে বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছিল। চলে দফায় দফায় সংঘর্ষ। বিক্ষোভকারীদের দমনে র‌্যাবের হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয় মিরপুর এলাকায়। হেলিকপ্টারে গুলি মূলত ছাত্র-জনতাকে ভয় ধরিয়ে দেওয়ার জন্য করা হয়েছিল; কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতা ভয় না করে সড়কে দৃঢ় অবস্থান নেন।

ছাত্র-জনতার সাহস আর প্রত্যয়ের ইতিহাসও গাঁথা আছে মিরপুরের মানুষের মনের গভীরে। দুবছর হয়ে এলেও সে দিনগুলো এখনো মিরপুবাসীর চোখে তাজা স্মৃতি। এই প্রতিরোধে অনেক মায়ের কোল খালি হয়েছে। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়েছে অনেক পরিবার। ছররা গুলিতে চিরতরে অনেকেই অন্ধ হয়ে গেছেন। অনেককে হাত-পা হারাতে হয়েছে।

ওই সড়কের বিভিন্ন দেয়ালে অঙ্কন করা হয়েছে জুলাই বিপ্লবের স্লোগান ও গ্রাফিতি। মেট্রো স্টেশনের পিলারে জুলাই বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে। অভ্যুত্থানের পর ওই এলাকার শিক্ষার্থীরা এসব চিত্রকর্ম এঁকেছেন।

জানতে চাইলে মিরপুর আলিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবির জানায়, জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি আজও চোখে ভাসে। আমরা মিরপুর গোলচত্বরে জড়ো হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছি।

মনিপুর স্কুলের নবব শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুল ওয়াহেদ জানায়, টেলিভিশনে যখন দেখলাম জুলাই আন্দোলনে আমাদের ভাইয়েরা রক্তাক্ত হচ্ছিল, তখন আর ঘরে বসে থাকতে পারিনি। আমাদের অনেক সহপাঠী ক্লাস থেকে যোগ দিয়েছিল আন্দোলনে।

দুর্নিবার প্রতিরোধ রামপুরায়

গণঅভ্যুত্থানে রামপুরা এলাকা ছিল ছাত্র-জনতার দুর্নিবার লড়াইয়ের এক সাক্ষী। এ অঞ্চলে সাধারণ ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে পুলিশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সংস্থাও গুলি ছোড়ে। রামপুরা ও বনশ্রী এলাকার সাধারণ মানুষের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের গল্প আজও এলাকাবাসীর মনে গভীর ক্ষতচিহ্ন হয়ে আছে। পুলিশের অবিরত গুলি ও নির্যাতনেও ছাত্র-জনতা সড়ক ছেড়ে যায়নি।

বেসরকারি ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ওই এলাকায় আন্দোলনে বেশ সরব ছিলেন। তাদের আন্দোলনে ওই এলাকার লোকজনও সহযোগিতা করেছে।

রামপুরার টিভি ভবনের পেছনের গলির বাসিন্দা আকবার হোসেন জানান, আমার ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনিও তার ছেলের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন।

ইস্ট ওয়েস্টের শিক্ষার্থী শোভন জানান, আমরা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিঃস্বার্থভাবে যোগ দিয়েছিলাম। হামলা, গুলির পরও সড়ক ছেড়ে যাইনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন