জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। এ সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এ পর্যন্ত ছয় মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এসব মামলায় গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ৬১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো শহীদ ওয়াসিম, মীর মুগ্ধ, গোলাম নাফিজ ও আসহাবুল ইয়ামিনসহ আলোচিত অনেক হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়নি। এছাড়া অসংখ্য মামলার তদন্ত এখনো ঝুলে আছে। বিচার বিলম্বিত হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার, আহত জুলাইযোদ্ধা ও বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে বেড়েছে উদ্বেগ আর হতাশা। ন্যায্য সময়ের মধ্যে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। সরকারের কাছে দ্রুত সময়ে বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
ট্রাইব্যুনাল রেজিস্টার সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দুই ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাকাণ্ডের সাত মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। এসব মামলায় শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকসহ ৬১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
কুষ্টিয়ায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে করা মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ। এছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে করা মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে যুক্তিতর্ক শুরু হয়েছে।
যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ কর্মকর্তা ইমাম হোসেন তায়িম হত্যা মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে করা মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। শহীদ ওয়াসিম ও শহীদ মীর মুগ্ধ হত্যার ঘটনায় করা দুটি চার্জ গঠন শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া দুই ট্রাইব্যুনালে মিসকেস হিসেবে ৪৬ মামলা তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে।
প্রসিকিউশন সূত্রে গেছে, জুলাই বিপ্লবে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৫৯০ মামলার মধ্যে ১০৯টি যাচাই-বাছাই শেষে তদন্তের জন্য তদন্ত সংস্থায় পাঠানো হয়েছে।
দুবছরে বিচারের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, একটি মামলার শুরুতে তদন্তে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় হয়। এরপর প্রতিটি মামলায় ২০ জনের বেশি সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষেই তা রায়ের পর্যায়ে যায়। যে ছয় মামলার রায় হয়েছে, আমি মনে করি অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে এবং স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে বিচারকাজ শেষ হয়েছে। আরো তিন মামলার রায় আগামী মাসে হতে পারে।
তিনি বলেন, আমাদের এখানে বিগত আমলের গুম ও নির্যাতনের বেশ কয়েকটি মামলার বিচার চলছে। তবে আমরা জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। আগামী এক বছরের মধ্যে আমরা যেন জুলাই হত্যাকাণ্ডের সব মামলা তদন্ত ও বিচার শেষ করতে পারি, সে প্রতিশ্রুতি নিয়ে আমরা এগোচ্ছি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমি মনে করি অসংখ্য মামলার মধ্যে যেগুলো আমাদের ট্রাইব্যুনালে হওয়া উচিত, সেগুলো এখানে হবে। আর যেগুলো নিম্ন আদালতে হলে ভালো হবে, সেগুলো সেখানে হওয়া উচিত। আমরা কাউকেই ছাড় দেব না; আবার কাউকে ন্যায়বিচার থেকেও বঞ্চিত করব না।
তিনি আরো বলেন, আমরা সারা দেশে জুলাই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৫৯০ অভিযোগের মধ্যে ১০৯টি যাচাই-বাছাই শেষে তদন্ত সংস্থায় পাঠিয়েছি। বিচারের বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতার জায়গা থেকে কাজ করছি। আশা করছি বিচারপ্রার্থীদের প্রত্যাশিত সময়েই বিচারকাজ সম্পন্ন করতে পারব।
স্বৈরশাসন টিকিয়ে রাখতে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে বর্বরতম পথ বেছে নেয় ফ্যাসিস্ট হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী সরকার। হাসিনার সরাসরি নির্দেশে পুলিশ, বিজিবি এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মারণাস্ত্র এবং দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সাধারণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের নির্বিচার গুলি ও হামলায় এক হাজার ৪০০ জন শহীদ হন এবং কয়েক হাজার ছাত্র-সাধারণ মানুষ গুরুতর আহত হন। এতে ৫৩৭ জন তাদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। এর মধ্যে ৪৪ জন চিরদিনের জন্য দুচোখের দৃষ্টি হারান এবং এক চোখের দৃষ্টি হারান ৪৯৩ জন।
জুলাই বিপ্লবে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন হলে এই গণহত্যার বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারকে চেয়ারম্যান করে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এরপর চাপ বাড়লে গত বছরের ৮ মে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করা হয়। দুই ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত তিনটি করে ছয় মামলার রায় হয়েছে। এসব মামলায় সাজা হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৬১ জনের। প্রথম রায় হয় গত বছরের ১৭ নভেম্বর।
সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের ওই মামলায় ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি হাসিনা-কামালের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে শহীদ ও আহত পরিবারের মধ্যে বণ্টন করা নির্দেশ দেওয়া হয়।
একই ট্রাইব্যুনাল রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলার রায়ে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পুলিশের তিন সাবেক কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচ সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজনের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ওই ছয় শহীদ পরিবারে বণ্টনেরও আদেশ দেওয়া হয়।
রামপুরায় ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি ও দুজনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় একই ট্রাইব্যুনাল গত ২৮ জুন হাবিবুর রহমানসহ পুলিশের তিন সাবেক কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড, একজনকে যাবজ্জীবন ও একজনকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়।
সাভারের আশুলিয়ায় গুলি করে হত্যা ও লাশ পোড়ানো মামলার রায়ে ট্রাইব্যুনাল-২ চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড, সাতজনকে যাবজ্জীবন ও দুজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেয়। রাজসাক্ষী হওয়ায় ক্ষমা পান পুলিশের সাবেক এএসআই আবজালুর রহমান। এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আশুলিয়ার সাইফুল ইসলামের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে শহীদ পরিবারের মধ্যে বণ্টনের আদেশ দেওয়া হয়।
জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় এই ট্রাইব্যুনাল ৯ এপ্রিল পুলিশের সাবেক দুই কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তিনজনকে যাবজ্জীবন এবং বেরোবির সাবেক উপাচার্য হাসিবুর রশীদসহ ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়। এই ট্রাইব্যুনাল কুষ্টিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলার রায়ে ৩০ জুন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়।
ছয় মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত ৬১ আসামির মধ্যে ৪০ জনই বর্তমানে পলাতক। কারাগারে আছেন ২১ জন। এর মধ্যে হাসিনাসহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৫ আসামির মধ্যে ১১ জনই পলাতক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন




