রিয়াদ। সদ্য এইচএসসি পাস করা একজন অদম্য তরুণ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চোখ হারানো এক যোদ্ধা। ১৮ জুলাই উত্তরা বিএনএস সেন্টার এলাকায় শহীদদের খুনিদের বিচার দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে সর্বস্তরের ছাত্র-নাগরিক। পুলিশ প্রথম থেকেই বাধা দেওয়ার চেষ্টায় ছিল। শুরু হয় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের কয়েক দফা পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। একসময় পুলিশ পিছু হটে, সশস্ত্র অবস্থান নেয় থানার সামনে। সেখান থেকেই পুলিশ ছাত্রদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। এমনকি উত্তরা রাজউক কলেজের সামনে পুলিশ দুই ছাত্রের ওপর এপিসি চালিয়ে দেয়। সেখানেই শাহাদাতবরণ করেন তারা। এমন ভয়ংকর অবস্থার পরও ছাত্ররা পিছু হটেনি। গুলির বিপরীতে নিরস্ত্র প্রতিরোধ গড়েই যাচ্ছিল।
পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার একপর্যায়ে আনুমানিক দুপুর ১টার দিকে রিয়াদ জায়গা পরিবর্তন করে আজমপুরের দিকে চলে আসেন। রিয়াদ জানান, আজমপুর ব্রিজের নিচে তিন পুলিশ সদস্য নিজেদের লুকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, যাদের সহজে চোখে পড়ার কথা নয়। মিছিলের সঙ্গে রিয়াদ যখন সামনে চলে যান, তখন আড়ালে থাকা পুলিশ সদস্যরা রিয়াদকে লক্ষ করে গুলি ছুড়তে থাকে। রিয়াদের গায়ে মোট ২৮টি ছররা গুলি লাগে। এর মধ্যে মাথায় আঘাত হানে ৪-৫টি। বুলেটের আঘাতে মাথা বেয়ে দরদর করে রক্ত ঝরে। তিনটি গুলি লাগে তার চোখে। তখন থেকেই চোখে দেখতে পান না রিয়াদ। টিয়ারশেলের ধোঁয়া থেকে বাঁচার জন্য চেহারায় আগে থেকেই টুথপেস্ট লাগানো ছিল, টুথপেস্ট আর রক্ত মিশে দুই চোখই অকেজো হয়ে যায় তার। যদিও পরে এক চোখে কিছুটা দেখতে পান রিয়াদ।
যখন গুলি আঘাত হানে রিয়াদের চোখে, তখনও মনোবলে বিন্দু পরিমাণ ঘাটতি দেখা যায়নি। তিনি নিজেকে প্রবোধ দিচ্ছিলেন এই বলে যে, ‘কোনোভাবেই অজ্ঞান হওয়া যাবে না।’ কিছুক্ষণের মধ্যে আশপাশের ছাত্ররা রিয়াদকে ধরে হাসপাতালে নিয়ে যান। পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর রিয়াদকে নেওয়া হয় আগারগাঁও চক্ষু হাসপাতালে। যাওয়ার পথে পুলিশ কয়েক দফা বাধা দেয়, তবু রুখতে পারেনি। রিয়াদ ও তার সঙ্গীরা বিকল্প পথ ব্যবহার করে হাসপাতালে পৌঁছান। গুলিবিদ্ধ রিয়াদকে হাসপাতালের উদ্দেশে সিএনজি অটোরিকশায় তুলে দিয়েই আন্দোলনে চলে যান রিয়াদের বাবা।
তিনবার অস্ত্রোপচার করেও রিয়াদের দৃষ্টিশক্তি ফেরানো যায়নি। তার ডান চোখ পুরোপুরি বিকল হয়ে গেছে। রিয়াদ আমাদের জানান, প্রথমদিকে চোখে না দেখা নিয়ে তার তেমন কিছু অনুভব হয়নি। মনে হচ্ছিল, তার চোখের চেয়ে দেশের অবস্থা খারাপ। বেহাল চোখ নিয়েও ৫ আগস্টের আগে তিনি বাসায় থাকতে পারেননি। নানা জায়গায় পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। তবে ৪ আগস্ট যখন উত্তরায় নির্বিচারে গুলি চলছিল, তখন রিয়াদ নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি। পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে অন্ধ চোখ নিয়েই তিনি আবারও আন্দোলনে নেমে আসেন। হাসিনার পালানোর পর গণভবনেও যান।
সদ্য ইন্টারমিডিয়েট পাস করা রিয়াদ কেন কোটা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হলেন—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ১৫ তারিখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের বড় ভাইদের মারা হয়। এটা দেখে আমরা বসে থাকতে পারিনি। বন্ধুরা মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেমে গিয়েছিলাম।
এদিকে ছেলের চোখ হারানো নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই রিয়াদের মায়েরও। তিনি বলেন, বহু মানুষ জীবন দিয়েছে, অনেকেই দুই চোখ হারিয়েছে, আমার ছেলের তবুও তো এক চোখ আছে। রিয়াদ কখনো কাছের জিনিস দূরে দেখেন, আবার কখনো দূরের জিনিস কাছে। পানি ঢালতে গেলে প্রায়ই গ্লাসে না পড়ে বাইরে পড়ে যায়। রাস্তা পার হতে অসুবিধা হয়, গাড়ির অবস্থান বুঝতে পারেন না। রিয়াদ ভালো ফুটবল খেলেন। লোকাল ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন। কিন্তু তিনি আর কখনোই ফুটবল খেলতে পারবেন না। কারণ, তিনি বলের দূরত্ব ঠিক করতে পারেন না।
চোখ হারানো নিয়ে রিয়াদের কোনো আফসোস নেই। তিনি শুধু ভয় পাচ্ছিলেন এই জালেমশাহীর পতন হবে কি না। দুঃসহ মানসিক যন্ত্রণা তাড়া করে বেড়াত রিয়াদকে। রাস্তায় অপরিচিত কাউকে দেখলে বা বাসে নতুন কেউ উঠলে তার বুক কাঁপত দুরদুর করে। রিয়াদ এখনও মাঝেমধ্যে ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখেন—তার চোখ নেই; জনমের তরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গেছে। ঘুমের ঘোর ভাঙলে আলো-আঁধারির অবসান হলে তিনি উপলব্ধি করেন আসলেই তার একটি চোখে আর কখনো আলো ফিরবে না। তখন রিয়াদের বিষন্ন লাগে, একাকিত্ব বোধ হয়। তবে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে স্বাধীন দেশ দেখলে মন কিছুটা হালকা হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

