ভোর তিনটায় ইউসুফ প্লাস্টিকের ব্যাগটা হাতে নিয়ে বন্দরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। আকাশের রঙ নিয়ে ভোর তখনো সমুদ্রের সঙ্গে বোঝাপড়া করছিল। মাকে তিন ঘণ্টা আগেই বিদায় জানিয়েছিল। এখন আর জাগাল না। যেন সে ভেঙে না পড়ে, নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত না হয়।
বলল, ‘ফিরে এসো না।’
কারণ এই দেশে ফেরা মানেই মৃত্যু।
তাকে একটি খাম দিল। এর মধ্যে তার যাত্রাপথে চলার মতো যথেষ্ট টাকা ছিল। এগুলো তার সেলাই করার সুঁই এবং তার বিয়ের আংটি বিক্রি করে জোগাড় করেছিল।
*
এক মাস আগে ইউসুফ তার ছেলেকে আনতে স্কুলে গিয়েছিল। বলেছিল, ‘আমি তোমাকে এই শিক্ষকের হাত থেকে রক্ষা করব।’
ছেলেটি বলল, ‘বাবা, আমি স্কুল ভালোবাসি। শুধু ওদের জানতে দিও না যে তুমি আমার বাবা।’
সে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমাকে এটা কে শিখিয়েছে?’
ছেলেটি চুপ রইল।
এক বছর আগে ইউসুফ তার বাবার রেখে যাওয়া শেষ জমিটুকুও বিক্রি করে দিয়েছিল। আঁটোসাঁটো স্যুট পরা, ফোলা ভুঁড়িওয়ালা এক লোক তার কাছে এসে এমন এক দাম চাইল, যা তার ক্ষুধার তুলনায় একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সেটা এক টুকরো জমির দাম ছিল না; ছিল একজন মানুষের অস্তিত্বে টুকরা বিক্রির দাম।
ইউসুফ নিজেকে প্রশ্ন করল, জমি যদি সন্তান ও পরিবারের চেয়েও মূল্যবান হয়, তার বাবা কবর থেকে যেমনটা বলেন, তাহলে বিক্রি করার কী দরকার?
*
চাচাতো ভাই বিদেশ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, ‘আমি এসে গেছি, ইউসুফ! তোমার বোনকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। আমার একটা অ্যাপার্টমেন্ট আর থাকার জায়গা হয়ে গেছে, আর আল্লাহর রহমতে প্রচুর কাজও আছে।’
ইউসুফ তার চাচাতো ভাইয়ের কণ্ঠস্বর ছাড়াও আরেকটি কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, ‘তুমি কি পরিষ্কার করতে জানো?’
ইউসুফ বুঝতে পারল, তার চাচাতো ভাই একজন মানুষ থেকে কর্মীতে রূপান্তরিত হয়েছে।
ঠিক একই সময়ে, সমুদ্র থেকে অনেক দূরে এক জায়গায়, একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা একটি প্রতিবেদনের সামনে বসেছিলেন—‘অভিবাসন আবেদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং অবৈধ অভিবাসনের ঢল...’ সে পৃষ্ঠাটা উল্টাল। বাকিটা সে পড়ল না।
তার বিশ্বস্ত বন্ধুকে বলল, ‘আমি আজ রাতে টেলিভিশনে একটি দেশাত্মবোধক গান গাইব। এটি হবে শিকড় আর আপনত্বের অনুভূতি নিয়ে।’
সে দ্বিতীয় কাপে ঢালল আর বলল, ‘যে নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে যায়, সে এর যোগ্য নয়।’
*
করিম তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপত্র-সংবলিত একটি ফাইল, তার বাগদত্তার ছবি এবং মায়ের চিঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, এই চিঠির উত্তর তখনো দেয়নি। কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কেন ভ্রমণ করতে চান?’
সে উত্তর দিল, ‘পড়াশোনার জন্য।’
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অফিসারটি বললেন, ‘দুঃখিত, এটা সম্ভব নয়।’ আরো বললেন, ‘কারণ আপনার হাজার হাজার বন্ধু পালিয়ে গেছে।’
করিম মাটির দিকে তাকাল। সে গভীর লজ্জাবোধ করল। এই লজ্জা সে বয়ে বেড়াচ্ছিল সেইসব অচেনা মানুষদের জন্য, যাদের সঙ্গে তার কখনো দেখা হয়নি, তারা পরবর্তী প্রজন্মের মুখের ওপর বন্ধ দরজার আড়ালে নিজেদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
*
অবশেষে সমুদ্রের ঘাটের উপর ইউসুফ এসে দাঁড়াল। তার সিগারেটের ধোঁয়া ধুলামাখা আকাশের দিকে ছাড়ল। মনে পড়ল তার মায়ের কথা। মা তাকে চলে যেতে নিষেধ না করার জন্য নিজের চোখের পানি লুকিয়ে রাখতেন। মা বললেন, ‘ফিরে এসো না।’
তার বাবা কবর থেকে বললেন, ‘ভূমি আরো মূল্যবান।’
সেখান থেকে তার চাচাতো ভাই বলল, ‘তোমার বোনকে পাঠাও।’
স্কুল থেকে তার ছেলে বলল, ‘ওদের জানতে দিও না যে তুমি আমার বাবা।’
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাটি বলেছেন, ‘নিজের দেশকে ভালোবাসুন।’
অথচ কেউ বলেনি, ‘থেকে যাও।’
অন্ধকারের মধ্যে কয়েক ডজন যুবক, যুবতী ও শিশুদের মাঝে ইউসুফ ছোট নৌকায় উঠল। পকেটে তার ছেলের একটা ছবি। গলায় মায়ের তসবি। মুখে ছিল সেই আয়াতটি, যেটা সে ছোটকালে মুখস্থ করেছিল। অর্থটা এই এত বছর পর এখন মাত্র বুঝতে পারল—‘আল্লাহর দুনিয়া কি তোমাদের হিজরত করার মতো যথেষ্ট প্রশস্ত ছিল না?’
সে উত্তাল ঢেউগুলোকে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত এক শিকারি জন্তুর ভূমিকায় দেখতে পেল। সে পেছনে তাকানোর চেষ্টা করল না ।
তার পরে যারা এসেছিল, তারা তাকে বিক্রি করে দিয়েছিল। তার কানে মায়ের শেষ কথাগুলো বাজছিল—‘আর ফিরে এসো না।’
সে নিজেকে সেই প্রশ্নটি করল, যেটাকে সে সমুদ্রের চেয়েও বেশি ভয় পেত—‘আল্লাহ গো, আমি কি মুহাজির নাকি বাস্তুহারা?’
মোহাম্মদ সাঈদ হামিদ (Muhammad Sayeed Hamid/محمد سعيد حميد) ইয়েমেনের কবি, লেখক ও আবহাওয়াবিদ। তিনি ইয়েমেনের বেসামরিক বিমান চলাচল ও আবহাওয়া কর্তৃপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থায় (WMO) ইয়েমেনের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। তার সাহিত্যকর্মের মধ্যে ছোটগল্প সংকলন أحلام في المرجل (আহলাম ফিল মারজাল : বাক্সবন্দি স্বপ্নগুলো) ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয়। তার গল্প ও কবিতা বিভিন্ন আরবি সংবাদপত্র, সাহিত্যপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
মূল : মোহাম্মদ সাঈদ হামিদ
আরবি থেকে বাংলা : মুহতারিম মুহাম্মাদ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

