বাংলার সুলতানি স্থাপত্য

ড. খোন্দকার আলমগীর

বাংলার সুলতানি স্থাপত্য

বাংলায় মুসলিম অধিকারের আদিকাল থেকেই এখানে মুসলিম স্থাপত্যের সূচনা হয়। ইতিহাস পাঠে জানা যায়, ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজি প্রথম থেকেই বিজিত সব এলাকায় মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সুলতানরাও তার অনুসরণে অসংখ্য ইমারত নির্মাণ করেন। বাংলায় সুলতানি স্থাপত্যের কয়েকটি প্রধান কেন্দ্র পাওয়া যায়, যেমন—ছোট পাণ্ডুয়া, ত্রিবেণী (হুগলি), গৌড়, হজরত পাণ্ডুয়া (মালদা), সোনারগাঁও, বারবাজার ও বাগেরহাট।

মুসলমানরা যখন বাংলা জয় করে, তখন বিশ্বের অন্যত্র মুসলিম স্থাপত্যের খুব বেশি উন্নতি হয়েছিল এবং মুসলিম স্থাপত্যের চরম উৎকর্ষ ঘটেছিল। এ দেশে আগমনের সময় মুসলমানরা বহু স্থপতি, শিল্পী ও কারিগর সঙ্গে এনেছিল। স্থাপত্যেও দেশীয় ঐতিহ্যও ছিল। অর্থাৎ এ সময়টি ছিল দেশীয় ও বহিরাগত শিল্প বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণের যুগ। দেশীয় বৈশিষ্ট্য হলো—স্থাপত্যের ট্রাবিয়েট (trabeate) রীতি, বক্র ছাদ কিনারা (curved cornices of buildings), গাঁথুনির মসলা হিসেবে কাদা-মাটির (mud mortar) ব্যবহার, পোড়ামাটির অলংকরণ, পুরাকীর্তির সঙ্গে দিঘি, কুঁড়েঘর আকৃতির আচ্ছাদন (hut-shaped roofs) ইত্যাদি। বহির্দেশীয় উপকরণ হলো—স্থাপত্যের খিলান রীতি (arcuate system of construction), রঙিন টালির ব্যবহার (glazed tiles), ইমারতের গায়ে শিলালিপির ব্যবহার, ইমারতের গায়ে জ্যামিতিক ও পুষ্প অলংকরণ। বাংলায় মসজিদ ও সমাধি নির্মাণও বহির্দেশীয় উপকরণ। বাংলায় মুসলিম স্থাপত্যের বিভিন্ন কেন্দ্র সম্বন্ধে নিচে আলোচনা করা হলো।

বিজ্ঞাপন

ত্রিবেণী, হুগলি ও সাতগাঁওয়ের পুরাকীর্তি

ত্রিবেণী, হুগলি ও সাতগাঁওয়ের পুরাকীর্তিগুলো এ দেশের সবচেয়ে প্রাচীন (ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষার্ধ)। বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের ইতিহাসে হুগলি জেলার ছোট পাণ্ডুয়ার ত্রিবেণীতে অবস্থিত জাফর খান গাজীর মসজিদ (৬৯৬/১২৯৬-৯৭) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাফর খানের মসজিদ বাংলায় বিদ্যমান মুসলিম পুরাকীর্তিগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম। ত্রিবেণীর এই বন্দর-নগরীতে মুসলিম স্থাপত্যেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন নিদর্শন বিদ্যমান। জাফর খান গাজীর মসজিদের বৃহদাকার স্তম্ভগুলো দেশীয় উপকরণের নিদর্শন। এ ধরনের স্তম্ভ পশ্চিম বাংলার মালদা জেলার হজরত পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ (৭৭৬ হি./১৩৭৪-৭৫ খ্রি.), বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গৌড়ের দারাসবাড়ী মসজিদ (৮৮৪/১৪৭৯-৮০), পশ্চিম বাংলার গৌড়ের গুনমন্ত মসজিদ (৮৮৯ হি./১৪৮৪-৮৫ খ্রি.) এবং পশ্চিম বাংলার গৌড়ের কদম রসুল ইমারতে (৯৩৭ হি./১৫৩১ খ্রি.) দেখা যায়। এ ধরনের স্তম্ভ শুধু বাংলায় দেখা যায়। উপমহাদেশের অন্য কোথাও এ ধরনের বৃহদাকার স্তম্ভ দেখা যায় না। জাফর খান গাজীর কবরও পূর্ববর্তী হিন্দু ইমারত থেকে আহরিত মালমসলা দ্বারা নির্মিত। জাফর খানের মসজিদ প্রথমে পাঠদান কার্যে ব্যবহৃত হয় এবং পরবর্তী সময়ে মাদরাসার জন্য একটি পৃথক ইমারত নির্মাণ করা হয়। কিন্তু জাফর খানের মৃত্যুর পর তাকে মাদরাসা ভবনে দাফন করা হয়।

গৌড় শহর ও শহরতলি

সুলতানি আমলে গৌড় বা লক্ষ্মণাবতী ছিল শাসনের কেন্দ্র। পূর্ববর্তী বৌদ্ধ ও হিন্দু আমলেও এ শহরটি শাসনের কেন্দ্র ছিল। এটি রাজা লক্ষ্মণ সেনেরও রাজধানী ছিল। লক্ষ্মণ সেন ১২০৪-৫ খ্রিষ্টাব্দে মালিক ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজির কাছে পরাজিত হন। প্রথম থেকেই মুসলমানরা অনুধাবন করেন, শুধু অস্ত্রের জোরে বাংলায় শাসন সুসংহত করা সম্ভব নয়। তাই শান্তিপূর্ণ সময়ে একটি মুসলমান সমাজ গড়ে তোলার জন্য তারা মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন। মহামারির কারণে ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে এটি পরিত্যক্ত হয় এবং তার ফলে এটি জঙ্গলাবৃত হয়ে যায়। রাজকীয় মূল দুর্গ এলাকাটি ১৯৪৭ সালে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং শহরতলি এলাকাটি বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান) অন্তর্ভুক্ত হয়। এই এলাকাটি ফিরোজপুর নামেও পরিচিত। দ্বিতীয় ফিরোজ শাহের নামানুসারে এটির নামকরণ করা হয়। এ এলাকায় অনেক রাস্তার চিহ্ন রয়েছে। গৌড় শহরে এ দেশের প্রাথমিক মুসলমান যুগের সবচেয়ে বেশি পুরাকীর্তি পাওয়া যায়। এ শহরকে তিনটি ভাগ করা যায়Ñদুর্গ এলাকা, প্রাকারবেষ্টিত শহর ও শহরতলি বা উপশহর। শহরের দক্ষিণ দিকের কোতওয়ালি দরওয়াজা দিয়ে এ শহরে প্রবেশ করা যায়। কোতওয়ালি দরওয়াজার দুই দিকে উচ্চ প্রাকার সংযুক্ত আছে। বড় সোনা মসজিদ (১৫২৬) ও ছোট সোনা মসজিদ (আনু. ১৫১০) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইমারত। ছোট সোনা মসজিদটি আজ পর্যন্ত মোটামুটি ভালো অবস্থায় বিদ্যমান। অন্যান্য মসজিদগুলো হলো: চামকাটি মসজিদ (১৪৭৮), দরসবাড়ী মসজিদ (১৪৭৯), খানিয়াদিঘি মসজিদ (১৪৮০), ধানিচক মসজিদ (১৪৮০), লোটন মসজিদ (১৪৯৩-১৯) ইত্যাদি। সুলতান নাসির উদ্দীন মাহমুদ শাহ (১৪৩৬-১৪৫৯) পাঁচ খিলানের সেতু, চাঁদ ও দাখিল দরওয়াজা, বাইশগজি দেয়াল এবং গৌড়ের দুর্গ নির্মাণ করেন। সুলতান বরবক শাহ ১৪৬৬ খ্রিষ্টাব্দে নিম দরওয়াজা নির্মাণ করেন। সুলতান সাইফুদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৪৮৭-৯০) গৌড়ের ফিরোজা মিনার নির্মাণ করেন।

হজরত পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ

পশ্চিম বাংলার মালদা জেলার হজরত পাণ্ডুয়াতেও বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের চমৎকার কিছু নিদর্শন রয়েছে। সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের (১৪৪২-৫৮) পুত্র সুলতান সিকান্দার শাহ (১৩৫৮-৮৯) ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদ (১৩৭৪-৭৫) নির্মাণ করেন। উপমহাদেশে এ যাবৎকালে নির্মিত মসজিদগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম বৃহত্তম মসজিদ। সাহন ও রিউয়াকযুক্ত (courtyard type mosque) এ মসজিদটি দামেস্ক মসজিদ (৮ম শতাব্দী) ও ইবনে তুলুনের (৯ম শতাব্দী) মসজিদের নকশা অনুসরণে নির্মিত। এ ধরনের মসজিদ পরবর্তী সময়ে বাংলায় আর নির্মিত হয়নি। বাংলায় নির্মিত পরবর্তী মসজিদগুলো আচ্ছাদনযুক্ত (covered type)। হজরত পাণ্ডুয়ার একলাখি সমাধি (১৪১৫-৩৩) বাংলায় নির্মিত প্রাথমিক সমাধি স্থাপত্যের একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন। এটি এ দেশের পরবর্তী স্থাপত্যকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছে। সুলতান জালালউদ্দীন মুহম্মদ শাহ (১৪১৫-৩৩) হজরত পাণ্ডুয়া থেকে রাজধানী গৌড়ে স্থানান্তর করেন।

সুলতানি স্থাপত্যের কেন্দ্র সোনারগাঁও

স্বাধীন পূর্ব বাংলার রাজধানী সোনারগাঁও ছিল সুলতানি স্থাপত্যের আরেকটি কেন্দ্র। এখানে বহু মসজিদ, সমাধি ও সেতু নির্মিত হয়েছিল। বর্তমানে এগুলোর মাত্র কয়েকটি অবশিষ্ট আছে। হাজী বাবা সালেহ নির্মিত বন্দরের মসজিদ (১৪৮১-৮২), মোল্লা হিজবর আকবর খান নির্মিত গোয়ালদি মসজিদ (১৫১৯), ফিরোজ খান নির্মিত মহজমপুর মসজিদ (১৪৩২-৩৬)। সোনারগাঁওয়ে হজরত শরফউদ্দীন আবু তাওয়ামা (১৩শ শতাব্দী) প্রতিষ্ঠিত একটি বৃহৎ শিক্ষাকেন্দ্র ছিল। সোনারগাঁওয়ের সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ (১৩৯৩-১৪১০) শিরাজের কবি হাফিজকে বাংলায় আমন্ত্রণ করেন। কিন্তু হাফিজ বাংলায় আসতে পারেননি। পাণ্ডুয়ার সুলতান সিকান্দার শাহের (১৩৫৮-৯৩) রাজত্বকালে সোনারগাঁও থেকে বিদ্রোহী পুত্র গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ একটি অসমাপ্ত কবিতার একটি চরণ এটি সম্পূর্ণ করার জন্য হাফিজের (মৃত্যু ১৩৮৮) নিকট শিরাজে প্রেরণ করেন। সাধারণভাবে বলা হয়, গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ সোনারগাঁওয়ের মোগরাপাড়ায় সমাধিস্থ আছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি তার পিতা সুলতান সিকান্দার শাহের সমাধি বলে বর্তমান লেখক মনে করেন।

বারবাজারের প্রত্নস্থল

সম্প্রতি আবিষ্কৃত বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলার বারবাজার (প্রাচীণ নাম মোহাম্মদাবাদ) প্রাথমিক মুসলিম যুগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্নস্থল এবং বাংলার প্রাথমিক মুসলিম যুগের স্থাপত্য ইতিহাস পুনর্গঠনে এটি অত্যন্ত সহায়ক। বাংলায় মুসলিম অধিকার স্থলপথে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয় এবং বারবাজার এ প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বাংলাদেশের বর্তমান ঝিনাইদহ (বৃহত্তর যশোর) জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার এটি একটি ক্ষুদ্র এলাকা। এটি সম্ভবত শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের (৭৪৩-৭৪৯/১৩৪২-৫৮) সময়ে শহর-ই-নও নামে পরিচিত ছিল। বাগেরহাট যাওয়ার পথে হজরত খান জাহান (৮৬৩ হি./১৪৫৯ খ্রি.) সম্ভবত এ স্থান অতিক্রম করেছিলেন। বারবাজারের সাতগাছিয়া ও মনোহর মসজিদ বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের (১৪৪০) নির্মাণ-কৌশলকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে। বারবাজারের এ মসজিদ দুটির উপরে ৩৫টি করে গম্বুজ স্থাপিত ছিল। এ সংখ্যাটি ষাট গম্বুজ মসজিদের এক বাহুর উপরে স্থাপিত গম্বুজের সমান। ষাট গম্বুজ মসজিদের মধ্যস্থলে সাতটি চৌচালাসহ এ মসজিদের গম্বুজের সংখ্যা ৭৭ (৩৫+৩৫+৭=৭৭)। সাতগাছিয়া ও মনোহর মসজিদের স্থাপত্য স্থূল এবং এটি নিম্নমানের কারিগরি প্রদর্শন করে। বারবাজারের অন্যান্য পুরাকীর্তিগুলো হলোÑগলাকাটা, জোড় বাংলা, পীর পুকুর, নুনগোলা, চেরাগদনি ইত্যাদি মসজিদ। জোড় বাংলা প্রত্নস্থল খননে প্রাপ্ত আবুল মোজাফফর মাহমুদ ইবনে হোসাইনের একটি ইটশিলালিপি অনুযায়ী অনুমিত হয়, এ এলাকাটি অন্ততপক্ষে হোসেন শাহি বংশের শেষ পর্যন্ত (৯৪৪ হি./১৫৩৮ খ্রি.) অত্যন্ত বর্ধিষ্ণু ছিল।

খান জাহান আলীর খলিফাতাবাদ

বাগেরহাটের অবস্থান ও এর পুরাতাত্ত্বিক গুরুত্ব বাংলার ইতিহাসে বেশ রহস্যাবৃত ছিল। বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত ষাট গম্বুজ মসজিদ ও খান জাহানের সমাধি (মৃত্যু ১৪৫৯) বাগেরহাটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রত্নস্থল। প্রাচীন ভৈরবের পাড়ে অবস্থিত এ শহরটি সম্ভবত গৌড় সুলতানদের একটি সীমান্ত চৌকি ছিল। পরবর্তী ইলিয়াস শাহি বংশের শাসনামলে (১৪৩৬-১৪৮৮) খান জাহান সম্ভবত স্থানীয় ও তার সঙ্গে আগত তুর্কি সৈন্যদের সমন্বয়ে এখান থেকে বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত রক্ষা করতেন। তখন এখানে সম্ভবত নৌ-সেনাদের আধিক্য ছিল। পুরাকীর্তিগুলোর সন্নিকটে ভৈরব নদের শুষ্ক খাত এখনও দেখা যায়। নদীটি পূর্ব দিকে এক মাইল সরে গেছে। বাগেরহাটের অন্যান্য পুরাকীর্তিগুলো হলো: চুনাখোলা মসজিদ, সিঙ্গার মসজিদ, বিবি বেগনি মসজিদ, রেজা খোদা মসজিদ, জিন্দা পীরের মাজার ও মসজিদ, সাবেক ডাঙাগার ইমারত ইত্যাদি। আহমদ হাসান দানি বলেন, ‘The buildings are more utilitarian as is clear from the stark plainness of the walls.’ কোনার বুরুজগুলোতে মোল্ডিং, দেয়াল গাত্রে প্যানেল নকশা, পোড়ামাটির অলংকরণ প্রভৃতি দেখা যায়। অন্যদিকে মোগল আমলের ইমারতগুলো পলেস্তারা-আবৃত। ষাট গম্বুজ মসজিদ (আনু. ১৪৫০) ও খান জাহানের কবর (১৪৫৯) বাংলার স্থাপত্য ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ষাট গম্বুজ মসজিদটি ঝিনাইদহ জেলার বারবাজারের সাতগাছিয়া ও মনোহর মসজিদ (পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ) দুটির দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত হয়েছে। বারবাজারের স্থাপত্য কারিগরিভাবে নিম্নমানের হলেও ষাট গম্বুজ মসজিদের স্থাপত্যশৈলী উন্নত মানের ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। সাতগাছিয়া ও মনোহর মসজিদের কোনার বুরুজগুলোর গোলাকৃতি এ দুটি ইমারতের প্রাচীনত্ব প্রমাণ করে। কেননা অষ্টভুজাকৃতির বুরুজগুলো গৌড়ের প্রভাব হিসেবে পরবর্তীকালে এতদঞ্চলে আমদানিকৃত হয়েছে।

সুলতানি আমলের সমাধি-শৈলি

সুলতানি আমলে অনেক সমাধি নির্মিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে মালদা জেলার হজরত পাণ্ডুয়ায় অবস্থিত একলাখি সমাধি (১৪২৫) অন্যতম। একলাখি সমাধি বাংলার স্থাপত্যকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছে। আহমদ হাসান দানি বলেন, ‘This building has rightly been regarded as setting the Bengali type once for all. The Eklakhi represents the true brick style of Bengal, with massive walls, octagonal corner towers, curved parapet, terracotta ornamentation, the wall surface variegated with offsets and recesses, and above all the numerous lines of mouldings. The glazed tiles are for the first time used in this building.’

খান জাহানের কবরের নিচে ভূগর্ভস্থ একটি কক্ষ রয়েছে। সেখানে আরবি লিপি, কোরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং আল্লাহর নাম রয়েছে। সমাধিকক্ষের অভ্যন্তরের মেঝে রঙিন টালি (glazed or encaustic tiles) দ্বারা আবৃত ছিল। বাংলার বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে আরো বহু প্রত্নস্থল ও ইমারত রয়েছে। এখানে সেগুলোর কয়েকটির নাম উল্লেখ করা যায়: মসজিদকুড় মসজিদ, খুলনা (পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী), কসবা আল্লাহর মসজিদ, বরিশাল (পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী), আরশনগর মসজিদ, খুলনা (ষোড়শ শতাব্দী), সিংদহ আউলিয়া মসজিদ, ঝিনাইদহ (ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্ধ), রোয়াইলবাড়ী মসজিদ, নেত্রকোনা (ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্ধ), উচাইল (শংকরপাশা) মসজিদ, হবিগঞ্জ (১৪৯৩-১৫১৯), বিবিচিনি মসজিদ, বরগুনা (ষোড়শ শতাব্দী), মসজিদবাড়ীয়া মসজিদ, পটুয়াখালী (১৪৬৫), শর্শদি মসজিদ, ফেনি (ষোড়শ শতাব্দী) ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে রোয়াইলবাড়ী প্রত্নকেন্দ্র সম্বন্ধে কয়েকটি কথা বলা যায়।

পনেরো গম্বুজবিশিষ্ট রোয়াইলবাড়ী মসজিদটি নেত্রকোনা জেলার (বৃহত্তর ময়মনসিংহ) কেন্দুয়া উপজেলাধীন রোয়াইলবাড়ী প্রত্নকেন্দ্রের দুর্গ এলাকায় অবস্থিত। এটি বর্তমানে শীর্ণধারা প্রাচীন বেতাই নদীর তীরে অবস্থিত। এটি বাগেরহাটের মতো একটি সীমান্ত চৌকি ছিল বলে ধারণা করা যায়। এ প্রত্নস্থলের বুরুজ ঢিবিতে রঙিন টালি পাওয়া গেছে। এটি সম্ভবত পঞ্চদশ শতাব্দীর একটি দুর্গ। এটির ইতিহাস হোসেন শাহি আমলের আগে নয় (১৪৯৩-১৫৩৮)। তবে পূর্ববর্তী সুলতানদের আমলেও এটি একটি জলদুর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।

সুলতানি স্থাপত্যে ইমারত নির্মাণের বৈশিষ্ট্য

সুলতানি আমলের ইমারতগুলো ইটের তৈরি ছিল এবং এগুলোতে প্রস্তর-স্তম্ভ ব্যবহৃত হয়েছিল। কোনো কোনো ইমারতের দেওয়ালের মধ্যবর্তী স্থানে ইট ব্যবহৃত হয়েছে এবং দেওয়ালের দুই পাশে প্রস্তর (stone veneers) ব্যবহৃত হয়েছে। গাঁথুনিতে কোথাও কোথাও কাদামাটি ব্যবহৃত হলেও প্রধান মসলা (mortar) ছিল চুন। পলেস্তারা হিসেবে চুন ব্যবহৃত হয়েছে। আহমদ হাসান দানি আরো বলেন, ‘However, it is the use of lime which fundamentally distinguished the brick masonry of the Muslim period from that of the pre-Muslim. Lime was known to the Hindus, and it was used by them for concreting the floor, as evident from the excavations at Mahasthan, but lime as mortar is hardly known to have been used in the pre-Muslim period. Lime has also been used as a plaster, especially on the parapet, roof and dome in order to make the building water-tight.’

সুলতানি ইমারতগুলোতে পোড়ামাটির নকশা ও রঙিন টালির ব্যবহার ছিল। মুসলমানরা এ দেশে অতি উন্নত মানের পাথর খোদাই শিল্প প্রবর্তন করে। এর নমুনা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদে দেখা যায়।

ইমারতগুলোতে সাধারণত খিলান-রীতি (arcuate system) ব্যবহৃত হলেও আদিনা মসজিদের জেনানা গ্যালারিতে সর্দল রীতি (trabeate system) ব্যবহৃত হয়েছে। ভারতের অন্যত্র কৌণিক খিলান ব্যবহারের পূর্বেই বাংলায় কৌণিক খিলান ব্যবহার শুরু হয়। পশ্চিম বাংলার আদিনা মসজিদে (১৩৭৪-৭৫) ও গৌড়ের গুনমন্ত মসজিদে (১৪৮৪-৮৫) ভল্ট ব্যবহৃত হয়েছিল। বাংলার দক্ষিণ এলাকার ইমারতগুলোর কোনার বুরুজগুলো পরবর্তী ইলিয়াস শাহি আমলে গোলাকার ছিল। তবে হোসেন শাহি আমলে এগুলোর আকার অষ্টভুজাকৃতির হয়। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, অষ্টভুজাকৃতির বুরুজগুলো গৌড়ের প্রভাব হিসেবে পরবর্তীকালে দক্ষিণ এলাকায় প্রবর্তিত হয় বলে ধারণা করা হয়। মিহরাবগুলোর আকৃতি সুলতানি আমলে অর্ধবৃত্তাকার ছিল। বক্র ছাদ কিনারা (curved cornice) অবিরাম বৃষ্টিপাতের কারণে গ্রাম্য কুঁড়েঘরের আকৃতি থেকে উদ্ভূত হয়েছে। দোচালা ও চৌচালা ছাদ এ আমলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ষাট গম্বুজ মসজিদের (আনু. ১৪৪০) চৌচালা ও ছোট সোনা মসজিদের (আনু. ১৫১০) চৌচালা একই আকৃতির নয়। তবে ম্যাককাচিয়ন (McCutchion) ভুলবশত এ দু’টি চৌচালা একই আকৃতির বলে উল্লেখ করেছেন। ছোট সোনা মসজিদের চৌচালা বক্র কিনারাযুক্ত পুরোপুরি চৌচালা আকৃতির, কিন্তু ষাট গম্বুজ মসজিদের চৌচালার চার দিকটাই ঢালু হয়ে সরাসরি ছাদে গিয়ে মিশেছে। ষাট গম্বুজ মসজিদেও চৌচালার উপরের দিকটা সমান (flat)। এ ধরনের স্থাপত্যরীতি বাংলার পরবর্তী স্থাপত্য ধারাকে, বিশেষ করে মন্দির স্থাপত্যকে, প্রভাবিত করেছে। দোচালা, চৌচালা, আটচালা এবং ষোলচালা বিশিষ্ট ইমারতের সন্ধান পাওয়া যায়। বাংলার সুলতানি ইমারতগুলোতে শিলালিপি সংযুক্ত ছিল। চতুর্দশ, পঞ্চদশ এবং ষোড়শ শতাব্দীতে এটি উৎকর্ষ লাভ করে। তুগরা লিপিশৈলী বাংলার লিপিকারদের (calligraphers) বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এটি মধ্য এশিয়া দ্বারা প্রভাবিত ও মিশরের সঙ্গে সাদৃশ্য বহন করে। মধ্য এশিয়ায় মঙ্গোল আক্রমণের কারণে সেখান থেকে বিতাড়িত হয়ে এ দেশে আগত ও স্থায়ীভাবে বসবাসরত শিল্পীদের হাতেই সম্ভবত এগুলো সম্পাদিত হয়েছে।

বাংলার সুলতানি আমলের স্থাপত্যে পৃথক বৈশিষ্ট্যের ছাপ স্পষ্ট। এ সময়ে দেশীয় ও বহির্দেশীয় বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে একটি চমৎকার মিশ্রণ তৈরি হয়। বাংলার প্রাক-মুসলিম স্থাপত্য যদিও কোনোভাবে নিম্নমানের ছিল না, তবুও সুলতানি আমলে বাংলার স্থাপত্য ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিকতা আসে এবং এ দেশে একটি নতুন রীতির প্রবর্তন হয়। পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা হারানোর পর বাংলা দিল্লির একটি প্রদেশে পরিণত হয়। মোগল আমলের স্থাপত্যে দিল্লির প্রতিফলিত হয়েছে।

লেখক : প্রত্নতত্ত্ববিদ, আর্ট হিস্টোরিয়ান ও গবেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন