আলবেনিয়ার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ইসমাইল কাদারেকে অভিহিত করা হতো বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপীয় সাহিত্যের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে । দীর্ঘ ৬০ বছরের সাহিত্যিক জীবনে ইসমাইল কাদারে উপন্যাসের পাশাপাশি কবিতা, প্রবন্ধ ও বেশ কিছু নাটক রচনা করেছেন। তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জেনারেল অব দ্য ডেড আর্মি’। এ উপন্যাস তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়।
ইসমাইল কাদারের জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৮ জানুয়ারি আলবেনিয়ার গিজিরোকাস্তার শহরে। মৃত্যুবরণ করেন ২০২৪ সালের ১ জুলাই ৮৮ বছর বয়সে। ইতিহাস ও ভাষাতত্ত্ব নিয়ে তিনি তিরানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। পরবর্তীকালে মস্কোর গোর্কি ইনস্টিটিউটে বিশ্বসাহিত্যে অধ্যয়ন করেন।
১৯৬০ সালে দেশে ফিরে তিনি সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করতে থাকেন। পাশাপাশি লেখা চালিয়ে যান। জীবনের বেশিরভাগ সময় আলবেনিয়ার কমিউনিস্ট স্বৈরশাসক এনভার হোজ্জার বিরুদ্ধে প্রতীকী লেখার মাধ্যমে তিনি সমসাময়িক সমাজচিত্র তুলে ধরেছেন। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় কমিউনিস্ট-শাসিত আলবেনিয়া ছেড়ে ফ্রান্সে চলে গিয়েছিলেন ইসমাইল কাদারে। ফ্রান্সের রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন। ১২ বছর পর ২০০২ সালে তিনি দেশে ফেরেন।
ইসমাইল কাদারে ২০০৫ সালে প্রথম ম্যান বুকার পুরস্কার পান। এছাড়া অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ইসমাইল কাদারের প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়। তার কবিতার সংকলন বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। কখনো তার সাহিত্যের তুলনা করা হয় নাজিব মাহফুজের সঙ্গে, কখনো নিকো কাজানসাকিস, কখনো বা ফ্রানৎস কাফকার সঙ্গে। যদিও তাঁর লেখায় পশ্চিমের তুলনায় প্রাচ্যের ভাববাদী রাজনৈতিক দর্শন বেশ প্রকট।
কাদারে নিজেই লিখেছিলেন তাঁর অন্যতম মাস্টারপিস ‘দ্য পিরামিড’ (১৯৯২) উপন্যাসে—“দীর্ঘকাল আমাদের ‘রুমেলিয়া’, অর্থাৎ স্লাভ দেশগুচ্ছ বা বলকান দেশগুলো ওসমানি শাসনের অন্তর্গত থাকায় বৃহত্তর ইউরোপের চাইতে নিকট প্রাচ্যের সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক সংযোগ বেশি ছিল। তাই হয়তো আমরাও এশিয়দের মতো করেই ভাবতে অভ্যেস করে ফেলেছি।’
ওসমানি শাসনে একত্র হওয়া বিভিন্ন বলকান জাতিগোষ্ঠীর এক বৃহদাংশের ইসলামিকরণ ঘটে যাওয়ায় খ্রিষ্টীয় ও ইসলামের প্রাচীন দ্বন্দ্বই মূলত একটি ভূখণ্ডের ইতিহাসের প্রধান উপজীব্য হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই মনে করেন, কাফকার ‘দ্য কাসল’-এর মতোই দুর্ভেদ্য চেতনার জাল বুনেছিলেন তিনি ‘দ্য পিরামিড’-এ। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর লেখায় প্রাচীন গ্রিস এবং সার্বিয়া-মাসিদোনিয়াসহ বলকান দেশগুলোর ইতিহাস, উপকথা ও পৌরাণিক অজস্র উপাখ্যান আধুনিক পৃথিবীর আয়নায় ধ্রুপদী ধরনেই প্রস্ফুটিত হয়েছে।

চারের দশকের পর থেকে বিশ্বসাহিত্যে যে আধুনিকতার জোয়ার আসে, পুরোনো গড়নেই চিত্রিত হতে শুরু করে বহুস্তরীয় ও সুসংগঠিত বহুমুখী চেতনা ও বিপন্নতা। সেই ধারার তিনি ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ। বাইজান্টাইন বা রোমান, তারপর ওসমানি অর্থাৎ ইসলাম, তারপর আরব-মহাবিদ্রোহের কারণে হাজার বছরের ঐতিহ্যশালী ওসমানি সাম্রাজ্যটির পতন ঘটলে সেই যে গৃহযুদ্ধের সূচনা ঘটল, মার্শাল জোসেফ ব্রোজ টিটোর সবল একত্রীকরণ বা য়ূগোস্লাভিয়ার গঠনেও তা শান্ত হয়নি। উপরন্তু একের পর এক গৃহযুদ্ধে দেশছাড়া হতে হয়েছে কখনো সার্বদের, কখনো বসনিয়ার মানুষকে। কখনোবা শুধু ‘গ্রিক’ না বলে ‘স্লাভ’ বলার অপরাধে স্লাভ-বলা গ্রিক এবং মাসিদোনিয়ার হাজার হাজার মানুষকে।
ইসমাইল কাদারের উপন্যাসে রয়েছে সেই খোঁজ বা আত্ম-অনুসন্ধান, যা বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের ঔপন্যাসিকদের রচনায় বহুলাংশে দেখা গেছে। মানচিত্রের বদল, সেইসঙ্গে মানুষের অস্তিত্বের বদল। নতুন দেশ, নতুন আত্মপরিচয়। শরণার্থী হয়ে আমেরিকা কিংবা অন্য কোথাও পাড়ি জমানো, একই সঙ্গে সেসব দেশে নিজের অস্তিত্বের নতুন একপ্রস্থ খোঁজ।
কাজান্তজাকিস তাঁর বিখ্যাত ‘জোরবা দ্য গ্রিক’ উপন্যাসে লিখেছিলেন, ‘কখনো রোমান, কখনো বা ওসমানীয়, লুট করে গেছে এই দেশ।’ আর কাদারে সরাসরি লিখছেন, ‘আমাদের প্রেম, সুধা, স্মৃতি, নারী রোমানদের ছিল। সোনা, রুপো, জহরত নিল ওসমানীয়রা, লড়াকু ছেলেদের নিল কমিউনিস্টরা আর বিপুল লৌহ আকরিক, খনিজ তেলের ভাণ্ডার সব নিয়ে নিচ্ছে সোভিয়েতরা। আমরা একটা পিরামিড ধরে রেখেছি এখনও, ভেতরটা যার ফাঁপা।’ (দ্য পিরামিড, ১৯৯২)।
তিনি দেখেছেন লৌহ-আকরিক বোঝাই মালগাড়ি ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে নব্যগঠিত য়ুগোস্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডের দিকে। সেখান থেকে অমূল্য সেই ধাতুসম্পদ একদিন পৌঁছুবে সোভিয়েত রাশিয়ায়। হাঙ্গারির মতো আলবেনিয়াও রাজনৈতিকভাবে বাধ্য ছিল দেশে উৎপাদিত প্রথম শ্রেণির খনিজ সম্পদ সোভিয়েত রাশিয়ার হাতে তুলে দিতে। বদলে সোভিয়েত শাসনধন্য কোনো একটি পূর্ব-ইউরোপীয় রাষ্ট্র থেকে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের খনিজ কিনতে।
ইসমাইল কাদারের লেখায় রাষ্ট্র আর রাজনীতি আমাদের চোখে ধরা পড়ে ইউরোপীয় আলো আর প্রাচ্যের শরীরে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বেড়ে ওঠা আর বারবার দেশান্তরিত হওয়ার ভেতরে নিজেকে খুঁজতে খুঁজতে কাদারে তৈরি হয়েছেন। ‘দ্য পিরামিড’ কেবল পিরামিড প্রকল্পের অপরিসীম দুর্ভোগ এবং অযৌক্তিকতাকে তুলে ধরে না, একই সঙ্গে সাধারণকে নিয়ন্ত্রণ ও নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে আমাদের সামনে রূপক হয়ে দাঁড়ায়। শাসকের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও স্বৈরাচারের প্রতীক হিসেবে স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে মানুষের প্রচেষ্টার অসারতা দেখায়।
সাহিত্যকর্ম আর তার পেছনে কাদারের ভাবনা ও দর্শন সরলীকরণ করে দেখার সুযোগ নেই। কাদারের সাহিত্যজীবন শুরু হয়েছিল কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে। কবিতা লিখে স্বদেশে ব্যাপক পরিচিতিও পেয়েছিলেন। কবিতার কারণেই প্রেমের প্রস্তাব পেয়েছিলেন, যিনি পরে তার স্ত্রী হন। কিন্তু সে কবিতা কেবল সৌন্দর্য নির্মাণের জন্য নয়। তার কবিতা সবসময়ই আলবেনিয়া ও বলকান অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটকে গভীরভাবে প্রতিফলিত করেছে। উপন্যাস কিংবা কবিতা, সবখানেই সেই আলবেনিয়া। পাহাড়ে ঘেরা দেশ হাওয়ার কারণেই হয়তো তার সাহিত্যে পাহাড় এসেছে হাজারভাবে। উপন্যাসের মতোই কাদারের কবিতাও তার রাজনৈতিক ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। ইসমাইল কাদারে ছিলেন স্রোতের বিপরীতে চলা এক স্বতন্ত্র সাহিত্যিক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

