হালখাতা

হাসান ইনাম

হালখাতা

কড়ই গাছের ফাঁক গলে রোদ এসে পড়েছে মাটির রাস্তার ওপর। রাস্তা ধরে একটু এগোলেই স্কুল মাঠের দক্ষিণ পাশে কয়েকটি দোকান নিয়ে গড়ে উঠেছে ছোট একটি বাজার। এই বাজারের নাম ‘বাংলা বাজার’। নামের পেছনে অন্যরকম একটি গল্প আছে অবশ্য। পূর্বদিকের মানুষরা কাজ করতে বিদেশে যায় অনেকে, এক গ্রাম থেকেই দশ-বারোজন যায় ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের একই দেশে, তারপর ওই গ্রামের বাজারের নাম হয়ে যায় সেই দেশের নামে। এই গ্রামের কেউ বিদেশ থাকে না, তাই স্কুল মাঠের কোণে নতুন করে কিছু দোকান যখন বসল—মুরব্বিরা আক্ষেপ করেই জায়গাটার নাম দিল ‘বাংলাদেশ বাজার’। তবে ‘দেশ’ বেশিদিন টিকল না। লোকমুখে ঘুরতে ঘুরতে তুলনামূলক সহজ উচ্চারণ হিসেবে ‘বাংলা বাজার’ নামেই সবাই ডাকে এখন।

এ বাজারের সব থেকে চালু দোকানটি ইউনূস মিয়ার। নতুন বছরের আজকে প্রথম দিন। সকাল সকাল দোকান খুলে বসেছে সে, গতকাল রাত জেগে সাজানো হয়েছে দোকান। একটু পরই গরম জিলাপি আর বাতাসা এসে পৌঁছুবে।

বিজ্ঞাপন

লাল কাপড়ে মোড়ানো নতুন খাতাগুলো সামনে নিয়ে বসে ইউনূস মিয়া। রঙচটা পুরোনো খাতাগুলোও পাশে রাখে। একটু বেলা বাড়লেই তার খদ্দেররা আসা শুরু করবে। পুরোনো হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতায় হিসাব খুলবে। গত বছর বকেয়া একটু বেশিই জমেছে। শহরে গণ্ডগোল লাগে আর বকেয়া বাড়ে ইউনূসের দোকানে। তবে তার বান্ধা কাস্টমার যারা আছেন, তারা কোনো সময় টাকা মেরে দেয়নি—এটাই স্বস্তি।

হালখাতার দিনে এ বাজারের আলাদা এক রেওয়াজ আছে। সকালে দোকান খোলার আগে ইউনূস মিয়া খাতার ওপর হালকা করে আতর ছিটিয়ে দেয়; গন্ধটা যেন নতুন শুরুর মতো লাগে। তারপর লাল কাপড় সরিয়ে প্রথম পাতায় লেখে ‘বিসমিল্লাহ’। দোকানের সামনে ছোট্ট করে একটা জায়গা পরিষ্কার করে ইউনূস মিয়া। খদ্দেররা এলে প্রথমেই একটু মিষ্টিমুখ করাবে সে। অনেকে পুরো বকেয়া টাকাটা আজ দিতে না পারলেও আজকের দিনে অন্তত কিছুটা শোধ করবে বলেই তার বিশ্বাস। বাতাসা আর জিলাপি নিয়ে আসে দোকানের একমাত্র কর্মচারী শফিকুল।

ইউনূসের দোকানে প্রথম খদ্দের আসে উত্তরপাড়ার সরকার বাড়ির জমিরুদ্দিন সরকার। ইউনূস মিয়া দোকান থেকে বের হয়ে তাকে স্বাগত জানায়, শতবর্ষী জমিরুদ্দিন সরকার লাঠি ভর দিয়ে ঠক ঠক করে এগিয়ে আসে। ইউনূস মিয়া তাকে দোকানের সামনের বেঞ্চিতে বসতে সাহায্য করে। সরকার বাড়ির ছেলেরা ঢাকায় থাকে, বড় চাকরি করে। হিসাবের খাতাটা খোলে ইউনূস মিয়া, বেশ ভালো টাকাই বকেয়া জমেছে বুড়ো জমিরুদ্দিনের নামের পাশে।

Ñদাদা, আপনের নামে তো অনেক টাকা জমছে, টাকা কি আইজকা দিবেন নাকি পোলারা ঈদের সময় আইলে দিবেন? হিসাবের খাতাটা জমিরুদ্দিনের দিকে ঘোরাতে ঘোরাতে বলে ইউনূস মিয়া।

বুড়ো পকেট থেকে দলা করা কিছু নোট বের করেন। এক পলক দেখেই ইউনূস মিয়া বুঝতে পারে এখানে পাওনা টাকার তিন ভাগের এক ভাগও নেই। তবু হাসি হাসি মুখ করে টাকাটা হাতে নেয় সে।

Ñপোলারা মনে হয় এই ঈদেও আইবো নারে, অনেক ব্যস্ত অহন। তয় চিন্তা নিস না ইউনূস, আমি তোর টেকা শোধ কইরা দিমু।

জমিরুদ্দিনের কথা শুনে ইউনূস মিয়া জিহ্বা কাটে, যেন খুব অপরাধের কথা শুনে ফেলেছে সে।

Ñআরে দাদা, আপনে চিন্তা করেন কেন, পোলারা আইলে হেরাই শোধ কইরা দিবো, ঈদে আহুক আর পরে। গেলোবারে তো বকেয়া শোধ কইরা আরো দুই হাজার বাড়তি দিয়া গেছিলো। জিলাপির পাত্র সামনে এগিয়ে দিয়ে বলে ইউনূস মিয়া।

জমিরুদ্দিনের ছেলেরা প্রতি বছর টাকা শোধ করার সময় বলেÑপুরা বছর মনে হয় খাইতে পারবে না, এর আগেই মইরা যাবে। তবে কয়েক বছর যাবৎ সন্তানদের কথা মিথ্যা প্রমাণ করতেই যেন বছরজুড়ে বাকি খেয়ে এই হালখাতার দিনে এসে হাজির হন জমিরুদ্দিন।

বুড় গরম জিলাপি নেওয়ার বদলে নতুন সদাই নিয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে ঠকঠক করে চলে যান নিজের বাড়ির দিকে।

বেলা একটু বাড়তেই খদ্দেরদের ভিড় বাড়তে থাকে দোকানে। শফিকুল আর ইউনূস মিয়া হিমশিম খায় খদ্দের সামলাতে। দোকানের ক্যাশে জমা হতে থাকে নানা অঙ্কের নোট, পুরোনো খাতায় লাল কালির দাগ বাড়তে থাকে। নতুন খাতায় উঠতে থাকে পুরোনো খদ্দেরদের নাম।

এত খদ্দেরের ভেতর শুক্কুর আলীকে আলাদা করে চোখে পড়ে ইউনূস মিয়ার। গত কয়েক বছর হালখাতার দিনে আসেই নাই এই লোক, গ্রামেও থাকতে পারত না মামলা-মোকদ্দমার ভয়ে। গ্রামে থাকা বউ-সন্তানের জন্য বাকি চালাত ইউনূস মিয়ার দোকানে। গোপনে গোপনে নানা বেশে গ্রামে ঢুকে বউ-সন্তানের সঙ্গে দেখা করেই চলে যেত সে। শুক্কুর আলির ছেলে জীর্ণ-শীর্ণ কিছু নোট নিয়ে দোকানে এলেই ইউনূস মিয়া বুঝতে পারত শুক্কুর আলী গ্রামে এসেছিল। কাদের গণির চ্যালারা নানা সময় এসে বাকির খাতা চেক করত, শুক্কু্র আলীর নামের পাশে টাকার অঙ্ক বাড়তে দেখলে তারা আর কিছু বলত না। কোনো মাসে যদি দেখত টাকার অঙ্ক কমেছে, তখন চিল্লাপাল্লা শুরু করত। শুক্কুর গ্রামে আসছে জানার পরও কেন কাদের গণিরে জানানো হয়নি। ইউনূস মিয়া এসব মামলা-মোকদ্দমার ভেতরে কখনই যায়নি। আর এ গ্রামে কাদের গণির চ্যালাদের সঙ্গে ঝামেলা করা মানেই গ্রামছাড়া হও‍য়া, তাই ইউনূস মিয়ার কাছে সবাই সমান, সবাই খদ্দের। তার কাজ বাকি দেওয়া আর হাসি হাসি মুখ করে সবার কাছ থেকে টাকা আদায় করা। কেউ যদি টাকা শোধ না করে, তাহলে কীভাবে টাকা আদায় করতে হয়Ñসেই পদ্ধতিও জানা আছে তার। তবে একান্ত বাধ্য না হলে সেই চেহারাটা কাউকে দেখাতে চায় না ইউনূস মিয়া।

Ñইউনূস, তোমার সব টেকাই আইজকা শোধ কইরা দিমু। পকেট থেকে টাকার বান্ডেল বের করে বলেন শুক্কুর আলি।

ভদ্রতাবশত টাকার দিকে না তাকিয়ে ইউনূস মিয়া বলে, Ñআরে শুক্কুর ভাই, আপনে এত বছর পর আইছেন, এইডাই তো আমার লাইগা মহা আনন্দ, টেকা-পয়সা তো আই-যাইব। বহেন, বহেন, গরম জিলাপি খান।

দোকানের বাকি খদ্দেররা মনে করতে থাকে কাদের গণির কথা। গত বছর কাদের গণি যখন টাকার বান্ডেল বের করেছিল, ঠিক তখনও এ কথাগুলোই বলেছিল ইউনূস মিয়া। শুক্কুর আলি আর কাদের গণিকে একইরকম মনে হতে থাকে সবার, হয়তো ইউনূস মিয়ারও। এজন্য ইউনূস মিয়া শুক্কুর আলীর টাকার দিকে আর তাকায় না, সে জানে কোনো টাকা না দিয়েই শুক্কুর আলী চলে যাবে কেবল জিলাপি খেয়েই।

কাদের গণির চ্যালারা নিয়ম করে বাকি নিত ইউনূস মিয়ার দোকান থেকে। হালখাতার দিন এসে জিলাপি-বাতাসা খেয়ে যেত কিন্তু টাকা শোধের কথা মুখেও আনত না। কাদের গণির কাছে বারকয়েক বিচার দিয়েও কোনো লাভ হয়নি, অনাচারের মাত্রা যেন বেড়েছে আরো।

শহরে গণ্ডগোল লাগার পর শুক্কুর আলীর মামলায় কাদের গণিরে যেদিন থানার দারোগা ধরতে আসছিল, সেদিন কাদের গণি হাঁপাতে হাঁপাতে আসছিল ইউনূস মিয়ার দোকানে একটু আশ্রয়ের জন্য। ইউনূস মিয়া কেবল আশ্রয় নয়, নিরাপদে কাদের গণিকে গ্রাম থেকে বেরও করে দিয়েছিল; তবে এর আগে কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নিয়েছিল নিজের পাওনা টাকা।

বেলা শেষ হয়ে আসে, খদ্দেরও কমে যায়। ইউনূস মিয়া দেখে চার-পাঁচটা হিসাব এখনও অধরা। রাসেল, কামরুল, রাতুল, মোরশেদ কিংবা ফয়সালÑএরা কেউ আসেনি। ইউনূস মিয়ার মনে পড়ে, কাদের গণির চ্যালাদের অত্যাচারে এরা গ্রামছাড়া হয়েছিল অনেক বছর আগে, শুক্কুর আলীর সময়কালেও ফিরে আসেনি। শহরের গণ্ডগোলের সময় ওরা সম্ভবত রাস্তায় নেমেছিল, হয়তো ওরা কেউ বেঁচে নেই আর…

দীর্ঘশ্বাস ফেলে হিসাবের খাতা বন্ধ করে ইউনূস মিয়া। কিছু নাম এ বছর অন্তত নতুন খাতায় তুলতে পারবে ভেবেছিল সে। কিন্তু মৃত মানুষদের হয়ে কেউ খাতা খুলতে আসে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন