বিবি হাজেরা: সব নারী-পুরুষের আদর্শ

উম্মেহানি বিনতে আবদুর রহমান

বিবি হাজেরা: সব নারী-পুরুষের আদর্শ

মানব ইতিহাসে কিছু জীবন আছে, যা অনন্ত আলোর উৎস হয়ে যুগে যুগে মানুষের অন্তরে সাহস জাগায়, বিপদের ঘোর আঁধারে পথ দেখায় এবং বিশ্বাসকে করে অটল। সেই আলোকিত জীবনসমূহ কোরআন-হাদিস বর্ণনা করে পৃথিবীর মরীচিকায় আটকে থাকা আমাদের হৃদয়ের ব্যথা উপশম করে। এই আলোকিত নামগুলোর একটি অন্যতম উজ্জ্বল নাম হাজেরা আলাইহিস সালাম। তিনি তাওয়াক্কুলের এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি, ধৈর্যের এক অবিনশ্বর প্রতীক এবং মাতৃত্বের এক মহিমান্বিত উদাহরণ।

মরুভূমির নীরবতায় অনন্ত ঈমানি যাত্রা

বিজ্ঞাপন

আল্লাহ তাআলার নির্দেশে ইবরাহিম (আ.) যখন স্ত্রী হাজেরা এবং শিশুপুত্র ইসমাঈলকে মক্কার জনমানবহীন, অনুর্বর উপত্যকায় রেখে যাচ্ছিলেন, তখন সেটি ছিল এক মহান ঈমানি পরীক্ষার সূচনা। পবিত্র কোরআনে এ ঘটনার গভীর তাৎপর্য ফুটে ওঠে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দোয়ার মাধ্যমে—‘হে আমাদের রব, নিশ্চয় আমি আমার কিছু বংশধরকে ফসলহীন উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের কাছে বসতি স্থাপন করালাম, হে আমাদের রব, যাতে তারা সালাত কায়েম করে। সুতরাং কিছু মানুষের হৃদয় আপনি তাদের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন এবং তাদের রিজক প্রদান করুন ফল-ফলাদি থেকে, আশা করা যায় তারা শুকরিয়া আদায় করবে’। (সুরা ইবরাহিম : ৩৭)

চারদিকে শুধু উত্তপ্ত বালু, নেই কোনো পানি, নেই খাদ্য, নেই কোনো মানুষের চিহ্ন। এমন কঠিন পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে একজন নারী স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়বে। কিন্তু হাজেরা (আ.) ভেঙে পড়েননি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন— ‘এটি কি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ?’ ইবরাহিম (আ.) সম্মতি জানালে তিনি বললেন, তাহলে আল্লাহ আমাদের কখনোই ছেড়ে যাবেন না।

কত শান্ত কণ্ঠে তিনি বললেন। তার কথায় কোনো ভীতি নেই, কোনো অভিযোগ নেই, কোনো সংশয় নেই ; আছে কেবল নিঃশর্ত বিশ্বাস, নির্ভরতা এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা।

নিঃসঙ্গতার প্রান্তে আল্লাহ-ভরসার দীপ্ত আলো

মক্কার অনুর্বর ভূমিতে এখন একজন মা, যার নাম হাজেরা, সঙ্গে ছোট্ট শিশু সন্তান, যার নাম ইসমাঈল। ইবরাহিম (আ.) চলে যাওয়ার পর শুরু হয় প্রকৃত পরীক্ষা। দিন গড়ায়, পানি ফুরিয়ে আসে, খাদ্য শেষ হয়ে যায়। চারপাশের নিস্তব্ধতা আরো ভারী হয়ে ওঠে। একদিকে নিঃসঙ্গতা, অন্যদিকে মাতৃত্বের টান—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে হাজেরা (আ.) ছিলেন অবিচল। তার হৃদয় ভেঙেচুড়ে যাচ্ছিল কিন্তু ঈমান অটুট ছিল।

তিনি আল্লাহর ওপর নির্ভর করে নিজেকে শক্ত রেখেছিলেন। তিনি জানতেন, যিনি এই পরীক্ষায় ফেলেছেন, তিনিই এর সমাধানও দেবেন।

মাতৃত্বের আর্তনাদ ও সাফা-মারওয়ার দৌড়

যখন শিশু ইসমাঈল তৃষ্ণায় কাতর হয়ে উঠলেন, তার কান্না বিদীর্ণ করছিল মায়ের অন্তর। এই মুহূর্তে হাজেরা (আ.) করণীয় স্থির করতে পারলেন না। তিনি ছুটে গেলেন সাফা পাহাড়ে, দূর থেকে কোনো মানুষের চিহ্ন খুঁজতে। তিনি কিছুই দেখতে পেলেন না। তারপর ছুটলেন মারওয়া পাহাড়ে। আবার ফিরে এলেন সাফায়। এভাবে সাতবার দৌড়ালেন। এই দৌড় ছিল বিশ্বাসের এক অনন্য প্রকাশ। প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল আশা, প্রতিটি শ্বাসে ছিল কামনা, প্রতিটি দৃষ্টিতে ছিল আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা। আল্লাহ তাআলা এ ঘটনাকে এমন মর্যাদা দিয়েছেন যে, তা হয়ে গেছে হজ ও উমরাহর অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা বাকারা : ১৫৮) আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘এ কারণেই মানুষ সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করে।’ (সহি বুখারি : ৩৩৬৪)

এভাবেই রাব্বুল আলামিন একজন মায়ের সংগ্রামকে সমগ্র উম্মাহর জন্য ইবাদতের অংশ করে দিয়েছেন এবং তাকে মানব ইতিহাসে অতুলনীয় সম্মান দান করেছেন।

জমজম সেই রহমতের অবিনশ্বর উৎস

জমজম তীব্র পিপাসায় অমিয় ধারা, জমজম সুপেয় প্রশান্তির আবেশ। যখন সব প্রচেষ্টা শেষ হয়, যখন কোনো উপায় অবশিষ্ট থাকে না, তখন আল্লাহ তাআলার রহমত নেমে আসে।

হাদিসে এসছে, অতঃপর হাজেরা যখন মারওয়া পাহাড়ে উঠলেন, তখন একটি শব্দ শুনতে পেলেন এবং তিনি নিজেকেই নিজে বললেন, একটু অপেক্ষা করো। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তখন তিনি বললেন, তুমি তো তোমার শব্দ শুনিয়েছো। যদি তোমার কাছে কোনো সাহায্যকারী থাকে!

‘হঠাৎ যেখানে জমজম কূপ অবস্থিত, সেখানে তিনি একজন ফেরেশতা দেখতে পেলেন। সেই ফেরেশতা (জিবরিল) পায়ের গোড়ালি বা ডানা দিয়ে আঘাত করলেন। ফলে পানি বের হতে শুরু করলো। তখন হাজেরা চারপাশে নিজ হাতে বাঁধ দিয়ে হাউসের মতো করে দিলেন এবং হাতের কোষ দিয়ে মশকে পানি ভরতে লাগলেন। তখনও পানি উপচে উঠছিল। এরপর হাজেরা (আ.) পানি পান করলেন, শিশুপুত্রকেও দুধ পান করালেন। (সহিহ বুখারি- ৩৩৬৪ ও ৩৩৬৫)

আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে, জমজম কূপ ইসমাঈল (আ.) এর পায়ের গোড়ালির আঘাতে সৃষ্টি হয়েছে। অথচ সহিহ বুখারির হাদিসে এ অন্য বক্তব্য রয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, জমজম কূপ জিবরিলের পায়ের গোড়ালি অথবা ডানার আঘাতে সৃষ্ট। সুতরাং মানুষের প্রচলিত বিশ্বাসটির ভিত্তি নেই।

অপচয় রোধে হাজেরা (আ.) দ্রুত পানি আটকে রাখতে চেষ্টা করেন। তার এই সচেতনতা ও প্রচেষ্টাও ছিল এক অনন্য দৃষ্টান্ত, এই অসীম কাজটি আমাদের জন্য অপচয় রোধের মানসিকতা এবং যেকোনো কাজ সুচারুভাবে করার প্রতিই ইঙ্গিত করে ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ ইসমাঈলের মায়ের প্রতি রহম করুন! যদি তিনি জমজমকে এভাবে আটকে না রাখতেন, তাহলে তা একটি প্রবহমান নদী হয়ে যেত।’ (সহি বুখারি : ৩৩৬২)

জমজমের এই মিষ্টি পানীয় মূলত তাওয়াক্কুলের প্রতিদান, ধৈর্যের ফল এবং আল্লাহর অশেষ করুণার প্রতীক।

হাজেরা (আ.) এর জীবন আমাদের শেখায়

ক. ধৈর্য মানে নীরবে সহ্য করা নয়; বরং প্রতিটি কষ্টের মাঝেও আশার আলো জ্বালিয়ে রাখা। আল্লাহর কাছে বিনীতভাবে বারবার সাহায্য চাইতে থাকা ৷

খ. সংকট মানে শেষ নয়; বরং নতুন সম্ভাবনার সূচনা। এবং ঈমান মানে তা কর্মে, সিদ্ধান্তে এবং আচরণে প্রতিফলিত হওয়া।

একজন নারী যখন সমগ্র মানবতার আদর্শ

হাজেরা (আ.) কেবল নারীদের জন্য আদর্শ—এমনটি বলা মানে তার মর্যাদাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা। তিনি এমন এক আদর্শ, যিনি পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

একজন পুরুষ শক্তিশালী হতে পারেন, কিন্তু প্রকৃত দৃঢ়তা আসে অন্তরের ঈমান থেকে। হাজেরা (আ.) সেই ঈমানের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

যিনি দেখিয়েছেন—বিপদের মুখে ভেঙে না পড়ে আল্লাহ তাআলার ওপর নির্ভর করা, দায়িত্ব থেকে পিছু না হটা, নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। এসব গুণই একজন প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। হাজেরা (আ.) এর ঘটনা থেকে সংকট, ধৈর্য ও ঈমানের সমন্বিত শিক্ষা গ্রহণ করা ভীষণ জরুরি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...