২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর কানাডার টরন্টোতে ইন্তেকাল করেন কবি আসাদ চৌধুরী। এর দশ বছর আগে ২০২৩ সালে এই সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন রোকন রাইয়ান ও আব্দুল্লাহ সিদ্দিক। আজ ছাপা হলো সেই সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ।
মানুষের সঙ্গে কবিতার সম্পর্ক কেমন?
আসাদ চৌধুরী : কবিতা মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করে। যে কবিতা লেখে তার কবিতায় স্বাভাবিকভাবেই নিজস্ব ভাবনা-চিন্তার প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু আমি যদি আমার অভিজ্ঞতা, আমার পরিস্থিতি, পরিবেশের বর্ণনা সুন্দর করে বলতে ও গুছিয়ে উপস্থাপন করতে পারি, একজন মানুষ সেখান থেকে কিছু শিখতে পারবে, জানতে পারবে। আবার আমি যদি কোনো সৌন্দর্য অনুসন্ধান করে অর্জন করি, কোনো বস্তুকে ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড় করাতে পারি, তাহলে সমাজ আরো এক পা এগিয়ে যাবে। জার্মান এক কবি বলেছিলেন, মানুষ যেটা স্বপ্ন দেখে, তা সে অর্জন করতে পারে। মানুষ হাজারো স্বপ্ন দেখে। কিন্তু আমাদের দুঃখ—মানুষ এখনো চরিত্রহীন, দুর্বৃত্ত ও নিষ্ঠুর ক্ষমতালোভীদের বাদ দিয়ে পৃথিবী তৈরি করতে পারেনি। প্রাণপণে পৃথিবীর সব জঞ্জাল মাড়িয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। কিন্তু জঞ্জালগুলো ক্রমে বাড়তে বাড়তে পাহাড়সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাহলে পৃথিবীতে কবিতার ভূমিকা কী?
আসাদ চৌধুরী : রবীন্দ্রনাথ সুন্দর করে বলেছিলেন, যুদ্ধের জন্য সৈনিকের প্রয়োজন, কিন্তু সৈনিককে প্রেরণা দেবে কে? এজন্যই কবিতা। এখানেই কবিতার প্রয়োজন। কবিতা সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়। কবি সত্যকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। আমাদের রাজনৈতিক প্রভাব ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এ ক্ষেত্রে সবসময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কবিতা এসবকে দূর করে। তখন সমাজ এগিয়ে যেতে পারে। এখানেই কবিতার সার্থকতা। কবিতা একজন হতাশ মানুষকে ভরসা দেয়। বন্ধুর কাঁধে হাত রাখতে সহায়তা করে। কখনো সহানুভূতি জানায়। কখনো অনুপ্রাণিত করে।
মানুষ নিজেকে খুঁড়ে খুঁড়ে দেখতে চায়, নিজেকে আবিষ্কার করতে চায়। কবিতা তাকে এখানে সহায়তা করে। মানুষ কবিতার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করে এবং কবির মাধ্যমে আমরাও নিজেদের চিনতে পারি। যেমন কবি বলেছেন, ‘শিহরিলো দেবদারু বন।’ এখানে দেবদারু বন কাঁপে না, কাঁপি আমি; কিন্তু আমার মনে হয় দেবদারু বনই কাঁপছে। এভাবে প্রকৃতির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক তৈরি করে মানুষ নিজেকে খুঁজে পেতে চায়।
অন্তর্নিহিত দার্শনিক ভাষ্য ছাড়া কবিতা কি চিরায়ত হয়ে উঠতে পারে?
আসাদ চৌধুরী : এই ভবিষ্যদ্বাণী করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। গ্রিক ট্র্যাজেডিতে বলা হয়েছে, কোনো সৎ বংশ, সুদর্শন, সচ্চরিত্র ও শিক্ষিত লোকের যখন পতন হয়, মানুষ তখন কষ্ট পায়। এভাবেই ট্র্যাজেডি রচিত হয়। চার্লি চ্যাপলিন দেখালেন—কীভাবে হাসতে হাসতে গভীর সত্য কথাটা বলে ফেলা যায়। প্রকৃতপক্ষে সবসময় বিবেককে ফাঁকি দিচ্ছে মানুষ। এগুলো চোখে আঙুল দিয়ে ধরাতে পারে সাহিত্য। নাটক-উপন্যাস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
দর্শন নির্ভর করে তার পারিপার্শ্বিক পরিপ্রেক্ষিতের ওপর। যে মানুষ কৃষিসভ্যতার সঙ্গে যুক্ত, তার দর্শন একধরনের; যে মানুষ নগর সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত, তার দর্শন আরেক ধরনের। প্রত্যেকেরই আলাদা দর্শন আছে। আধ্যাত্মিকতা আছে তার মধ্যে। সুফিবাদ আছে, বৈষ্ণববাদ আছে। এগুলো আমাদের চিন্তাকে আলোকিত করে। ভাবনাকে আলোকিত করে। আমাদের সৌন্দর্যকে আলোড়িত করে। তাছাড়া সাহিত্য টিকে যাবে কি যাবে না, তা সত্য বলা সম্ভব নয়। কারণ গ্রিক ট্র্যাজেডি যখন হয়—আমি যার দৃষ্টান্ত দিয়েছিলাম, সেই চ্যাপলিনের দৃষ্টান্ত তখন অচল। আগে ছিল রিলিজিয়ন, পলিটিক্স—এগুলো খুব জনপ্রিয় শব্দ। এখন আবার জনপ্রিয় ভায়োলেন্স। এগুলো হচ্ছে একধরনের অবদমনের প্রক্রিয়া।
এর মধ্যেও মানুষ মোটামুটি সত্যের কাছাকাছি থাকতে চায়। আমি সত্য স্পর্শ করেছি। সত্যের কাছাকাছি থাকতে পারলেও মনে করি, আমি কিছুটা হলেও এগিয়ে এসেছি। আল মাহমুদের একটি কবিতায় আছে—‘কত দূর এগুলো মানুষ।’ প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের লেখা লাইনটি। এখন আমাকে যদি বলা হয়, আমি মাহমুদকে অনুরোধ করব—আপনি লিখুন ‘কত দূর পিছাল মানুষ?’ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বলা সোজা ছিল যে, আমি শোষিতের পক্ষে আছি। কিন্তু এখন আমরা কোন শোষিতের পক্ষে আছি? শোষকই বা কে? এখন আমার নিজেকেই প্রশ্ন করতে হয়। আমি কি শোষকের সঙ্গে আছি, না শোষিতের সঙ্গে আছি। বিবেকের কাছে প্রশ্ন করতে হয়। বিবেকের কাছে প্রশ্ন করতে গেলে শিক্ষাও একটা জরুরি ব্যাপার। আমরা পাশ্চাত্য শিক্ষায় অভ্যস্ত। অথচ আমরা ভাত খাচ্ছি। আমরা আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিতে বড় হচ্ছি। এই প্রভাবটা কিন্তু কম নয়। আমরা কি এ সবকিছু মেলাতে পারছি? মেলাতে তো পারছি না। ‘মেলাবেন তিনি মেলাবেন, ঝড়ো হাওয়া আর খড়কুটোটাকে তিনি মেলাবেন।’ এটা তো কবিতায় আশা করতে পারি। কিন্তু বাস্তব জীবনে কতটুকু পারব আমরা?
মানুষে মানুষে যে বিচ্ছিন্নতা ও পরস্পরদ্বন্দ্ব, তা কি দর্শন বা মতবাদের বিভিন্নতার কারণে?
আসাদ চৌধুরী : এটা আপেক্ষিক ব্যাপার। এ নিয়ে তর্ক করতে গেলে অনেক কথা বলা যাবে; কিন্তু কোনো সদুত্তর পাওয়া যাবে না। দর্শন মানুষের চিন্তা-চেতনা ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলছে। কোনো দর্শনই মানুষকে স্থিতি দিতে পারছে না। তাহলে মতবাদ তো সেই আল কোরআন।
হিন্দু ধর্মের তো কোনো বাবা-মা নেই। সেখানে কত মতাদর্শ চিন্তা করা যায় না। খ্রিষ্ট ধর্মও অনুরূপ। ইহুদিরা সংরক্ষণবাদী। তাই তারা বিকশিতও হয়নি। তারা তাদের ধর্ম প্রচার করে না। তাদের মধ্যকার কোনো বিরোধ কেউ জনসম্মুখে উদ্ঘাটন করতে পারবে না।
উত্তরাধুনিক কবিতা বলতে যা বোঝায়, সেটাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?
আসাদ চৌধুরী : ইদানীং এই শব্দগুলো চালু হচ্ছে। আধুনিক সময় বলে একটা সময় অতিবাহিত হয়েছে—প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ। আমাদের যুগকে আধুনিক যুগ ধরা হয়েছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন ক্ষমতার দখল নিয়েছে, আমাদের এখানে যখন শ্রীভদ্র ও অতীশ দীপংকর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন, তখন আমাদের মুসলমানের মধ্যে একটা শিল্প উন্নয়ন লাভ করেছিল। তখন আধুনিক যুগ কেন হবে না? তবুও আমরা মেনে নিয়েছি, পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত সে যুগটাকে আমরা আধুনিক যুগ বলব। এখন আধুনিক যুগ শেষ হয়ে গেছে। কেউ মনে করে, তাহলে আধুনিক-পরবর্তী যুগ হবে উত্তরাধুনিক যুগ। এখন পর্যন্ত উত্তরাধুনিক শব্দের খুব ভালো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করি না। আমরা বিশ্বায়নের যুগে বাস করছি। বিশ্বায়নের যুগকে দার্শনিকভাবে উন্নতির জন্য কেউ যদি বলে উত্তরাধুনিক, আপত্তি করব না। বুদ্ধদেব বসু থেকে এখনকার কবিরা একটু আধুনিক। উত্তরাধুনিক বলতে এখন আরো একটি ধারা এসে গেছে। তারা বলছে, স্থানীয় যে সংস্কৃতি প্রচলিত আছে, তা সাহিত্যে নিয়ে আসতে হবে। তাহলে এটা কি উত্তরাধুনিকতা? আমার সন্দেহ আছে। উত্তরাধুনিকতা বলতে কতগুলো চরিত্র দাঁড় করানোর চেষ্টা দেখি। কবিতায় কোনো গল্প চলবে না। কবিতায় কোনো উপদেশ চলবে না। এগুলো কেউ কোনোদিন বলেনি। কোনো কবি এ ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করেন না। আর কবিরা একেবারে বাঁধা-ধরা নিয়ম মানতে পারেন না। যেখানে বাধা পাবেন, সেখানে ফুঁসে উঠবেন, আঘাত করবেন। পদ্য আর কবিতা একালে যাই হোক না কেন, এখন গীতিকবিতা কিছুটা পরিষ্কার হয়ে এসেছে।
গীতিকবিতা এখন কবিরা লিখতে চান না। তবে যোগ্যতারও প্রশ্ন আছে। আমার মনে হয়, এখন তরুণরা অনেক সুন্দর কবিতা লিখছে। আমাদের সময়ে কারো দশটা কবিতা যদি কোনো ভালো কাগজে ছাপা হতো, দেশের লোক মনে করত—এই লোকটা তো বড় কবি। এখন এত পত্রপত্রিকা, প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া—এতসবের পরেও ভালো একটা লেখা চোখে পড়া সত্যিই খুব কঠিন। ভালো লেখা শনাক্ত হচ্ছে না। কিন্তু অনেক ভালো লিখছে তরুণরা, আসলে এগুলো চোখে পড়ছে না।
আধুনিকতা কি আমাদের ঐতিহ্যের ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে?
আসাদ চৌধুরী : আধুনিক কবিতা যখন শুরু হলো, আমি যদিও রবীন্দ্রনাথকে আধুনিক কবি মনে করি, তবে মধুসূদন দত্তকে আমি বাদ দিচ্ছি না। কিন্তু যাকে আমরা আধুনিক কবি বলে ধরা শুরু করেছি তিনি বুদ্ধদেব বসু। প্রেমেন্দ্র মিত্র, জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী প্রমুখ। তৃতীয় দশকের কবিরা। বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, মধ্যযুগের সাহিত্য অপাঠ্য। অর্থাৎ আমাদের ঐতিহ্য আমরা মানছি না। মধুসূদন দত্ত খ্রিষ্টান হয়েও দেবমন্দির নিয়ে লিখেছেন। রামকে নিয়ে লিখেছেন। রাধাকে নিয়ে লিখেছেন। এটা তো তিন দশকের কথা। চতুর্থ দশকে আমরা দেখছি সাত সাগরের মাঝি সিন্দাবাদ এসে গেছে। তাই কবিতার কোন ফর্মুলা চূড়ান্ত হবে, সেটা এখনো অজ্ঞাত। কাজী নজরুল ইসলাম গ্রিক মিথলজি ব্যবহার করেছেন। তার মতো আর কেউ পারেনি। ইসলামিক চিন্তাকে নতুন করে কেউ উন্নত করে থাকলে তিনি কাজী নজরুল ইসলাম।
আপনি ফিলিস্তিনের কবিতা অনুবাদ করেছিলেন। আমাদের দেশে ইংরেজি বা ইউরোপীয় ভাষার কবিতা যতটা পাচ্ছি, এশিয়ার কবিতা সেভাবে পাচ্ছি কি?
আসাদ চৌধুরী : আমি ক’দিন আগে ইরানে গিয়েছিলাম। তার আগে কায়রো গিয়েছি। আরবি ভাষার কবিতা অত্যন্ত শক্তিশালী কবিতা। ফাদওয়া তুকান একজন ফিলিস্তিনি কবি। মারা গেছেন বছর চারেক আগে। ইসরাইলের প্রধান সেনাপতি মুরশিদ আয়ান তার সম্পর্কে বলেছিলেন, ফাদওয়া তুকানের একেকটা কবিতা দশটা কমান্ডোর সমান। তার কবিতা ফিলিস্তিনে বেশি বিখ্যাত ছিল। তার চেয়েও বেশি বিখ্যাত ছিল ইসরাইলে। অসম্ভব জনপ্রিয় কবি ছিলেন তিনি। মাহমুদ দারবিশ, সামি আল কাতিম প্রমুখের চেয়ে ফাদওয়া তুকান অনেক বেশি বিখ্যাত ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যে নানারকম ক্রাইসিস হয়েছে।
সেখানে তেলের অফুরন্ত সম্ভাবনা দেখা দিলে পশ্চিমারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। রাজতন্ত্র ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে। আরো অনেক আগে লেবাননের বৈরুতকে বলা হতো প্রাচ্যের প্যারিস। সেখানে কমিউনিস্ট, নন-কমিউনিস্ট ও বিভিন্ন দেশ থেকে বিতাড়িত লোকগুলো উপস্থিত হতো। তারও আগে সেখানকার অনেক কবি বাইরে চলে যান। একদল চলে যায় সাউথ আমেরিকা; অন্যদল চলে যায় মধ্য আমেরিকা। সাউথ আমেরিকায় যারা গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে বিখ্যাত একজনের নাম আমরা বলি কাহলিল জিবরান। তিনি লিখতেন খলিল জিবরান। কিন্তু তার শিক্ষক সার্টিফিকেট দেওয়ার সময় ভুল করে কাহলিল লিখেছেন। তার পর থেকে তিনি সে নামেই প্রসিদ্ধ। কবি আদোনিস আরো একজন। আমি যা অনুবাদ করেছিলাম, তা হলো আরবদেশের প্রতিবাদী কবিতা। আরবি থেকে মোটেই করা নয়, ইংরেজি থেকে করা। আমাদের দেশে আরবি থেকে কবিতা অনুবাদের দাবি করেছেন একমাত্র আব্দুস সাত্তার। সেখানে ফাদওয়া তুকানের ভাইয়ের কবিতা ছিল। বিপ্লবী কবিতা।
প্রায় দুবছর আগে মারা গেছেন আব্দুস সাত্তার। বড় ভালো ও জ্ঞানী লোক ছিলেন। আমার উর্দু কবিতা বেরিয়েছে বেশ আগে। আমার জাপানের অনুবাদ কবিতা বের হবে শিগগিরই। জার্মান অনুবাদের কবিতা বের হয়েছে। এটা অবশ্য জগলুলের কৃতিত্ব। সাহস প্রকাশনী থেকে সে প্রকাশ করে দিয়েছে। উর্দু অনুবাদ এখনো করে যাচ্ছি। মুনীর উদ্দীন ইউসুফও উর্দু সাহিত্য, ফারসি সাহিত্য নিয়ে কম কাজ করেননি। বিরাট ভূমিকা তার। তবে ঢাকার উর্দু কবিরা কিন্তু খুব নামকরা ছিলেন। তাদের আমি পাইনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

