মুসলিম পর্যটকদের বিশ্বভ্রমণ

আবদুল মান্নান গালিব

মুসলিম পর্যটকদের বিশ্বভ্রমণ

ফরাসিতে একটি প্রবাদে আছে—Voyage forme la jeunesse (ভ্রমণ যৌবনকে গড়ে তোলে)। কিন্তু ভ্রমণ শুধু ব্যাগপ্যাক কাঁধে নিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি জমানোর নাম নয়; বরং এটি মানুষের মানসিক দিগন্ত উন্মোচনের একটি প্রক্রিয়া।

একাদশ শতকে আলবিরুনী কিতাবু তাহদিদিল আমাকিন লি-তাহকিকি মাসাফাতিল মাসাকিন (The determination of the coordinates of positions for the correction of distances between cities) গ্রন্থে লিখেছেন—ইসলামের বিস্তৃতি পশ্চিমে স্পেন (আন্দালুস) থেকে পূর্বে চীন সীমান্ত ও ভারতের মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত, দক্ষিণে আবিসিনিয়া ও জানজ অঞ্চল থেকে শুরু করে আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং আরো পূর্বে মালয় দ্বীপপুঞ্জ ও জাভা পর্যন্ত আর উত্তরে তুর্কি ও স্লাভদের দেশ পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। এই বিশাল অঞ্চলে বিভিন্ন মুসলিম শাসক স্বাধীনভাবে শাসন করলেও, সাধারণ ভ্রমণকারীরা তুলনামূলকভাবে নির্বিঘ্নে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতে পারত।

বিজ্ঞাপন

​শুধু তাই নয়, বাগদাদের বাইতুল হিকমাহ (House of Wisdom) থেকে শুরু করে কর্ডোভার লাইব্রেরি পর্যন্ত প্রতিটি জ্ঞানকেন্দ্র ছিল জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যে দেশান্তরী পণ্ডিতদের জন্য নিরাপদ সরাইখানা। অষ্টম শতাব্দীতে যখন পুরোনো লিনেন কাপড় আর জলচালিত মিলের মাধ্যমে কাগজ তৈরির বিপ্লব ঘটল, তখন জ্ঞানচর্চার উপকরণ সস্তা আরো সহজলভ্য হয়ে গেল। ফলে উট বা গাধার পিঠে শুধু মসলা বা রেশমই আসত না, আসত থরেথরে সাজানো পাণ্ডুলিপি। জ্ঞান অর্জনের এই অদম্য স্পৃহা মুসলিম মানচিত্রকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করছিল। সেই যুগে মেধা আর সাহস যখন এক মোহনায় মিশত, তখন সাত সমুদ্র আর তেরো নদীও এক নিমিষেই হাতের নাগালে চলে আসত।

হজকেন্দ্রিক পর্যটন

বিজ্ঞরা বলেন, ধর্মের চেয়ে বড় ট্রাভেল এজেন্ট আর নেই। পবিত্র কোরআনে সামর্থ্যবানদের হজ করার জন্য মক্কায় আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। জীবনে একবার মক্কায় এসে উপস্থিত হওয়াকে আবশ্যক করা হয়েছে। আর স্রষ্টার আহ্বানে সাড়া দিতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ মক্কার দিকে ছুটে আসত। তারা বহুদূরের পথ অতিক্রম করতে ম্যাপ তৈরি করত। সহজ পথের সন্ধান করত। নবম শতাব্দীতে আলইয়াকুবি ‘কিতাবুল বুলদান’ লিখলেন। এই গ্রন্থে তিনি শুধু নদী-নালার হদিস দেননি, দিয়েছেন ট্যাক্স আর তন্দুরি রুটির খবরও। তিনি সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে চীনের গল্প শুনিয়েছিলেন। মানুষকে জানিয়েছিলেন, এক সমুদ্রের পানির রঙ অন্য সমুদ্র থেকে আলাদা, মাছের আকার ও প্রজাতি আলাদা, এমনকি বাতাস প্রবাহের ধরনও আলাদা।

এই বিবরণগুলো শুধু গল্প ছিল না, ছিল সওদাগরদের জন্য দিকনির্দেশনা। সে সময় আরেক সওদাগর আবু জায়েদ হাসান বসরা আর সিরাফ থেকে জাহাজ ভাসালেন চীনের দিকে। তিনি খেমের দেশের (আজকের কম্বোডিয়া) বর্ণনা দিতে গিয়ে এমন সব গল্প শোনালেন, লোকে ভাবলÑতিনি বুঝি আরব্য রজনির সিন্দাবাদের বড় ভাই। আবার ইবনে ওয়াহাব বেইজিংয়ের কায়দা-কানুন দেখে তো থ বনে গিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, চীনারা শুধু বাজি পোড়াতে জানে না, চমৎকার প্রশাসন ব্যবস্থা রয়েছে তাদের। তাদের বাজারে ওজনে কারচুপি হয় না, তাদের সম্রাট রাজপথে নেমে এসে প্রজাদের অভাব-অভিযোগ শোনেন। মুসলিম পর্যটকদের এই বয়ানগুলোই মূলত মধ্যযুগে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে এক বিশাল সাংস্কৃতিক সেতু তৈরি করেছিল।

ভাইকিংসদের সঙ্গে সাক্ষাৎ

ইবনে বতুতার কয়েকশ বছর আগে জেরুসালেমের আলমুকাদ্দাসি সমগ্র মুসলিম জাহান চষে বেড়িয়েছেন। তার বইয়ের নাম ‘আহসানুত তাকাসিম’। নামটা যেমন গুরুগম্ভীর, তথ্যগুলোও তেমনি খাসা। আবার ইবনে খুরদাদবিহ প্রদত্ত বাণিজ্য পথের হদিস দিয়ে যে ম্রাপ তৈরি করেছিলেন, সেখানে কোরিয়া ও জাপানের নামও উল্লেখ করা হয়েছিল।

​কিন্তু আসল চমক দিলেন আহমদ ইবনে ফাদলান। ৯২১ সালে বাগদাদের খলিফা আলমুকতাদিরের দূত হয়ে তিনি মধ্য এশিয়া থেকে ভলগা নদী পার হয়ে উত্তর মেরুর দিকে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি ‘রুস’ বা ভাইকিংদের দেখেছিলেন। সেই লম্বা সোনালি চুলের রাগী মানুষগুলো সম্পর্কে তার বর্ণনা পড়লে আজও গা শিউরে ওঠে। উত্তর ইউরোপের হিমশীতল আবহাওয়ায় মধ্যে দাঁড়িয়ে এক আরব পণ্ডিত যে বর্ণনা লিখলেন, তা আজও ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে।

​তিনি শুধু তাদের রণকৌশলেই নয়, দেখেছিলেন তাদের অদ্ভুত সব সৎকার প্রথা আর সামাজিক রীতিনীতি। তার বর্ণনায় উঠে এসেছিল ভাইকিংদের এক অভিজাত সর্দারের শেষকৃত্যের দৃশ্যÑযেখানে আস্ত এক রণতরীতে মৃতদেহের সঙ্গে অগাধ ধনসম্পদ আর দাসীকে রেখে জীবন্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

​ইবনে ফাদলান অবাক হয়ে দেখেছিলেন, ভাইকিংদের দেহে নখ থেকে ঘাড় পর্যন্ত নানা রঙের উল্কি বা ট্যাটু আঁকা। তার সেই নথিপত্র না থাকলে আজকের ইতিহাসবিদরা হয়তো ভাইকিংদের আদি জীবন নিয়ে অনেকটাই অন্ধকারে থাকতেন। এমনকি আধুনিক হলিউড যখন ‘দ্য থার্টিনথ ওয়ারিয়র’ বানায়, তখনো সেই ইবনে ফাদলানের ডায়েরিই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান পাথেয়।

ইয়াকুত হামাওয়ির ভূগোল ডিকশনারি

ইমাম আল-শাফি বলেছিলেন, ‘উচ্চমর্যাদার সন্ধানে দেশ ছাড়ো এবং ভ্রমণ করো!’ কারণ ভ্রমণে পাঁচটি লাভÑদুঃখমুক্তি, জীবিকা অর্জন, জ্ঞানের বিকাশ, শিষ্টাচার এবং মহৎ সঙ্গ। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইয়াকুত আলহামাওয়ি এই উপদেশকে মাথায় রেখেই লিখে ফেলেছিলেন ভূগোল ডিকশনারি—‘মুজামুল বুলদান’।

জাকারিয়া আলকাজওয়িনি শুনিয়েছিলেন সমুদ্রের দানবীয় সাপ আর পেল্লায় কচ্ছপের গপ্পো। আদদিমাশকি আবার আরো এক কাঠি সরেস। তিনি বলেছিলেন মালয়ের জঙ্গল আর সাদা হাতির কথা। এমনকি ‘রুখ’ পাখির গল্পও তার কলমে উঠে এসেছিল। আজকের দিনের ডিজনি বা মার্ভেল, যা নিয়ে মাতামাতি করে, সেই ‘সিন্দাবাদ’ বা ‘আরব্য রজনি’র বীজ বোনা হয়েছিল কিন্তু ওইসব পরিব্রাজকদের ডায়েরিতেই। কল্পনা আর বাস্তবতার মিশেলে তারা এমন এক সাহিত্যের রসদ তৈরি করেছিলেন, যা আজও বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের কল্পনার ভেলায় ভাসিয়ে দেয়।

বিশ্বপর্যটক ইবনে বতুতা

তবে গল্পের আসল রাজপুত্র ইবনে বতুতা। ১৩২৫ সাল, ১৩ জুন। বছর একুশের টগবগে এক তরুণ তানজিয়ারের বাড়ি থেকে বের হলেন একটা গাধার পিঠে চড়ে। গন্তব্য ছিল মক্কা, কিন্তু ফিরলেন ২৯ বছর পর! ততদিনে তিনি ৪০টা দেশ আর ৭৫ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছেন। আজকের যুগে বিমানেও যা কঠিন, সেই যুগে তিনি তা করেছেন স্রেফ মনের জোরে। ভারত মহাসাগরের ঝড় থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়ার দুর্গম তুষারপাত—কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি।

মালির স্বর্ণবাণিজ্য থেকে শুরু করে গঙ্গাপাড়ের অজানা গল্প—বতুতার ‘রিহলা’ না থাকলে আমাদের ইতিহাসই আধো-অন্ধকার থেকে যেত। তিনি দেখিয়েছিলেন, মানুষের মেধা আর সাহস যখন এক হয়, তখন পৃথিবীটা কত ছোট হয়ে আসে। বতুতার ভ্রমণের উদ্দেশ্য শুধু মাটি দেখা ছিল না, ছিল মাটির মানুষগুলোকে চেনা। দিল্লির সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের দরবারে কাজ করা থেকে শুরু করে মালদ্বীপের কাজী হওয়া—সবই ছিল তার বিচিত্র অভিজ্ঞতার অংশ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সমগ্র পৃথিবীই একজন মুসলমানের ঘর, গোটা মানবজাতি তার বৃহৎ পরিবার।

আজকের এই সীমারেখা-বিভক্ত পৃথিবীতে, যেখানে মানুষকে মাপা হয় পাসপোর্টের রঙে, সেখানে আলবিরুনী ও ইবনে বতুতাদের জীবন আমাদের এক ভিন্ন সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। তারা দেখিয়েছেন—পৃথিবী কোনো দেয়ালবেষ্টিত ভূখণ্ড নয়, বরং এক উন্মুক্ত পাঠশালা, যেখানে প্রতিটি পথ, প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি সভ্যতা এক একটি জ্ঞানের উৎস।

স্বর্ণযুগের সেই অভিযাত্রীরা শুধু মানচিত্রে নতুন অঞ্চল যুক্ত করেননি; তারা মানুষের দৃষ্টিকে প্রসারিত করেছেন, হৃদয়কে নম্র করেছেন এবং জ্ঞানকে করেছেন সীমাহীন। তাদের ভ্রমণ ছিল না শুধু পথচলা, ছিল এক ধরনের ইবাদতÑযেখানে দেখা মানেই উপলব্ধি আর জানা মানেই আত্মশুদ্ধি।

আজও তাদের পদচিহ্ন আমাদের আহ্বান জানায়—স্থিরতায় নয়, চলার মধ্যেই জীবনের প্রকৃত অর্থ নিহিত। কারণ জীবন থেমে থাকার নাম নয়; জীবন হলো এক অনন্ত যাত্রাÑযেখানে আকাশ ও জমিনের মাঝখানে যা কিছু আছে, তা শুধু দেখার জন্য নয়, বরং গভীরভাবে অনুভব করার জন্য।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন