রামচন্দ্র খাঁর রাজবাড়ী: ইতিহাস ও প্রত্নচিহ্নের সন্ধানে

রামচন্দ্র খাঁর রাজবাড়ী: ইতিহাস ও প্রত্নচিহ্নের সন্ধানে

রামচন্দ্র খাঁর রাজবাড়ীর সন্ধান শুরু হয়েছিল একেবারেই আকস্মিকভাবে। কোনো পুরোনো স্থাপনা খুঁজতে নয়, অন্য একটি কাজে এলাকায় গিয়ে ধ্বংসাবশেষের মধ্যে কয়েকটি পুরোনো মাটির পাত্রের ভাঙা টুকরা আমার চোখে পড়ে। সামান্য টুকরাগুলোই মনে প্রশ্ন জাগায়, এই মাটির নিচে তবে কী কোনো ইতিহাস চাপা পড়ে আছে?

কৌতূহল থেকেই স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকা নানা কথা ও স্মৃতি সংগ্রহ করতে শুরু করি। সেসব তথ্য সতীশচন্দ্র মিত্রসহ ইতিহাসবিদদের গ্রন্থ এবং পুরোনো বিবরণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। তখন রামচন্দ্র খাঁর সঙ্গে এই স্থানের একাধিক যোগসূত্র খুঁজে পাই। সেই থেকে জায়গাটিতে বারবার যাওয়া, ধ্বংসাবশেষ পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় স্মৃতির সঙ্গে ঐতিহাসিক সূত্র মিলিয়ে দেখা আমার নিয়মিত অনুসন্ধানের অংশ হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

একটি প্রশ্ন আমার অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়, বেনাপোলের এই নীরব ধ্বংসাবশেষই কি কয়েক শতাব্দী আগে রামচন্দ্র খাঁর সেই রাজবাড়ী, যার স্মৃতি আজও ইতিহাসের পাতায় ও মানুষের মুখে বেঁচে আছে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হয় হারিয়ে যাওয়া রাজবাড়ীর পুনঃখোঁজ।

রামচন্দ্র খাঁর রাজবাড়ীর খোঁজে

বেনাপোলের পাটবাড়ীর আশপাশের অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েকশ বছরের পুরোনো ইতিহাস। কোথাও পুরোনো জলাশয়, কোথাও ইটের ভগ্নস্তূপ, কোথাও মাটির উঁচু ঢিবি, স্থানীয় স্মৃতিতে এসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রভাবশালী একজন জমিদারের নাম রামচন্দ্র খাঁ। ষোলো শতকের বৈষ্ণব সাহিত্যে যাকে পাওয়া যায় হরিদাস ঠাকুর ও নিত্যানন্দ প্রভুর সঙ্গে সংঘাতের সূত্রে, পরবর্তী ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে তার রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষের কথাও উঠে এসেছে। প্রশ্ন হলো, আজকের বেনাপোলের রাজবাড়ী নামে পরিচিত স্থানটি কী সেই রামচন্দ্র খাঁর হারিয়ে যাওয়া আবাসের স্মৃতি বহন করছে?

শান্তিধর যেভাবে ‘রামচন্দ্র খাঁ’ হলেন

রামচন্দ্র খাঁ ছিলেন বেনাপোলের কাছের কাগজপুকুরিয়া অঞ্চলের একজন প্রভাবশালী জমিদার। তার পরিচয় নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় সতীশচন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাস বইতে। তিনি বলেন, “রামচন্দ্র হোসেন শাহর নিকট হইতে যথেষ্ট অনুগ্রহ লাভ করিয়াছিলেন। তিনি সাধারণতঃ রামচন্দ্র নামে পরিচিত হইলেও তার প্রকৃত নাম এটা ছিল না। শান্তিধর নামক এক ব্রাহ্মণ হোসেন শাহের নিকট ‘রাম খাঁ’ উপাধি পান। এই রাম খাঁ উপাধি, শেষে রামচন্দ্র খাঁ হইয়া দাঁড়াইয়াছে।” (যশোহর-খুলনার ইতিহাস, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৩৭০)

হোসেন শাহর সঙ্গে রামচন্দ্রের সম্পর্কের কথাও মিত্র উল্লেখ করেছেন। তার বর্ণনায়, রামচন্দ্র দীর্ঘদিন রাজস্ব পরিশোধ না করেও হোসেন শাহের শাসনামলে বড় কোনো শাস্তির মুখোমুখি হননি। এর পেছনে প্রভাব এবং সুলতানের সঙ্গে সুসম্পর্ক ভূমিকা রেখেছিল বলে তার বিবরণ থেকে ধারণা করা যায়। একই সঙ্গে স্থানীয় ঐতিহ্যে রামচন্দ্রকে জনদরদি জমিদার হিসেবেও স্মরণ করা হয়েছে। বিশেষ করে, বিভিন্ন পুকুর ও দিঘি খননের সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে আছে। মিত্র কাগজপুকুরিয়া ও তার আশপাশে রামচন্দ্রের খনন করা একাধিক পুকুরের নাম ও অবস্থানের কথাও উল্লেখ করেছেন।

রামচন্দ্র-খাঁর-রাজবাড়ী-ইতিহাস-ও-প্রত্নচিহ্নের-সন্ধানে

হরিদাস ও লক্ষহীরার কাহিনি

রামচন্দ্র খাঁর নাম সবচেয়ে বেশি পরিচিত হয়ে আছে বৈষ্ণব সাহিত্যের একটি বহুল আলোচিত ঘটনার কারণে। বেনাপোলের নিকটবর্তী নির্জন অঞ্চলে হরিদাস ঠাকুর সাধনায় অবস্থান করছিলেন। রামচন্দ্র তার ধর্মীয় সাধনায় বিরক্ত হয়ে তাকে বিপথে নেওয়ার উদ্দেশ্যে হীরা নামে এক গণিকাকে পাঠান। পরবর্তী বৈষ্ণব ঐতিহ্যে তিনি লক্ষহীরা নামে পরিচিত হন।

শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের বিবরণ অনুযায়ী, হীরা একাধিক রাতে হরিদাসের কুটিরে গিয়ে তাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু হরিদাস তার সাধনা থেকে বিচ্যুত হননি। বরং তার সংস্পর্শে এসে হীরার মন পরিবর্তিত হয়। পরে তিনি হরিদাসের কাছে নিজের অপরাধ স্বীকার করেন এবং বৈষ্ণব সাধনায় প্রবৃত্ত হন। সতীশচন্দ্র মিত্রও এই কাহিনি বর্ণনা করেছেন এবং কাগজপুকুরিয়ার কাছে হীরার আবাসের ভগ্নাবশেষ ও ‘হীরার পুকুর’-এর স্থানীয় স্মৃতির উল্লেখ করেছেন।

এই কাহিনির ঐতিহাসিক প্রামাণ্যতা বিচার করতে গেলে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এর প্রধান উৎস বৈষ্ণব জীবনীসাহিত্য। ফলে ঘটনাটির ধর্মীয় ও নৈতিক ব্যাখ্যা এবং তার ঐতিহাসিক সত্যতা, দুটিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।

রামচন্দ্রের পতন

রামচন্দ্র খাঁর পতনের কাহিনিতেও বৈষ্ণব সাহিত্য ও পরবর্তী ইতিহাসের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। সতীশচন্দ্র মিত্রের বিবরণ অনুযায়ী, হোসেন শাহ রামচন্দ্রের কাছ থেকে দীর্ঘদিন রাজস্ব না নিলেও তার মৃত্যুর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। হোসেন শাহর ছেলে নসরৎ শাহর আমলে সুলতানের সৈন্য-সামন্ত কর আদায়ের জন্য রামচন্দ্রের অঞ্চলে আসে। এরপর রামচন্দ্র স্ত্রী-পুত্রসহ বন্দি হন এবং তার বাড়ি ও গ্রাম লুট করা হয়।

হারানো রাজবাড়ীর সন্ধানে

রামচন্দ্র খাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, তার সেই রাজবাড়ী কোথায় ছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় সতীশচন্দ্র মিত্রের কাছে। তার যশোহর-খুলনার ইতিহাস বইতে বেনাপোলের নিকটবর্তী কাগজপুকুরিয়া গ্রামে রামচন্দ্র খাঁর বিস্তীর্ণ রাজবাড়ীর ভগ্নাবশেষ থাকার কথা লিখেছেন। অর্থাৎ স্থানটির সঙ্গে রামচন্দ্র খাঁর সম্পর্কের ধারণা নতুন নয়; বহু আগেই একজন ইতিহাস-অনুসন্ধানী সেখানে গিয়ে ধ্বংসাবশেষ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।

সতীশচন্দ্র মিত্রের বিবরণটি এ কারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যে তিনি শুধু ‘রাজবাড়ী ছিল’ এমন কোনো লোককথা উল্লেখ করে থেমে যাননি। তিনি ধ্বংসাবশেষের ভৌত বৈশিষ্ট্যেরও বর্ণনা দিয়েছেন। তার বর্ণনায় রাজবাড়ীর চারদিকে ছিল বৃত্তাকার পরিখা। এর ভেতরে ছিল আরেকটি চতুষ্কোণ গভীর পরিখা, যার কিছু অংশ সে সময়েও পানিতে পূর্ণ ছিল। রাজবাড়ীর বিভিন্ন স্থানে ছিল অসংখ্য ইটের ভগ্নস্তূপ, আর ঘন জঙ্গলের মধ্যে সেই ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিল। রাজবাড়ীর পশ্চিমদিকে দুটি মন্দিরের ভগ্নাবশেষ এবং আশপাশে আরো কয়েকটি ঢিবির কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

‘রাজবাড়ী’ নামের সূত্র

রামচন্দ্র খাঁর রাজবাড়ীর সন্ধানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলো স্থানীয় স্থাননাম ও লোকস্মৃতি। পুরোনো ভ্রমণবিবরণেও বেনাপোলের পাটবাড়ীর কাছে রামচন্দ্র খাঁর গড়বেষ্টিত রাজভবনের ধ্বংসাবশেষের উল্লেখ পাওয়া যায় এবং স্থানীয়ভাবে ওই স্থান ‘রাজবাড়ী’ নামে পরিচিত ছিল বলে জানা যায়।

তবে স্থাননামকে একা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলা যাবে না। ‘রাজবাড়ী’ নাম বাংলার বহু স্থানের ক্ষেত্রেই পরবর্তী লোকস্মৃতি থেকে সৃষ্টি হতে পারে।

কিন্তু যখন একই স্থানের সঙ্গে পুরোনো ঐতিহাসিক বিবরণ, স্থানীয় স্মৃতি এবং দৃশ্যমান স্থাপত্য-ধ্বংসাবশেষ, তিনটি আলাদা সূত্র একত্র হয়, তখন বিষয়টি নিঃসন্দেহে অনুসন্ধানের যোগ্য হয়ে ওঠে।

এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো স্থানগুলোর অবস্থান। হরিদাস ঠাকুরের সাধনস্থল এবং রামচন্দ্র খাঁর আবাসের মধ্যে ভৌগোলিক নৈকট্যের কথা পুরোনো সূত্রে পাওয়া যায়। সতীশচন্দ্র মিত্র লিখেছেন, হরিদাসের কুটির থেকে কাগজপুকুরিয়া প্রায় এক মাইল দূরে ছিল। একই সঙ্গে তিনি কাগজপুকুরিয়াকে বেনাপোলের নিকটবর্তী বলে উল্লেখ করেছেন।

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চৈতন্যচরিতামৃতের কাহিনিতে হরিদাস ঠাকুর ও রামচন্দ্র খাঁর আবাসিক অঞ্চলের যে ভৌগোলিক নৈকট্য প্রতীয়মান হয়, পরবর্তী স্থান পর্যবেক্ষণেও তার একটি বাস্তব ভৌগোলিক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

মাটির নিচে কী আছে

রামচন্দ্র খাঁর রাজবাড়ী শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলোর একটি হলো কাগজপুকুরিয়ার ধ্বংসাবশেষের ধরন। সতীশচন্দ্র মিত্র সেখানে রাজবাড়ীর চারপাশে পরিখা, ভেতরে আরেকটি গভীর পরিখা, বিভিন্ন স্থানে ইটের ভগ্নস্তূপ, মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এবং কয়েকটি উঁচু ঢিবির কথা উল্লেখ করেছেন। একটি সাধারণ বসতবাড়ির ধ্বংসাবশেষে এ ধরনের একাধিক স্থাপত্যচিহ্ন একসঙ্গে থাকার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। বরং পরিখাবেষ্টিত বিস্তৃত এলাকা, ইটের নির্মাণচিহ্ন এবং মন্দির, হাতিশালা ও অশ্বশালার মতো পৃথক স্থাপনার স্থানীয় স্মৃতি থেকে ধারণা করা যায়, এখানে একসময় একটি বড় ও সংগঠিত আবাসিক স্থাপনা বা গড়বাড়ি ছিল।

আরো লক্ষণীয় হলো, সতীশচন্দ্র মিত্র শুধু একটি রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষের কথা বলেননি; তিনি রামচন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত পুকুরের কথাও উল্লেখ করেছেন। একজন স্থানীয় জমিদারের বৃহৎ আবাসের চারপাশে এত বিপুল জলাশয়, পরিখা ও স্থাপত্যচিহ্নের সমাবেশ অবশ্যই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো যদি একই সময়ের একটি বৃহৎ বসতি-পরিকল্পনার অংশ হয়ে থাকে, তবে তা রামচন্দ্র খাঁর স্থানীয় ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য সম্পর্কে নতুন তথ্য দিতে পারে।

রাজবাড়ীটি কি সত্যিই রামচন্দ্র খাঁর

বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে স্থানটিকে রামচন্দ্র খাঁর রাজবাড়ী হিসেবে শনাক্ত করার পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী ঐতিহাসিক সূত্র রয়েছে, কিন্তু এটিকে আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক অর্থে ‘বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত’ বলা এখনই ঠিক হবে না।

কারণ একটি প্রত্ন স্থানের পরিচয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হতে পারে পদ্ধতিগত প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, খনন, স্তরবিন্যাসের বিশ্লেষণ, স্থাপত্যের কালনির্ণয়, মৃৎপাত্র ও অন্যান্য নিদর্শনের তুলনামূলক পরীক্ষা এবং সম্ভব হলে সমসাময়িক লিখিত নিদর্শন। শুধু ইটের ধ্বংসাবশেষ বা পুরোনো পুকুরের উপস্থিতি দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ব্যক্তির আবাস নিশ্চিত করা যায় না। এই জায়গায় সতীশচন্দ্র মিত্রের বিবরণ আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি যখন কাগজপুকুরিয়ার ধ্বংসাবশেষকে রামচন্দ্র খাঁর রাজবাড়ী হিসেবে উল্লেখ করেন, তখন স্থানীয় স্মৃতি, স্থাপত্যের অবশেষ এবং ঐতিহাসিক কাহিনি, এই তিন ধরনের তথ্য তার কাছে ছিল।

অতএব বর্তমান অনুসন্ধানের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বক্তব্য হতে পারে, বেনাপোলের কাগজপুকুরিয়া বা রাজবাড়ী অঞ্চলের ধ্বংসাবশেষ রামচন্দ্র খাঁর ঐতিহাসিক রাজবাড়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইতিহাসের মাটি, লোকস্মৃতি ও চৈতন্যসাহিত্য

রামচন্দ্র খাঁর রাজবাড়ীর কাহিনির আকর্ষণ এখানেই যে, এর সূত্রগুলো একক কোনো গ্রন্থে সীমাবদ্ধ নয়। একদিকে শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত ও বৈষ্ণব সাহিত্য বেনাপোল অঞ্চলে রামচন্দ্র, হরিদাস এবং নিত্যানন্দের ঘটনা রয়েছে। অন্যদিকে সতীশচন্দ্র মিত্রের মতো ইতিহাস-অনুসন্ধানী লেখক সেই ঘটনাগুলোর ভৌগোলিক পটভূমি অনুসন্ধান করে কাগজপুকুরিয়ায় রাজবাটীর ধ্বংসাবশেষের বিবরণ দিয়েছেন। এরপর স্থানীয় স্থাননাম, পুকুর, ঢিবি, পরিখা ও ইটের ভগ্নস্তূপ রামচন্দ্র খাঁর স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে।

হারানো রাজবাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে

কয়েকশ বছর আগে রামচন্দ্র খাঁর নাম উঠে এসেছিল বৈষ্ণব সাধকদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি সংঘাতের কাহিনিতে। সময়ের প্রবাহে তার রাজনৈতিক ক্ষমতা, রাজবাড়ী এবং পারিপার্শ্বিক বসতির অনেকটাই হারিয়ে গেছে। কিন্তু মাটির নিচে ও স্থানীয় স্মৃতিতে তার কিছু চিহ্ন টিকে থাকার সম্ভাবনা রয়ে গেছে।

সতীশচন্দ্র মিত্রের বিবরণ আমাদের সামনে পুরোনো ইতিহাসের জানালা খুলে দেয়। তার চোখে দেখা পরিখা, ইটের স্তূপ, ধ্বংসাবশেষ ও পুকুরের সঙ্গে আজকের ভূদৃশ্যের তুলনা করলে মনে হয়, বেনাপোলের এই অঞ্চলকে নতুন করে প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে পরীক্ষা করার যথেষ্ট কারণ ও প্রয়োজন রয়েছে।

রামচন্দ্র খাঁর রাজবাড়ী সত্যিই এই ধ্বংসাবশেষের নিচে লুকিয়ে আছে কি না—তার নিশ্চিত উত্তর এখনো আমাদের জানা নেই। হয়তো মাটির নিচে এখনো পড়ে আছে সেই সময়ের ইট, দেয়াল কিংবা অন্য কোনো নিদর্শন, যা একদিন এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। কিন্তু তার আগেই ইতিহাস আমাদের সামনে একটি কৌতূহলোদ্দীপক সূত্র রেখে দিয়েছে, চৈতন্যসাহিত্যে বর্ণিত রামচন্দ্র খাঁ, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা হরিদাস ঠাকুর ও নিত্যানন্দের কাহিনি, আর সতীশচন্দ্র মিত্রের চোখে দেখা কাগজপুকুরিয়ার পরিখাবেষ্টিত ধ্বংসাবশেষ, সবকিছু যেন একই ভূখণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে।

আজ সেখানে হয়তো আগের সেই রাজবাড়ী নেই, নেই প্রাচীর, মন্দির কিংবা রাজকীয় ভবন। রয়ে গেছে কিছু ভগ্নচিহ্ন, পুরোনো জলাশয়, স্থাননাম আর মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা স্মৃতি। তাই বেনাপোলের এই রাজবাড়ীর সন্ধান আসলে শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা খুঁজে বের করার চেষ্টা নয়; এটি কয়েক শতাব্দী ধরে হারিয়ে যেতে থাকা স্থানীয় একটি ইতিহাসকে আবার চোখের সামনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। হয়তো মাটির নিচেই লুকিয়ে আছে সেই ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উত্তর।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন