১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খিলজির বাংলাবিজয় থেকে ২০২৪ সালের মহান জুলাই বিপ্লব—প্রায় হাজার বছরের এই দীর্ঘ সময়ে বাংলার ইতিহাস বহুবার নতুন মোড় নিয়েছে। কখনো স্বাধীন রাষ্ট্রের উত্থান, কখনো বিদেশি আধিপত্য মোকাবিলা, কখনো জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠা ও মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম—এসবের মধ্য দিয়েই সমৃদ্ধ হয়েছে এই ভূমি ও জাতির ইতিহাস। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে বহিরাগত সেন রাজাদের ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসন থেকে বাংলার মানুষ মুক্ত হয়। ১৩৫২ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ স্বাধীন বাংলা সালতানাত প্রতিষ্ঠা করে ইতিহাসে বাঙালি জাতি ও বাংলা রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন। ষোড়শ শতকে মসনদে আলা ঈসা খান ভাটিতে মোগলদের সম্প্রসারণবাদ প্রতিহত করেন। পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়, অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দেশের নানা প্রান্তে একের পর এক বিদ্রোহ দেখা দেয়। সুফি-দরবেশ, আলেম-ওলামা, কৃষক-জনতা, সৈনিক, আদিবাসীসহ সাধারণ মানুষ বারবার ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন।
পরবর্তী সময়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব—প্রতিটি সংগ্রামই এ বাংলার মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার ধারাবাহিক প্রকাশ। বাংলার মানুষের এই দীর্ঘ সংগ্রাম, প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার ইতিহাসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে লিখেছেন মুহিম মাহফুজ, আসিফ আযহার, মাহমুদ আহমাদ ও সিয়াম আন-নুফাইস
এশিয়া মহাদেশের ছোট দেশ হলেও ভৌগোলিক অবস্থান ও সম্পদের কারণে প্রাচীন কাল থেকে বাংলাদেশ ছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দখলটার্গেটে। বাংলার মানুষকে হাজার বছর ধরে বহু রক্তঝরা আন্দোলনের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখতে হয়েছে নিজেদের স্বাধীনতা, প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে আত্মপরিচয়। বাংলার মানুষের মুক্তি ও বাংলার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে দুজন মহামানুষ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বাংলার ইতিহাসে তাদের আলোচনা হতাশাজনকভাবে কম—একজন বাংলার মানুষের মুক্তির নায়ক মহাবীর বখতিয়ার খিলজি, অন্যজন বাংলা রাষ্ট্র ও জাতির স্থপতি সুলতান শামসুদ্দিন ইলয়াস শাহ।
বখতিয়ারের বাংলাবিজয় ও বাংলার মানুষের মুক্তি
বহিরাগত সেন রাজাদের ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসন থেকে বাংলার মানুষকে মুক্ত করেন মহাবীর বখতিয়ার খিলজি। বখতিয়ারের বাংলাবিজয় ছিল মূলত বাংলার নিপীড়িত জনগণের মুক্তি আন্দোলন। সেন আমল ছিল বাংলার মানুষের জন্য চরম দুঃসময়। সেন যুগে সমাজব্যবস্থা ক্রমেই কঠোর বর্ণপ্রথা ও ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্যের অধীনে পরিচালিত হতে থাকে। সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নিম্নবর্ণ, অন্ত্যজ ও প্রান্তিক জনগণ বিভিন্ন সামাজিক বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হয়েছিল। সমাজে ছিল গভীর বৈষম্য।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ছিল সেন আমলে চরম নিপীড়নের শিকার। ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন রাজাদের অত্যাচারে জীবন বাঁচাতে দলে দলে বাংলার বৌদ্ধরা নেপালসহ পূর্ব এশিয়ার দিকে পালাতে বাধ্য হয়। এই প্রেক্ষাপটে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে মহাবীর বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে সেন শাসনের অবসান শুরু হয় এবং বাংলায় সাম্যবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলায় এমন একটি নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে ওঠে, যেখানে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সামাজিক গোষ্ঠীর মানুষের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-দলিত—সবাই বৈষম্যহীন সমাজে বসবাসের সুযোগ পায়। সুফি সাধক ও পীর দরবেশদের প্রভাব বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীর পরিবর্তন আনে এবং বাংলায় সাম্যবাদের বিস্তার ত্বরান্বিত হয়।
স্বাধীন বাংলা সালাতানাত ‘সালতানাতে বাঙ্গালাহ’
১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দ। বাংলা তখন দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের অধীনে। তুঘলক পুরো বাংলা প্রদেশকে পুনঃসংগঠিত করে তিনটি প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করেন—১. সোনারগাঁও (পূর্ব বাংলা), ২. গৌড় (উত্তর বাংলা) এবং ৩. সাতগাঁও (দক্ষিণ বাংলা)। এই বিভক্ত বাংলা টিকে থাকে মাত্র এক যুগ। ১৩৩৮ সালে এই তিন অঞ্চলে স্বাধীন সুলতানদের উত্থান ঘটে—সোনারগাঁওয়ে ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ, গৌড়ে আলাউদ্দিন আলী শাহ এবং সাতগাঁওয়ে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ।
১৩৪০ সালে ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ চট্টগ্রাম দখল করেন এবং ১৩৪৯ সালে তার পুত্র ইখতিয়ারউদ্দিন গাজী শাহ ক্ষমতায় আসেন। অন্যদিকে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ আলাউদ্দিন আলী শাহকে পরাজিত করে গৌড়ের নিয়ন্ত্রণ নেন। এরপর সোনারগাঁওয়ের ইখতিয়ারউদ্দিনকেও পরাজিত করেন। ১৩৫২ সালে বাঙালি সুলতানদের মধ্যে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বিজয়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বাংলার তিনটি প্রদেশ জয় করে সালতানাতে বাঙ্গালাহ বা বাংলা সালতানাত নামে বাঙালিদের নিয়ে একটি সামাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সিংহাসনে আরোহণকালে নিজের জন্য নাম ধারণ করেন শাহে বাঙ্গালিয়ান বা বাঙালিদের বাদশা। সালতানাতের অধিবাসীদের অভিহিত করেন বাঙ্গালি হিসেবে। ইতিহাসে এই প্রথম বাঙালিরা দিল্লির অধীনতা ছিন্ন করে স্বাধীন রাষ্ট্র পেল, আত্মপরিচয় হিসেবে বাঙালির মর্যাদা পেল আর পেল বাঙালি জাতির স্থপতি।
সুলতান ইলিয়াস শাহ জাতিগঠনে যে ঐক্যসূত্র নির্ণয় করেছেন, সেটি ভাষা। ফলে ভাষাগত জাতীয়তাবাদের জনক যে সুলতান শামসুদ্দিন, সে বিষয়ে আপত্তির অবকাশ নেই। সাম্রাজ্য নির্মাণের মধ্য দিয়ে তিনি ভাষাগতভাবে ঐক্যবদ্ধ জনগণকে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীতে পরিণত করেন। সাম্রাজ্য বিস্তার ঘটতে থাকে। বাংলা সালতানাত শক্তিশালী সাম্রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার পাশাপাশি বাঙালি জাতির সাম্রাজ্য বা দেশভিত্তিক জাতীয়তা অর্জিত হতে থাকে। প্রায় ২০০ বছরের বাংলা সালতানাতের স্থায়িত্বকালে বাঙালি ভাষাগত ও রাষ্ট্রগতভাবে একটি শক্তিশালী জাতি হিসেবে ইতিহাসে নিজের গৌরবময় অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে অবিস্মরণীয় হন শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ।
মসনদে আলা ঈসা খান : মোগল আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ (১৫৭৬–১৫৯৯)
১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে দাউদ খান কররানীর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীন সুলতানাতের শাসন শেষ হয়। এর ফলে বাংলার পশ্চিমাঞ্চলের একটি অংশ মোগল সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে এলেও পুরো বাংলায় তাদের কর্তৃত্ব তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিশেষ করে, ভাটি অঞ্চলসহ পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ জনপদে মোগল আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে তাদের আরও প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ধারাবাহিক সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে হয়। এই দীর্ঘ সংগ্রামে মোগলদের বিপুল জনবল, অর্থ ও সামরিক শক্তি ব্যয় হয়। আর এই প্রতিরোধের কেন্দ্রে ছিলেন ভাটির অবিসংবাদিত নেতা মসনদে আলা ঈসা খান।
বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামে ঈসা খান ছিলেন অন্যতম প্রধান নেতা। তিনি এমন এক সময়ে মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, যখন পুরো বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশে তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি ছিল প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সেই দুর্দিনে তিনি শুধু অস্ত্র হাতে যুদ্ধই করেননি, বরং ভাটির ভুঁইয়াদের ঐক্যবদ্ধ করে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ জোট গড়ে তুলেছিলেন। দীর্ঘ সংগ্রামময় জীবনের মাধ্যমে তিনি বাংলার মানুষের আস্থা, শ্রদ্ধা ও নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। ১৫৬৪ সালে সরাইলের একটি ছোট পরগনার শাসক হিসেবে তার শাসন যাত্রা শুরু হলেও, মাত্র তিন দশকের মধ্যে তিনি ভাটি অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী শাসকে পরিণত হন।
ঈসা খানের নেতৃত্বে সংগঠিত বারো ভুঁইয়া জোট একের পর এক মোগল সুবাদার ও সেনাপতির অগ্রযাত্রা প্রতিহত করে। সুবাদার খানজাহান (১৫৭৫–১৫৭৮), মুজাফফর খান (১৫৭৯–১৫৮০), খানে আজম (১৫৮১–১৫৮৩), শাহবাজ খান (১৫৮৩–১৫৮৫) এবং পরবর্তীকালে রাজা মানসিংহের (১৫৯৪–১৬০৬) নেতৃত্বাধীন বাহিনী তার প্রতিরোধের মুখে বারবার কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। এর ফলে বহু বছর ধরে বাংলায় মোগল শাসনের কার্যকর সীমা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ঘোড়াঘাট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে এবং ভাটি অঞ্চল কার্যত স্বাধীন অবস্থায় টিকে থাকে।
ঈসা খানের রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি তার বংশীয় পরিচয়ও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মায়ের সূত্রে তিনি ছিলেন হোসেন শাহি বংশের শেষ স্বাধীন সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের নাতি। ফলে তিনি শুধু একজন আঞ্চলিক ভুঁইয়া নন, স্বাধীন বাংলা সুলতানাতের রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারেরও একজন গুরুত্বপূর্ণ ধারক হিসেবে বিবেচিত হন। এ কারণেই মোগল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার ইতিহাসে ঈসা খানের নাম আজও অনন্য মর্যাদায় স্মরণীয়।
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে উপমহাদেশে প্রতিরোধ ছিল দীর্ঘ, বহুমাত্রিক ও ধারাবাহিক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভের পর অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়, জমিদারি শোষণ, নীলকরদের অত্যাচার, কৃষকদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ এবং ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক নীতির ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এরই প্রেক্ষাপটে অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীজুড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক বিদ্রোহ এবং গণআন্দোলন গড়ে ওঠে।
১৭৬৩-১৮০০ সালের ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ১৭৭৬-১৭৮৭ সালের চাকমা বিদ্রোহ, ১৭৮৩ সালের রংপুর কৃষক বিদ্রোহ, ১৮১৮-১৮৫৭ সালের ফরায়েজী আন্দোলন, ১৮১৮-১৮৭০-এর দশক পর্যন্ত ওহাবি আন্দোলন, ১৮৩১ সালের তিতুমীরের আন্দোলন, ১৮৫৫-১৮৫৬ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ, ১৮৫৯-১৮৬০ সালের নীল বিদ্রোহ এবং ১৮৭৩-১৮৭৬ সালের পাবনা কৃষক বিদ্রোহ এ ধারার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
এসব আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি ছিল মূলত কৃষক, শ্রমজীবী, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। তবে অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতা, স্থানীয় অভিজাত এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এসব বিদ্রোহের উদ্দেশ্য ও চরিত্র সর্বত্র এক ছিল না। কোনোটি অন্যায় কর ও জমিদারি নিপীড়নের বিরুদ্ধে কৃষকদের অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষার সংগ্রাম, কোনোটি ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলন, আবার কোনোটি প্রত্যক্ষভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নিয়েছিল। তবে সামগ্রিকভাবে এগুলো ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা, তার সহযোগী দেশীয় স্বার্থগোষ্ঠী এবং শোষণমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল।
ইতিহাসবিদদের মধ্যে এসব আন্দোলনের চরিত্র নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। কেউ এগুলোকে আঞ্চলিক, বিচ্ছিন্ন বা সাম্প্রদায়িক বিদ্রোহ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, অন্য অনেক গবেষক এগুলোকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের ধারাবাহিক প্রতিরোধের অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তাদের মতে, এসব বিদ্রোহের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে রাজনৈতিক সচেতনতা, সংগঠিত প্রতিরোধের মানসিকতা এবং ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী মনোভাব বিকশিত হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
তিতুমীরের আজাদী আন্দোলন (১৮২৭-১৮৩১)
উনিশ শতকের প্রথম ভাগে বাংলায় ব্রিটিশ শাসন, জমিদারি নিপীড়ন এবং নীলকরদের শোষণের বিরুদ্ধে যে কয়টি গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলন গড়ে ওঠে, তিতুমীরের আন্দোলন তার অন্যতম। সৈয়দ নিসার আলী (তিতুমীর) ১৮২৭ সালে হজ থেকে দেশে ফিরে প্রথমে ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম সমাজে ধর্মীয় অনুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করা। অল্প সময়ের মধ্যেই তার আহ্বানে বিপুলসংখ্যক কৃষক, তাঁতি ও নিম্নবিত্ত মানুষ সংগঠিত হতে থাকে।
কিন্তু স্থানীয় জমিদারদের নিপীড়ন, বৈষম্যমূলক কর আরোপ, বিশেষ করে মুসলমানদের ওপর ‘দাড়ি কর’ আরোপ এবং কৃষকদের ওপর অব্যাহত নির্যাতনের ফলে আন্দোলনের চরিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের গণ্ডি অতিক্রম করে এটি কৃষক-প্রজাদের অধিকার রক্ষা এবং ব্রিটিশ-সমর্থিত জমিদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রতিকার না পেয়ে তিতুমীরের অনুসারীরা সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ গ্রহণ করে।
১৮৩১ সালের অক্টোবরে নারিকেলবেড়িয়ায় বাঁশের তৈরি একটি সুদৃঢ় দুর্গ নির্মাণের মাধ্যমে আন্দোলন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। তারা আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে এবং চব্বিশ পরগনা ও নদীয়া জেলার বহু এলাকায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ব্রিটিশ বাহিনীর একাধিক অভিযান ব্যর্থ হলে প্রশাসন বৃহৎ সামরিক শক্তি নিয়ে আন্দোলন দমনের উদ্যোগ নেয়। ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর নারিকেলবেড়িয়ার চূড়ান্ত যুদ্ধে বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়। তিতুমীর শহীদ হন, তার প্রধান সহচর গোলাম মাসুমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং বহু অনুসারীকে কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়।
যদিও এই আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবু বাংলার ইতিহাসে এর তাৎপর্য গভীর। এটি ছিল ধর্মীয় সংস্কার, কৃষকের অর্থনৈতিক অধিকার এবং ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী প্রতিরোধের সমন্বিত আন্দোলন। সমসাময়িক সরকারি নথিতে আন্দোলনের সূচনাপর্বকে স্থানীয় কৃষক ও তাঁতিদের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, পরবর্তীকালে এটি ব্রিটিশ শাসন ও তার সহযোগী জমিদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক সুসংগঠিত গণবিদ্রোহে পরিণত হয়। বাংলার কৃষকসমাজকে সংগঠিত করা এবং পরবর্তী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের জন্য প্রেরণা জোগানোর ক্ষেত্রে তিতুমীরের আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মাইলফলক।
বহুমুখী প্রতিরোধের ধারা : ফরায়েজী আন্দোলন (১৮১৮–১৮৬২)
উনিশ শতকে বাংলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, জমিদারি শোষণ এবং সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলন ছিল ফরায়েজী আন্দোলন। হাজী শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বে ১৮১৮ সালের দিকে এ আন্দোলনের সূচনা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম সমাজকে কুসংস্কার, অনৈসলামিক প্রথা ও ধর্মীয় বিচ্যুতি থেকে মুক্ত করে ইসলামের মৌলিক ফরজ বিধান পালনে উদ্বুদ্ধ করা। ‘ফরজ’ শব্দ থেকেই ‘ফরায়েজী’ নামের উৎপত্তি।
ফরায়েজী আন্দোলনের আদর্শিক ভিত্তি নির্মাণে শাহ আবদুল আজিজ দেহলভীর চিন্তাধারার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল। তিনি ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতকে ‘দারুল হারব’ ঘোষণা করে মত প্রকাশ করেন যে, মুসলিম শাসন ও ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ায় জুমা ও ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত আর অবশিষ্ট নেই। হাজী শরীয়তুল্লাহও এই মত গ্রহণ করেন এবং তার অনুসারীদের জুমা ও ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। এর মাধ্যমে তিনি একদিকে ইসলামি শরিয়তের বিধান পালনের প্রশ্নকে সামনে আনেন, অন্যদিকে ব্রিটিশ শাসনের বৈধতাকেও প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে আন্দোলনটি কেবল ধর্মীয় সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে একটি আদর্শিক অবস্থানও গ্রহণ করে।
প্রথম পর্যায়ে আন্দোলনটি ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও, খুব দ্রুত এটি বাংলার সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে রূপ নেয়। ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় জমিদার, নীলকর ও মহাজনদের অত্যাচার, অতিরিক্ত খাজনা আদায় এবং কৃষকদের ওপর নানা অবৈধ কর আরোপের বিরুদ্ধে ফরায়েজীরা সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। হাজী শরীয়তুল্লাহ ঘোষণা করেন, অন্যায় ও ইসলামবিরোধী কর আদায় বৈধ নয়; ফলে আন্দোলনটি নিপীড়িত কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
১৮৪০ সালে হাজী শরীয়তুল্লাহর মৃত্যুর পর ছেলে মুহসিনউদ্দিন দুদু মিয়া আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তার সময়ে ফরায়েজী আন্দোলন আরও সুসংগঠিত ও গণমুখী হয়ে ওঠে। তিনি পূর্ববাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলেন এবং কৃষকদের সংগঠিত করে জমিদার ও নীলকরদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ফরায়েজীদের প্রভাব ফরিদপুর, ঢাকা, বাকেরগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ পূর্ববাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বহু স্থানে কৃষকেরা অন্যায় খাজনা দিতে অস্বীকার করে এবং জমিদারদের কর্তৃত্বকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানায়।
ফরায়েজী আন্দোলনের চরিত্র নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ একে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন হিসেবে দেখেছেন, আবার অনেকে এটিকে কৃষকসমাজের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। বাস্তবে আন্দোলনটি ছিল ধর্মীয় সংস্কার, সামাজিক পুনর্গঠন, কৃষকের অধিকার রক্ষা এবং ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, এই চারটি ধারার অনন্য সমন্বয়। বাংলার গ্রামীণ সমাজে আত্মমর্যাদা, সংগঠন শক্তি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধের যে চেতনা এই আন্দোলন সৃষ্টি করেছিল, তা পরবর্তী ব্রিটিশবিরোধী গণ-আন্দোলনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সিলেটের মহররম বিদ্রোহ (১৭৮২)
বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের সূচনাকালে সিলেটে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, তার মধ্যে ১৭৮২ সালের মহররম বিদ্রোহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভের পর সিলেটের ভূমি রাজস্ব নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনে। মোগল আমলে সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় সিলেটে তুলনামূলকভাবে কম রাজস্ব আদায় করা হতো এবং স্থানীয় জমিদার ও প্রজাদের ওপর শোষণও ছিল না। কিন্তু কোম্পানি শাসন প্রতিষ্ঠার পর অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই রাজস্বের হার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করা হয়। এর ফলে ভূস্বামী, তালুকদার, কৃষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
১৭৭৮ সালে রবার্ট লিন্ডসে সিলেটের কালেক্টর নিযুক্ত হওয়ার পর রাজস্ব আদায় আরো বৃদ্ধি পায় এবং প্রশাসনিক কঠোরতাও বেড়ে যায়। অতিরিক্ত খাজনা, কোম্পানির শোষণমূলক রাজস্বনীতি এবং ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের দমনমূলক আচরণের কারণে সিলেটে বিদ্রোহী পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতেই ১৭৮২ সালের মহররম উপলক্ষে ব্রিটিশবিরোধী একটি সংগঠিত আন্দোলনের সূচনা হয়। সমসাময়িক সরকারি নথি থেকে জানা যায়, বিদ্রোহের প্রস্তুতিতে সিলেট শহরের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল এবং আন্দোলনটি কেবল ধর্মীয় আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বরং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক রাজনৈতিক প্রতিরোধে রূপ নিয়েছিল।
বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন সৈয়দ মুহাম্মদ হাদী (হাদা মিয়া) ও তার ভাই সৈয়দ মুহাম্মদ মেহেদী (মাদা মিয়া)। মহররমের দিন বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ বাহিনীর মুখোমুখি হলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। বিদ্রোহীদের কাছে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র না থাকলেও তারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে। ব্রিটিশ বাহিনীর গুলিতে হাদা মিয়া, মাদা মিয়াসহ বহু বিদ্রোহী শহীদ হন। সংঘর্ষের পর ব্রিটিশ প্রশাসন ব্যাপক ধরপাকড় চালায় এবং শহীদদের দাফনেও প্রথমে বাধা দেয়। তবে জনরোষের মুখে পরে দাফনের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়।
সামরিকভাবে এই বিদ্রোহ সফল না হলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। এটি ছিল সিলেটে ব্রিটিশ শাসন, অস্বাভাবিক রাজস্বনীতি এবং ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম সুসংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধগুলোর একটি। কৃষক, জমিদার, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে একটি বিস্তৃত গণপ্রতিরোধে রূপ দেয়। পরবর্তী সময়ে সিলেট অঞ্চলে সংঘটিত অন্যান্য ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও মহররম বিদ্রোহ প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে এবং বাংলার স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
সিপাহি বিদ্রোহ (১৮৫৭) : বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা
সিপাহি বিদ্রোহ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে উপমহাদেশের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ। এই বিদ্রোহে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের চট্টগ্রাম, ঢাকা, সিলেট, যশোর, রংপুর, পাবনা, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল।
মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে ব্যারাকপুরে বিদ্রোহের সূচনা হওয়ার পর এর প্রভাব দ্রুত উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামের পদাতিক বাহিনী প্রকাশ্য বিদ্রোহ করে। তারা কারাগারের বন্দিদের মুক্ত করে, অস্ত্রাগার ও গোলাবারুদ দখল করে, কোষাগার লুট করে এবং ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনায় আঘাত হেনে ত্রিপুরার দিকে অগ্রসর হয়। একই সময়ে ঢাকার লালবাগে সিপাহিরা নিরস্ত্রীকরণের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
সিলেট, যশোর, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহে পলাতক সিপাহিদের সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীর একাধিক সংঘর্ষ ঘটে। গ্রেপ্তার সিপাহিদের সংক্ষিপ্ত সামরিক বিচারে ফাঁসি, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও নির্বাসনের মতো কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। এই বিদ্রোহে আলেম, মৌলভি, মুজাহিদ ও সাধারণ মুসলমানের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। তাদের কাছে এটি ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম। বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর মুসলিম সমাজের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন নেমে আসে এবং বহু আলেম ও সাধারণ মানুষ নির্মম নির্যাতনের শিকার হন।
অন্যদিকে বাংলার জমিদার ও জোতদার শ্রেণির একটি বড় অংশ ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহ দমনে সহযোগিতা করে এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন উপাধি ও পুরস্কার লাভ করে। সিপাহি বিদ্রোহ যদিও সামরিক দিক থেকে সফল হয়নি, তবুও বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সংঘটিত প্রতিরোধ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিরোধের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে সিপাহি বিদ্রোহ।
ভাষা আন্দোলন (১৯৪৭-১৯৫৬) : বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সংগ্রাম
ভাষা আন্দোলন ছিল বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও বাংলাদেশের মানুষের ভাষাগত অধিকারের দাবিতে পরিচালিত এক ঐতিহাসিক গণআন্দোলন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণের প্রশ্নে বিরোধ সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও উর্দুভাষী বুদ্ধিজীবীরা উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নিলেও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করার জোর দাবি জানায়। তাই ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাশেমের উদ্যোগে তমদ্দুন মজলিস প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠন, যা পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিকে সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করে। প্রতিষ্ঠার অল্পদিন পরই সংগঠনটি ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা: বাংলা না উর্দু?’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ পুস্তিকা প্রকাশ করে। এতে যুক্তি দিয়ে দেখানো হয়, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাতৃভাষা বাংলা হওয়ায় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি পাওয়াই যৌক্তিক। এই পুস্তিকা ভাষা প্রশ্নে জনমত গঠনে এবং শিক্ষিত সমাজের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীকালে তমদ্দুন মজলিস রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি এবং ভাষা আন্দোলনের আদর্শিক ভিত্তি নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে খাজা নাজিমুদ্দীন ঘোষণা করেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু। এর প্রতিবাদে ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। ৩১ জানুয়ারি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়, যার আহ্বায়ক ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব। সরকার আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব দিলে তার বিরুদ্ধেও ব্যাপক প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করে।
সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে সমাবেশ নিষিদ্ধ করলেও ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রনেতা আবদুল মতিন ও গাজীউল হকের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা ১৪৪ ধারা অমান্য করে মিছিল বের করলে পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং পরবর্তী সময়ে গুলি চালায়। এতে রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার, আবুল বরকত, আবদুস সালাম এবং কিশোর অহিউল্লাহসহ অনেকে শহীদ হন। ২২ ফেব্রুয়ারি শফিউর রহমানও পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। শহীদদের স্মরণে ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে স্থায়ী রূপ লাভ করে।
ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিক সংগ্রামের ফলস্বরূপ ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় ও স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করে। পরবর্তীকালে এই আন্দোলন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রেরণায় পরিণত হয়।
মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) : বাংলাদেশের গণ-আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ, সাংস্কৃতিক নিপীড়ন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক গণ-আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে জনগণের রায় উপেক্ষার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যেই ক্ষোভের বিকাশ ঘটেছিল, ১৯৭১ সালে তা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ লাভ করে। তাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সর্বজনীন গণ-আন্দোলন, যেখানে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বাধীনতার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হলে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা ও প্রশাসনের অধিকাংশ ক্ষেত্র বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী পরিচালিত হতে থাকে। কার্যত পূর্ব পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ে এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে একটি অভূতপূর্ব গণ-আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ভাষণ সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে এবং মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করে।
জনগণের এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দমন করতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা এবং ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। এই গণহত্যার পর সারা দেশে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। বাংলাভাষী সেনা, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং দেশকে মুক্ত করার আহ্বান জানান।
মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশিরা সীমিত অস্ত্র ও সামান্য সামরিক প্রস্তুতি নিয়েও প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরবর্তীকালে সংগঠিত মুক্তিবাহিনী গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগব্যবস্থা, সামরিক স্থাপনা ও রসদ সরবরাহে ধারাবাহিক আঘাত হানে। একই সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং নারী নির্যাতনের ফলে প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এই মানবিক বিপর্যয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি করে।
৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে দেশের আপামর জনগণের আত্মত্যাগ, প্রতিরোধ ও ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণই ছিল বিজয়ের মূল শক্তি। ছাত্র, যুবক, কৃষক, শ্রমিক, নারী, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, পুলিশ, ইপিআর এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য—সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে অবদান রাখেন। দীর্ঘ সংগ্রাম ও অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হয়। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির দীর্ঘ গণআন্দোলনের সফল পরিণতি হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করে।
১৯৯০ সালের গণআন্দোলন : জনগণের বিজয়, স্বৈরাচারের পরাজয়
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ (এইচ এম) এরশাদ।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন এরশাদ। এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অধ্যায়। গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার হরণ করা হয়। কিন্তু দেশের মানুষ নীরব থাকেনি, বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি এবং ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ ধারাবাহিক আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
১৯৯০ সালের অক্টোবর থেকে আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ২১ নভেম্বর আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বামপন্থি জোট যৌথ রূপরেখা ঘোষণা করে। কোনো জোটে না থেকেও জামায়াতে ইসলামী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। রাজনৈতিক ঐক্য ও জনগণের অপ্রতিরোধ্য জাগরণে এরশাদ সরকারের ভিত কেঁপে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ৬ ডিসেম্বর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
এই বিজয় সহজে আসেনি। নূর হোসেন, ডা. শামসুল আলম খান মিলন, সেলিম, দেলোয়ার, তাজুলসহ অসংখ্য শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে এই আন্দোলন।
মেজর জেনারেল (অব.) মনজুর রশীদ খান তার ‘এরশাদের পতন ও সাহাবুদ্দীনের অস্থায়ী শাসন কাছ থেকে দেখা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘ক্ষমতাসীনদের অনেকেই তখনো বিশ্বাস করতেন এরশাদ সরকারের নিয়ন্ত্রণ অটুট। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলেছে। জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কাছে সব দমননীতি, সব আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়েছিল।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


