ঢাকা কবে রাজধানী হয়েছিল

ঢাকা কবে রাজধানী হয়েছিল

ইসলাম খানের বাংলা আগমনের বিবরণ বাহারিস্তানে গায়েবিতে মির্জা নাথান উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি নির্দিষ্ট কোনো তারিখ উল্লেখ করেননি। তিনি বলেছেন, জাহাঙ্গীর কুলি খানের মৃত্যুর পর ইসলাম খানকে বাংলার সুবেদার নিযুক্ত করা হয়। শাহি ফরমান পেয়েই তিনি জানতে পারেন, তাকে বাংলার সুবেদারের পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তাই এই দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তিনি সসম্ভ্রমে এগিয়ে যান।… সেখান থেকে তিনি বিরাট সৈন্যবাহিনী, বড় একটি হস্তিবাহিনী এবং নৌবহর নিয়ে বাংলার উদ্দেশে যাত্রা করেন। কয়েক দিন চলার পর তিনি এক শুভ মুহূর্তে ‘আকবরনগর’ (রাজমহল) পৌঁছান। [বাহারিস্তানে গায়েবি, মির্জা নাথান, খালেকদাদ চৌধুরী (অনুবাদক), খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩০]

সুবেদার ইসলাম খান চিশতি ১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসের ১৫ তারিখে ঘোড়াঘাট থেকে ভাটির উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু ঠিক কবে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করেছিলেন, সে বিষয়ে গবেষকরা কয়েকটি মত দিয়ে থাকেন। মুনশি রহমান আলী তায়েশ, উইলিয়াম হান্টার, ওয়াল্টার হ্যামিলটন, এআই বোরাহ (বাহারিস্তানে গায়েবির অনুবাদক), যতীন্দ্রমোহন রায় ও আহমদ হাসান দানী বলেছেন, ১৬০৮ সালে ঢাকা রাজধানী হয়েছিল। তাদের মতে, ইসলাম খান চিশতির বাংলার সুবেদার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তির সালই ঢাকার রাজধানী হওয়ার সূচনাকাল; তাই তারা উভয় ঘটনাকে একই সাল হিসেবে গণ্য করেছেন। মুনশি রহমান আলী তায়েশ লিখেছেন, ‘কুতুবুদ্দিনের পরে ১৬০৮ সালে শায়খ আলাউদ্দিন ইসলাম খান বাংলার নিজামত (প্রাদেশিক শাসনের দায়িত্ব) লাভ করেন। বাংলায় এসেই তিনি (রাজধানী হিসাবে) ঢাকা শহরের ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি নিজামতের সব সদর দপ্তর ও রাজ্যের সব উপকরণ রাজমহল থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন।’ [তাওয়ারিখে ঢাকা, এ.এ.এ. শরফুদ্দিন (অনুবাদক), পৃষ্ঠা: ৪২]

বিজ্ঞাপন

আহমাদ হাসান দানী বলেছেন, ‘নতুন রাজধানী স্থাপনের শুরু হিসেবে একটা তারিখই গ্রহণ করা যেতে পারে। আর সেটা হলো ১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দের জুলাইয়ের শেষ দিকে, যখন ইসলাম খান ঢাকায় পদার্পণ করেছিলেন।’ (ঢাকা : এ রেকর্ডস অব ইটস চেঞ্জিং ফরচুন, পৃষ্ঠা: ৩১)

আরসি মজুমদার, রিচার্ড ইটন, সুধীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, তপন রায় চৌধুরী ও অন্যরা বলেছেন, ১৬১২ সালে ঢাকায় রাজধানী স্থাপিত হয়েছিল। সম্ভবত তাদের বিবেচনায় মুসা খান ও বারো ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের পর ইসলাম খানের ঢাকায় কার্যকর শাসন প্রতিষ্ঠার সালটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল; তাই তারা সেই সালকেই গ্রহণ করেছেন। ১৬১০ সালে যারা ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের বিষয়ে মত দিয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম আবদুল করিম ও মোহর আলী।

ঢাকা কখন রাজধানী হয়েছিল, সেটা বিশ্লেষণ করেছেন আবদুল করিম। তিনি বলেছেন, ‘বাংলার মোগল রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের তারিখ ও কারণ সম্পর্কে আধুনিক পণ্ডিতরা অভিন্ন মত প্রকাশ করেননি। চার্লস স্টুয়ার্ট ১৮৯৩ সালে বলেন, বাংলার ভাটি অঞ্চলে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের দমনের প্রয়োজনে রাজমহল থেকে ঢাকায় (পূর্ব বাংলায়) রাজধানী স্থানান্তর করা হয়। মির্জা নাথান বাহারিস্তানে গায়েবি গ্রন্থে মুসা খান ও উসমান খানের মতো বিদ্রোহী সামন্ত প্রধানকে দমনের কথা বলেছেন। কিন্তু মগ ও পর্তুগিজদের কথা তিনি কিছুই বলেননি। অতএব মনে হয়, ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তরের কারণ ছিল বিদ্রোহী জমিদার ও সামন্ত প্রধানদের (ভূঁইয়াদের) দমন। ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তরের তারিখ সম্পর্কে তুজুকে জাহাঙ্গীরী, ইকবালনামা এবং আবদুল লতিফের রোজনামচার ভিত্তিতে এসএন ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাংলার সুবাদার হিসেবে ইসলাম খানের নিয়োগ এবং ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর একই সময়ে সংঘটিত হয়েছিল। ১৬০৮ সালে (এপ্রিল-মে মাসে) বর্ষা শুরুর দিকে ইসলাম খান সুবাদার হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন এবং আনুমানিক ১৬১০ সালের মাঝামাঝিতে তিনি ঢাকায় পৌঁছেন। .. ইসলাম খানের ঢাকায় প্রবেশের পরপরই অনানুষ্ঠানিকভাবে ঢাকার নামকরণ করা হয় জাহাঙ্গীরনগর; কিন্তু উসমান খান আফগানের পরাজয়ের পর সুবা বাংলার রাজধানী হিসেবে রাজমহলের স্থলে ঢাকা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে।’ (মোগল রাজধানী ঢাকা, আবদুল করিম, পৃষ্ঠা: ৭-৮)

এসএন ভট্টাচার্যের এই মন্তব্য সার্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের নির্দিষ্ট তারিখ কোনো সূত্রেই উল্লেখ নেই। তুজুকে জাহাঙ্গীরী বা বাহারিস্তানে গায়েবি, কোথাও বলা হয়নি, ইসলাম খান ঢাকায় কখন রাজধানী স্থাপন বা স্থানান্তরিত করেন। সুতরাং রাজধানী কি পর্যায়ক্রমে স্থানান্তরিত হয়, নাকি ইসলাম খান ঢাকায় পদার্পণ করার সঙ্গেই ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে—এ বিষয়ে জোর দিয়ে কিছু বলা যায় না।

তবে ইসলাম খানের ঢাকা পৌঁছার পরেই মির্জা নাথান ঢাকাকে জাহাঙ্গীরনগর নামে অভিহিত করেন। আবদুল লতিফের ডায়েরি এবং বাহারিস্তানে দেখা যায়, সুবাদার রাজমহল থেকে ভাটিতে আসার সময় প্রাদেশিক সব কর্মকর্তাকে সঙ্গে আনেন এবং সুবেদারসহ সকল কর্মকর্তা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড যাত্রাপথেই সমাধা করেন। প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য তাকে রাজমহলে ফিরে যেতে হয়নি। কাজেই সুবেদার ও প্রাদেশিক কর্মকর্তারা ঢাকায় পৌঁছার সঙ্গেই যে ঢাকা রাজধানীতে পরিণত হয়, এতে সন্দেহ করার অবকাশ কম। মির্জা নাথান ইসলাম খানের ঢাকা পৌঁছার সঙ্গেই ঢাকাকে জাহাঙ্গীরনগর নামে উল্লেখ করা থেকেও এর সমর্থন মেলে। মনে করা হয়, ঢাকা পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম খান ঢাকাকে রাজধানী ঘোষণা করেন এবং জাহাঙ্গীরনগর নাম রাখেন ।

আর ইসলাম খান ঢাকা পৌঁছেছিলেন ১৬১০ সালের জুলাই মাসে। কাজেই এ কথা বলা ভুল হবে না যে, ১৬১০ সালের জুলাই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে।

বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে আগস্ট মাসে রাজধানী ঢাকার প্রতিষ্ঠা উৎসব উদযাপনের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কিন্তু ঐতিহাসিক সূত্রগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজধানী হিসেবে ঢাকার প্রতিষ্ঠা আগস্টে হয়েছিল, এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। প্রতিষ্ঠাবছর নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও প্রতিষ্ঠার মাসের ক্ষেত্রে প্রায় সবাই জুলাইকেই উল্লেখ করেছেন। ফলে ইতিহাসসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে রাজধানী ঢাকার প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে উৎসব, আলোচনা ও আনুষ্ঠানিক আয়োজন জুলাই মাসেই হওয়া উচিত। ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই অবস্থান গ্রহণই হবে অধিক যুক্তিসঙ্গত ও সময়ের দাবি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন