বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের প্রভাব শত শত বছর পরও আজ উজ্জ্বল। ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা ইসলাম খান চিশতি তাদের অন্যতম। তার হাতেই ঢাকা একটি প্রাদেশিক জনপদ থেকে বাংলার রাজধানীতে পরিণত হয়। প্রশাসনিক দক্ষতা, সামরিক প্রজ্ঞা, দৃঢ় নেতৃত্ব এবং সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রচিন্তার মাধ্যমে তিনি এমন একটি নগরভিত্তি নির্মাণ করেন, যার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী সময়ে ঢাকা ক্রমশ বিস্তৃত হয়ে আজকের মহানগরে পরিণত হয়েছে।
ইসলাম খানের প্রকৃত নাম ছিল শায়খ আলাউদ্দিন ইসলাম খান চিশতি ফারুকী। তার নামের প্রতিটি অংশই তার পরিচয় বহন করে। গভীর আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি প্রতিষ্ঠিত চিশতি তরিকার শায়েখ হিসেবে তিনি সেকালে ‘শায়খ’ নামে পরিচিত ছিলেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইসলামের জন্য নিবেদিত জীবনযাপনের স্বীকৃতিস্বরূপ মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর তাকে ‘ইসলাম খান’ উপাধিতে ভূষিত করেন। কারো কারো মতে, তিনি চিশতি তরিকার একজন পীর হওয়ায় ‘চিশতি’ উপাধিতে পরিচিতি লাভ করেন। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর বংশধর হিসেবে তাকে ইতিহাসের প্রাচীন গ্রন্থগুলোয় ‘ফারুকী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায়, তিনি মুজাদ্দিদে আলফে সানি শায়খ আহমাদ সিরহিন্দির আদর্শের অনুরাগী ছিলেন। এমন একজন মহান মনীষীর হাতেই রাজধানী ঢাকার প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের ভিত্তি রচিত হয়।
শিক্ষা
ইসলাম খানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পর্কে বিশদ তথ্য পাওয়া না গেলেও তার জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, তিনি তৎকালীন শিক্ষাধারায় উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। বাংলায় তার সামরিক অভিযান ও প্রশাসনিক সাফল্যও প্রমাণ করে, রণকৌশলেও তিনি ছিলেন অসাধারণ দক্ষ।
তিনি দক্ষিণ ভারতের একটি প্রসিদ্ধ সুফি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ফলে শৈশবেই কোরআন-হাদিসসহ ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত হন বলে ধারণা করা হয়। একই সঙ্গে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। সে সময় সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার সূচনা হতো এই দুই ভাষার নিবিড় অধ্যয়নের মাধ্যমে।
আরো একটি বিষয় তার শিক্ষার গভীরতার সাক্ষ্য বহন করে। তিনি ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের বাল্যবন্ধু। শৈশব ও কৈশোরে তারা একসঙ্গে বেড়ে উঠেছিলেন। সম্রাট আকবর নিজে নিরক্ষর হলেও শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। ফলে অশিক্ষিত বা বিদ্যাচর্চাবিমুখ কাউকে তিনি কখনোই তার পুত্রের নিকটতম সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করতেন না। এ থেকেই প্রতীয়মান হয়, ইসলাম খান শৈশব থেকেই একজন শিক্ষানুরাগী ও বিদ্বান ব্যক্তি ছিলেন।
ব্যক্তি ও চরিত্র
ইসলাম খানের চরিত্র সম্পর্কে সমসাময়িক ও পরবর্তী ঐতিহাসিকদের মূল্যায়ন অত্যন্ত প্রশংসাসূচক। তাকে উৎকৃষ্ট স্বভাব, মহৎ গুণাবলি এবং বন্ধু-স্বজনদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তার জীবন ছিল সংযম, গাম্ভীর্য ও নৈতিকতার এক অনন্য উদাহরণ। তিনি জীবনে কখনো মদপান বা ইসলামে নিষিদ্ধ কোনো কাজে অংশ নেননি। তার উদারতা এতই প্রসিদ্ধ ছিল যে, আরবের কিংবদন্তি দানবীর হাতেম তাই ও মানের উদারতার কাহিনিও তার উদারতার তুলনায় ম্লান হয়ে যেত। ব্রিটিশ লেখক বি সি অ্যালেনও তাকে একজন গভীর ধর্মপরায়ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সুবাদার হিসেবে রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষায় তিনি রাজকীয় আচার-অনুষ্ঠান অনুসরণ করতেন।
সুধীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মূল্যায়নে দেখা যায়, বয়সে তরুণ এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম হলেও তিনি ছিলেন ব্যক্তিগতভাবে সাহসী, সংযমী, কর্মনিষ্ঠ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও বিচক্ষণ। সংকটকালে তার ধীর বিচারবুদ্ধি এবং সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করার ক্ষমতা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। একই সঙ্গে তার দৃঢ় কর্তৃত্ববোধ, শাসকসুলভ ব্যক্তিত্ব এবং প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেও তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইসলাম খানের ব্যক্তিত্বের অন্যতম উজ্জ্বল দিক ছিল তার অসাধারণ দানশীলতা। সমসাময়িক বিবরণে উল্লেখ আছে, তিনি অত্যন্ত উদারহস্তে দান করতেন। তার পাশে রাজকীয় কর্মচারীরা রত্ন ও মূল্যবান মণিমুক্তাভর্তি থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন, আর তিনি দুই হাতে সেগুলো মানুষকে উপহার হিসেবে বিতরণ করতেন।
পোশাক-পরিচ্ছদে তিনি ছিলেন অভিজাত রুচির ধারক। মাথায় পাগড়ির নিচে টুপি পরিধান করতেন এবং কোর্তার ওপর নকশাদার কটি পরতেন। তার খাবারে প্রথমে পরিবেশন করা হতো ভুট্টা বা জোয়ার-বাজরার রুটি, শাকসবজি এবং ‘সাথি’ নামে পরিচিত শুকনো চালের ভাত।
তার ভোজনের আয়োজন থেকেই প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মানুষের আহারের ব্যবস্থা হতো।
ইসলাম খানের আমলে ঢাকা
বাংলার রাজধানী হিসেবে ঢাকা গড়ে ওঠে সুবাদার ইসলাম খানের সুপরিকল্পিত উদ্যোগে। তিনি নগর গঠনের কেন্দ্র হিসেবে নির্বাচন করেন ঢাকার পুরোনো দুর্গ বা কেল্লাকে, যার অবস্থান ছিল বর্তমান পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে। দুর্গটির পূর্ব ও পশ্চিমে দুটি প্রবেশদ্বার ছিল এবং এর অভ্যন্তরে একটি টাঁকশাল স্থাপিত ছিল। এই দুর্গকে কেন্দ্র করেই রাজধানীর প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক বিকাশের সূচনা হয়।
দুর্গের চারপাশে গড়ে ওঠে বাদশাহি বাজার, যা বর্তমানে চকবাজার নামে পরিচিত। পীলখানায় ছিল মোগলদের হাতিশালা এবং মাহুতটুলিতে বাস করতেন সেই হাতিগুলোর মাহুতেরা। বকশীবাজার ও দেওয়ানবাজারে বসবাস করতেন উজির, দেওয়ানসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। দুর্গসংলগ্ন উর্দু বাজার, গিরদে কেল্লা ও আতশখানা আজও মোগল আমলের স্মৃতি বহন করে। ইসলাম খানের সঙ্গে আগত নবাব ও আমিরদের আবাস গড়ে ওঠে নবাবপুরে। তিনি নিজে প্রায়ই ‘চাঁদনী’ বা ‘ফতে দরিয়া’ নামের রাজকীয় বজরায় অবস্থান করতেন। সেই বজরার নোঙরস্থল থেকেই ‘চাঁদনীঘাট’-এর নামকরণ হয়।
রমনা অঞ্চলও ইসলাম খানের আমলেই নতুন রূপ লাভ করে। সেখানে সুজাতপুর ও কিশ্চিয়ান নামে দুটি মহল্লা প্রতিষ্ঠিত হয়। সুজাতপুর বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন ও শিখ গুরুদুয়ারা এলাকার আশপাশে অবস্থিত ছিল। সেখানে দ্বিতল ও ত্রিতল ভবন, বাংলো এবং সভাগৃহ নির্মিত হয়েছিল। কিশ্চিয়ান মহল্লাকে সম্ভবত ঢাকার প্রাচীনতম খ্রিষ্টান বসতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একই অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাগে পাদশাহি’ বা বর্তমান শাহবাগের ঐতিহাসিক উদ্যান। সৈন্যাধ্যক্ষ সুজাত খান চিশতি রুস্তমে জামানের নামানুসারে সুজাতপুরের নামকরণ করা হয় এবং মৃত্যুর পর সম্ভবত তার সমাধিও ওই এলাকাতেই নির্মিত হয়েছিল।
ঐতিহাসিকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসলাম খানের সময় ঢাকা পশ্চিমে চকবাজার থেকে পূর্বে সদরঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। নগরটি প্রধানত বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে বিকশিত হয় এবং সেখান থেকেই রাজধানী হিসেবে ঢাকার পরবর্তী সম্প্রসারণের ভিত্তি রচিত হয়।
ইসলাম খানের নির্মিত স্থাপনা ও অবকাঠামো
মোগল সাম্রাজ্যে রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলোয় সুবাদারদের অন্যতম দায়িত্ব ছিল প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটাতে দুর্গ, প্রাসাদ, সড়ক এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা। ইসলাম খানও এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে তার শাসনকাল কেটেছে বিদ্রোহ দমন, রাজধানী স্থানান্তর এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের ব্যস্ততায়। ফলে মিরজুমলা বা শায়েস্তা খানের মতো দীর্ঘস্থায়ী শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তিনি পাননি। এ কারণে বৃহৎ ও কারুকার্যমণ্ডিত স্থাপত্য নির্মাণের সুযোগও তার তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।
তবু তার উদ্যোগে ঢাকায় একটি নতুন দুর্গ নির্মিত হয়, যার অভ্যন্তরে ছিল রাজপ্রাসাদ। দুর্গটি সুবাদার, রাজকর্মচারী এবং সৈন্যদের আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। একই সঙ্গে রাজধানীর প্রয়োজন মেটাতে নতুন সড়কও নির্মাণ করা হয়েছিল।
দুর্গের বিপরীতে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত চাঁদনীঘাট ছিল রাজকীয় নৌবহরের নোঙরস্থল, নৌসেনাদের ওঠানামার কেন্দ্র এবং রণতরী পরিদর্শনের স্থান। দুর্গসংলগ্ন বাদশাহি বাজার, যা বর্তমানে চকবাজার নামে পরিচিত, রাজধানীর প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। এর পাশের উর্দু বাজার সেনাছাউনির প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি রাজধানীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
ইসলাম খানের স্মৃতিবাহী স্থাপনাগুলোর মধ্যে ইসলামপুর সড়ক এবং ইসলাম খান মসজিদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় ঐতিহ্য অনুসারে, ঢাকার প্রথম মোগল গভর্নর ইসলাম খানই তিন গম্বুজের এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। এর স্থাপত্যে পরবর্তী শায়েস্তাখানি শৈলীর পূর্ববর্তী বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
মৃত্যু, দাফন ও কবর স্থানান্তর
কামরূপের রাজা পরীক্ষিতের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে মোগল বাহিনীর সাফল্যের পর ইসলাম খান বিজয়োৎসব উপলক্ষে একটি জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, পরাজিত শাসকের আত্মসমর্পণ তার ঝরোকার সামনে অনুষ্ঠিত হোক এবং সমগ্র দরবার সেই দৃশ্যের সাক্ষী থাকুক। এ আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছিল। কিন্তু অনুষ্ঠানটি আর বাস্তবায়িত হয়নি।
মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল মাত্র তেতাল্লিশ বছর। মৃত্যুর দিনও তিনি সম্পূর্ণ কর্মক্ষম ছিলেন। সেদিন তিনি বনে শিকারে গিয়েছিলেন। শিকার শেষে মধ্যাহ্নভোজ গ্রহণ করে হাতির পিঠে হাওদায় চড়ে শিবিরে ফিরে আসেন। শিবিরে ফেরার পর অসুস্থতা অনুভব করেন এবং বিশ্রামে যান। সন্ধ্যার প্রায় দুই ঘণ্টা পর তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি এতটাই আকস্মিক ছিল যে, বিজয়োৎসবের প্রস্তুতি চলাকালেই বাংলার এই মহান সুবাদারের জীবনাবসান ঘটে।
তার মৃত্যুর পর শাহি কর্মচারীরা পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার মরদেহ ভাওয়াল থেকে জাহাঙ্গীরনগরের উদ্দেশে বহন করেন। পথে বরমপুরের কাছে এক স্থানে তারা বিরতি নেন। সেখানে দেওয়ান মির্জা হোসেন বেগ, শেখ হুসাঙ্গ, শেখ ভিকনসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা উপস্থিত হয়ে শোক প্রকাশ করেন। পরে তার মরদেহ জাহাঙ্গীরনগরের ‘বাগ-ই-শাহি’ উদ্যানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, এই উদ্যানটি বর্তমান হাইকোর্ট ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসংলগ্ন অঞ্চলে অবস্থিত ছিল, যার পশ্চিম প্রান্ত আজকের শাহবাগ নামে পরিচিত।
তবে তার সমাধি নিয়ে ইতিহাসে আরেকটি মতও পাওয়া যায়। একটি সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, পরবর্তীকালে তার মরদেহ তার জন্মস্থান ফতেহপুরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পূর্বপুরুষদের কবরস্থানের পাশে আবার দাফন করা হয়। আধুনিক ঐতিহাসিকদেরও একটি অংশের অভিমত, তাকে প্রথমে ঢাকায় সমাহিত করা হলেও পরে তার কফিন ফতেহপুর সিক্রিতে স্থানান্তর করে আবার সমাহিত করা হয়েছিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


