খলিফা আবু বকরের জীবনের শেষ দিনগুলো

খলিফা আবু বকরের জীবনের শেষ দিনগুলো

আজনাদাইনের যুদ্ধে বিজয় অর্জন করে সেনাপতি খালেদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী তখন এগিয়ে যায় দামেশকের দিকে। ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ২১ আগস্ট তারা দামেশক অবরোধ করে। একই সময় দামেশকের শত মাইল দূরে মদিনার শান্ত পরিবেশে নেমে আসতে শুরু করে বিষাদের ছায়া। একসময় নবীজি (সা.)-এর পদচারণায় মুখরিত মদিনার গলিগুলোয় আজ গুমোট নীরবতা। ইসলামের প্রথম খলিফা, ‘সিদ্দিকে আকবার’ আবু বকর (রা.) জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। ৭ জমাদিউল আখির ১৩ হিজরি (৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ৮ আগস্ট) থেকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। মদিনার মানুষ, যারা রিদ্দা যুদ্ধের বিভীষিকা কাটিয়ে ইসলামের সংহতি দেখেছে, তারা বুঝতে পারছিল—তাদের প্রিয় নেতা আর বেশিদিন তাদের মাঝে নেই। একদিকে শামের রণাঙ্গনে মুসলিম ঘোড়সওয়ারদের বিজয়ের সুসংবাদ, আর অন্যদিকে মদিনার মসজিদে নববির মেহরাবে ইমামের জায়নামাজে আবু বকর (রা.)-এর অনুপস্থিতি—ইতিহাসের এই দুই ধারা তখন একে অপরের সঙ্গে মিশে তৈরি করছিল এক বিষাদসিন্ধু।

বিজ্ঞাপন

তিনি রাসুলের খলিফা

আবু বকর (রা.)-এর ব্যক্তিত্বে ছিল অনন্য বৈপরীত্য। একদিকে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমলহৃদয় ও অশ্রুসজল, তেমনি সংকটের মুহূর্তে হয়ে উঠতেন পাথরের মতো অটল ও বজ্রকঠিন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর যখন সমগ্র আরব উপদ্বীপ অস্থিরতায় নিমজ্জিত, তখন আবু বকর (রা.)-ই উম্মাহকে সঠিক পথনির্দেশনা দেন। তার রাষ্ট্রনায়কত্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিল রিদ্দা যুদ্ধের ক্ষেত্রে আপসহীন নেতৃত্ব। আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, এই যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি শুধু আরবের বিদ্রোহ দমন করেননি, বরং ইসলামের বিশ্বব্যাপী বিস্তারের ভিত্তিও সুদৃঢ় করেছিলেন।

আচরণ, চরিত্র ও অবদানে তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সবচেয়ে কাছের মানুষদের একজন। তার সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আবু বকরের অনুগ্রহ ছাড়া আমি প্রত্যেকের অনুগ্রহের প্রতিদান দিয়েছি। আমার ওপর তার এমন অনুগ্রহ রয়েছে, যার প্রতিদান কিয়ামতের দিন আল্লাহই দান করবেন।’

দূরদর্শী রাষ্ট্র পরিচালনা

মদিনার মাটিতে বসে তিনি দূরদূরান্তের বিভিন্ন অঞ্চলের জটিলতা সহজভাবে সামলে নিতেন। তিনি দ্রুতগতিতে সংবাদ আদান-প্রদানের মাধ্যমে সামরিক কর্মকর্তাদের রদবদল করতেন। আরব-অনারব, শাম ও রোমের বিজয়াভিযানে অনেক হাই মিলিটারি এক্সপার্ট ব্রেইনও তার পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতা মোকাবিলা করতে পারেনি।

আবু বকর (রা.)-এর অন্যতম দূরদর্শিতা ছিল শামের কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ইসলাম যদি কেবল আরব উপদ্বীপে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা বিশ্বসভ্যতার গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারবে না। তাই রিদ্দা যুদ্ধের মাধ্যমে আরবের স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর তিনি বিলম্ব না করে বাইজেন্টাইন ও সাসানি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন। এই সিদ্ধান্ত ছিল মুসলিম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তার সততা ও অনাড়ম্বর জীবন ছিল অনুকরণীয়। খলিফা হওয়ার পর তিনি ব্যক্তিগত ব্যবসা ছেড়ে দেন এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কেবল প্রয়োজনীয় সামান্য ভাতা গ্রহণ করতেন। পুরো সময় তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যয় করতেন। মাত্র ২ বছর ২ মাস ১৪ দিনের শাসনকালেই তিনি খেলাফত রাষ্ট্রের শক্ত ভিত গড়ে দিয়েছিলেন, যার ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তী শতাব্দীতে মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তার সম্ভব হয়েছিল।

জীবনের শেষ দিনগুলো

জীবনের শেষ সময়ে খলিফা আবু বকর (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার অসুস্থতা ছিল গুরুতর। জ্বরের তীব্রতায় তিনি প্রায়ই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ছিলেন। তার অসুস্থতার প্রধান দুটি কারণ পাওয়া যায়। তাবারি ও ইবন কাসিরের মতে, ঠান্ডার দিনে গোসল করার ফলে তার শরীরে মারাত্মক ঠান্ডা লেগে নিউমোনিয়া হয়ে যায়। অন্য মত অনুসারে, খায়বার যুদ্ধের পর এক ইহুদি নারীর দেওয়া বিষের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। যাহোক, খলিফা আবু বকর অনুভব করতে পেরেছিলেন—তিনি জীবনসফরের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন।

মৃত্যুশয্যায় তিনি মেয়ে আয়েশাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সপ্তাহের কোন দিন ইন্তেকাল করেছিলেন এবং তাকে কয়টি কাপড়ে কাফন দেওয়া হয়েছিল? আয়েশা (রা.) উত্তর দিলেন, দিনটি ছিল সোমবার এবং তিনটি কাপড়ে তাকে কাফন দেওয়া হয়েছিল। আবু বকর (রা.) তখন অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে বললেন, তিনিও সোমবারেই আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান এবং তার ব্যবহৃত পুরোনো চাদরটি যেন কাফনের একটি অংশ হয়।

তার শেষ দিনগুলোয় মদিনার পরিবেশ ছিল বেদনাবিধুর। সাহাবায়ে কেরাম দল বেঁধে তাকে দেখতে আসছিলেন। আবদুর রহমান ইবনে আউফ তাকে দেখতে এলেন। খলিফা তখন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। আবু বকর (রা.) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মানুষ কি মনে করে যে আমি পার্থিব লোভের কারণে আপনাদের শাসনের দায়িত্ব নিয়েছি?’

আবদুর রহমান ইবনে আউফ তাকে আশ্বস্ত করলেন।

পরবর্তী খলিফা হবেন ‘খাত্তাবের পুত্র উমর’

আবু বকর (রা.) জানতেন, নেতৃত্বশূন্যতা উদীয়মান জাতির জন্য বিপজ্জনক। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর সায়েদা গোত্রের প্রাঙ্গণের উত্তপ্ত বিতর্ক তিনি ভোলেননি। তাই তিনি স্থির করলেন, উম্মাহর ঐক্য ধরে রাখতে নিজের জীবনকালেই যোগ্য একজন উত্তরসূরি মনোনীত করে যাবেন।

উত্তরসূরি মনোনয়নে তিনি কেবল নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেননি, বরং একটি অনানুষ্ঠানিক শুরা বা পরামর্শসভারের আয়োজন করলেন। একে একে বিশিষ্ট সাহাবিদের ডেকে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) সম্পর্কে তাদের মতামত জানতে চাইলেন। আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) বললেন, ‘উমর আপনার ধারণার চেয়েও শ্রেষ্ঠ মানুষ, কিন্তু তার চরিত্রে কিছুটা কঠোরতা আছে।’ উসমান ইবনে আফফান (রা.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বললেন, ‘উমরের ভেতরটা তার বাইরের চেয়েও সুন্দর। আমাদের মধ্যে তার মতো যোগ্য আর কেউ নেই।’

তবে তালহা (রা.) কিছুটা উমরের কঠোরতার কারণে আপত্তি তুলছিলেন। এর জবাবে খলিফা আবু বকর (রা.) উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি আল্লাহকে বলব, আমি তার বান্দাদের ওপর শ্রেষ্ঠ লোকটিকে নিয়োগ দিয়ে এসেছি।’

এরপর তিনি খলিফা উসমান (রা.)-কে ডেকে ওসিয়তনামা লিখতে বললেন। ওসিয়তনামা লেখা শুরু হলো। মাত্র এতটুকু লেখা হয়েছিল—‘আবু বকর ইবনে আবু কুহাফার পক্ষ থেকে মুসলিম উম্মাহর প্রতি এই ওসিয়ত...।’ এর মধ্যেই তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন।

উসমান (রা.) জানতেন, আবু বকর (রা.) ইতোমধ্যে উমর (রা.)-কেই পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু তিনি আশঙ্কা করলেন, খলিফার ইন্তেকালের কারণে যদি ওসিয়তনামা অসম্পূর্ণ থেকে যায়, তবে খিলাফতের প্রশ্নে মুসলিম সমাজে আবারও বিচ্ছিন্নতা দেখা দিতে পারে। তাই পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি নিজেই লিখে দিলেন, ‘আমি উমরকে আপনাদের জন্য খলিফা মনোনীত করলাম। আপনাদের কল্যাণকামিতার ব্যাপারে আমি কোনো ত্রুটি করিনি।’

আবু বকর (রা.)-এর জ্ঞান ফিরলে এটি দেখে খুবই খুশি হলেন এবং উসমান (রা.)-এর জন্য খুব দোয়া করলেন।

পরবর্তী খলিফা উমরের প্রতি বর্তমান খলিফার ওসিয়ত

এরপর তিনি উমর (রা.)-কে ডেকে আনিয়ে বললেন, ‘আমি আপনাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিদের খলিফা বানিয়ে যাচ্ছি। উমর! আল্লাহর কিছু হক রাত্রিকালীন, আর কিছু হক দিনকেন্দ্রিক। রাতের হক যেমন দিনে আদায় হয় না, তেমনি দিনের হক রাতে হয় না। আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত নফল কবুল করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত ফরজ অনাদায় থাকে।’

যেহেতু উমরের ক্রোধ ও কঠোরতার কারণে কিছু সাহাবির মনে আশঙ্কা জমেছিল, তাই খলিফা তাকে বিশেষ ওসিয়ত করে বলেন, ‘উমর, তুমি কি লক্ষ্য করনি—আল্লাহ তায়ালা কোরআনে যেমন কঠোরতা ও শাস্তির কথা বলেছেন, তেমনি রহমত ও ক্ষমার কথাও বর্ণনা করেছেন। যাতে বান্দারা তার রহমতের আশায় থাকে, আবার তার আজাবের ভয়ও হৃদয়ে ধারণ করে। ফলে কেউ যেন এই ভ্রান্ত ধারণায় না পড়ে যে, আল্লাহ তাকে তার প্রাপ্যের চেয়েও অধিক পুরস্কৃত করবেন, আর কেউ যেন নিরাশ হয়ে না ভাবে যে, তার জন্য আর মুক্তির কোনো পথ নেই।’

এরপর তিনি মনের অবস্থা তুলে ধরে বললেন, ‘উমর, তুমি কি দেখনি, আল্লাহ যখন জাহান্নামিদের কথা আলোচনা করেছেন, তখন তাদের বদ আমলের কথাও উল্লেখ করেছেন। আমার ভয় হয়, না জানি আমিও তাদের একজন হয়ে যাই। আল্লাহ যখন কোরআনে জান্নাতিদের কথা আলোচনা করেছেন, তখন তাদের নেক আমলের কথাও উল্লেখ করেছেন। সে আলোচনা পড়েও আমি ভাবি, আমি কীভাবে তাদের একজন হতে পারব? উমর, যদি আমার এ কথাগুলো মনে রাখেন, তাহলে চোখের সামনে থাকা ভুবনের চেয়ে অদৃশ্য ভুবনই আপনার বেশি প্রিয় হয়ে উঠবে। আমি বিশ্বাস করি, আপনি তেমনই হবেন।’

রাসুলের সঙ্গী রাসুলের পাশে

২২ জমাদিউল আখির ১৩ হিজরি (৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ আগস্ট), সোমবার। মদিনার আকাশে সূর্য তখন হেলে পড়েছে। মাগরিব ও এশার নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন মহাকালের মহাপুরুষ রাসুলের সর্বক্ষণের সঙ্গী মুসলিম জাহানের খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। তার ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে ইসলামের ইতিহাসের সেই সোনালি দুটি বছর শেষ হলো।

তার জানাজা পড়িয়েছিলেন তার উত্তরসূরি উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। তার দাফন হয় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পাশে, আয়েশা (রা.)-এর কামরায়। তার মৃত্যু সংবাদে মুসলিম জাহানে সৃষ্টি হয় গভীর শোকের পরিবেশ। এমনকি তার বৃদ্ধ পিতা আবু কুহাফা, যিনি তখন প্রায় শতবর্ষী, তিনিও পুত্রবিয়োগে ভেঙে পড়েন। মদিনার অলিগলিতে কান্না আর হাহাকার ভারী হয়ে ওঠে।

আবু বকর (রা.)-এর মৃত্যু ছিল এক মহাকালের সমাপ্তি। তিনি এমন এক রাষ্ট্র রেখে গিয়েছিলেন, যার কোষাগার ছিল রিক্ত (কারণ তিনি সব অর্থ বিলিয়ে দিয়েছিলেন), কিন্তু নৈতিক ভিত্তি ছিল হিমালয়ের মতো অটল। আবু বকর (রা.)-এর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল ‘খেলাফত’কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং প্রমাণ করা যে, নবুওয়াতের সিলসিলা শেষ হলেও নবুওয়াতের আদর্শে রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল সম্ভবই নয়, বরং এর চেয়ে উত্তম কোনো বিকল্পই নেই।

ইতিহাসের ধারাবাহিক পথচলা

আবু বকর (রা.)-এর জীবন ছিল এমন একটি মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়ের মতো, একই সঙ্গে যা নতুন মহাকাব্যের সূচনা করে গিয়েছিল। মদিনার সেই বিষণ্ণ সোমবারের গোধূলিলগ্নে যখন তার মুবারক দেহ কবরে শায়িত করা হচ্ছিল, তখন সিরিয়ার মরুপ্রান্তরে মুসলিম ঘোড়সওয়ারদের তলোয়ারের আলোতে উদিত হচ্ছিল একটি নতুন সভ্যতার সূর্য। আবু বকর (রা.)-ই নবুওয়াতের আলোকধারাকে খেলাফতের প্রশাসনিক শৃঙ্খলায় রূপান্তর করেছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন